যে প্রতিবেশী জান্নাতে যেতে পারবে না

ইসলামে প্রতিবেশীর গুরুত্ব অপরিসীম। জিবরাইল (আ.) প্রতিবেশীর অধিকার বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে এত বেশি সচেতন করেছেন, যার দরুন তিনি ভেবেছিলেন প্রতিবেশীকে উত্তরাধিকার বানিয়ে দেওয়া হবে। জিবরাইল (আ.)-এর তাগিদ ও মহানবী (সা.)-এর ভাবনা থেকে প্রতিবেশীর অধিকার আদায় যে কত বড় ইমানি দায়িত্ব, তা সহজে উপলব্ধি করা যায়।
আয়েশা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘জিবরাইল এসে আমাকে প্রতিবেশীর বিষয়ে অবিরত উপদেশ দিতে থাকলেন। এমনকি আমার মনে হলো, হয়তো তিনি প্রতিবেশীকে আমার উত্তরাধিকার বানিয়ে দেবেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০১৫)
আল্লাহর কাছে উত্তম প্রতিবেশী কে?
আমরা যদি আল্লাহর কাছে উত্তম প্রতিবেশী হতে চাই, তাহলে প্রতিবেশীকে ভালোবাসতে হবে। তাদের সেবা করতে হবে। তাদের কল্যাণ নিশ্চিত করতে হবে। ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর কাছে উত্তম বন্ধু ওই ব্যক্তি, যে তার সঙ্গীর কল্যাণকামী। আল্লাহর কাছে উত্তম প্রতিবেশী ওই ব্যক্তি, যে তার প্রতিবেশীর কল্যাণকামী।’ (রিয়াজুস সালেহিন, হাদিস: ৩১১)
প্রতিবেশীকে কষ্ট দেওয়া পাপ
অনেকেই প্রতিবেশীর কষ্টের প্রতি লক্ষ্য না রেখে উচ্চ আওয়াজে সংগীত শুনে, সাউন্ড বাড়িয়ে টিভি দেখে, উচ্চস্বরে হাসে, জোরে জোরে কথা বলে বা এমন অনেক কাজই নিজের খেয়ালখুশি মতো করে—যা প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয়। অনেক প্রতিবেশী উপায়ন্তর না দেখে অসুবিধার কথা জানান, কষ্টের কথা জানান, বাড়িতে অসুস্থ ব্যক্তি কিংবা শিশুর কথা বলেন কিন্তু তাদের পাত্তা দেওয়া হয় না। ইসলামে বিধান মতে, প্রতিবেশীকে কোনোভাবেই কষ্ট দেওয়া যাবে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) উম্মতকে সাবধান করে বলেছেন, ‘যে আল্লাহ ও শেষ দিবসে বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার প্রতিবেশীকে কষ্ট না দেয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০১৮)
প্রতিবেশীর চাই নিরাপদ সমাজ
সবসময় প্রতিবেশীর কল্যাণ কামনা করতে হবে। আপনার লাগানো গাছ-পালা প্রতিবেশীর জানালা গলে তার ঘরে পৌঁছে যাচ্ছে কি না, তার ঘরের চালে বাতাসের তরঙ্গে দোলে দোলে শব্দ করছে কি না, আপনার ছাদের পানি প্রতিবেশীর ঘরের চালে বা দেয়ালে পরছে কি না, আপনার ফেলানো ময়লা প্রতিবেশীর কষ্টের কারণ হচ্ছে কি না—খেয়াল রাখুন ভালোভাবে। সর্বোপরি আপনি প্রতিবেশীর যন্ত্রণার কারণ হচ্ছেন কি না, খেয়াল করুন। নিজেকে প্রতিবেশীর জন্য নিরাপদ প্রমাণ করুন। মনে রাখবেন, মুমিন প্রতিবেশীকে কষ্ট দিতে পারে না। যে কষ্ট দেয়, সে মুমিন নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর কসম, সে মুমিন নয়!, আল্লাহর কসম, সে মুমিন নয়!, আল্লাহর কসম, সে মুমিন নয়! জিজ্ঞেস করা হলো—হে আল্লাহর রাসুল, ‘কে সে?’ তিনি বলেন, ‘যার অনিষ্ট থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ নয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫০১৬)
প্রতিবেশীকে কষ্টদাতা জাহান্নামি
আপনি মুসলমান। গুরুত্বসহকারে পাঁচওয়াক্ত নামাজ পড়েন। জাকাত প্রদানে বেশ সতর্ক। রোজা রাখেন। দাওয়াত ও তাবলিগ করেন একনিষ্ঠচিত্তে। মানুষকে নামাজের কথা বলেন। দ্বীনের পথে আহ্বান করেন। কিন্তু প্রতিবেশীর হক সম্পর্কে আপনি বড় উদাসীন। আপনার মাধ্যমে কীভাবে প্রতিবেশীর অধিকার ক্ষুণ্ণ হচ্ছে, সেটা আপনি ভেবেও দেখেন না। তাহলে কিন্তু আপনি জান্নাত থেকে বঞ্চিত হওয়ার উপাদানই কেবল সংগ্রহ করছেন!।
আপনি নামাজ পড়ছেন, রোজা রাখছেন, হজ করছেন, জাকাত দিচ্ছেন কিন্তু প্রতিবেশীকে কষ্ট দিচ্ছেন। তাহলে আপনার এই নামাজ, রোজা, হজ ও জাকাত বিফলে যাবে। কারণ এগুলোর মতো প্রতিবেশীর হক আদায়ও ইবাদত। আপনি প্রতিবেশীকে কষ্ট দিয়ে নামাজ, রোজা, হজ ও জাকাত আদায় করেও জান্নাতে যেতে পারবেন না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না, যার অনিষ্ট থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ নয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৬)
যে প্রতিবেশী মুমিন নয়
আপনি সচ্ছল, উত্তম আবাসনে থেকে সুস্বাদু খাবার খেয়ে ভালো পোশাক পরে মসজিদে যান। গভীর রাতে তাহাজ্জুদের নামাজে পড়েন। এসব করে পেটপুরে খেয়ে ঘুমান। অথচ আপনার প্রতিবেশী না খেয়ে থাকে। তারা ঠিকমতো খাচ্ছে কি না, তাদের উননে আগুন জ্বলছে কি না; খবর নেওয়ার প্রয়োজনও অনুভব করছেন না। তাহলে আপনি কিভাবে প্রকৃত মুমিন হতে পারেবন! কিভাবে আপনি জান্নাতে যাওয়ার আশা করেন! আপনি যে নবীর উম্মত বলে স্বগৌরবে বুক ফুলিয়ে চলেন, পেটপুরে খেয়ে ঘুমান, সেই নবীই বলেছেন, ‘ওই ব্যক্তি মুমিন নয়, যে পেটপুরে খায় অথচ তার পাশের প্রতিবেশী না খেয়ে থাকে।’ (মুসনাদে আবু ইয়ালা, হাদিস: ২৬৯৯)






