‘গ্রুপ অব সেভেন’: কানাডীয় শিল্পের বিপ্লব ও নেপথ্যের ইতিহাস

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
‘গ্রুপ অব সেভেন’: কানাডীয় শিল্পের বিপ্লব ও নেপথ্যের ইতিহাস
‘গ্রুপ অব সেভেন’। ছবি : সংগৃহীত

১৯২০-এর দশকে আত্মপ্রকাশ করা 'গ্রুপ অব সেভেন' ছিল কানাডার প্রথম আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত জাতীয় শিল্প আন্দোলন।

ফ্র্যাঙ্কলিন কারমাইকেল, লরেন হ্যারিস, এ ওয়াই জ্যাকসন, ফ্রাঞ্জ জনস্টন, আর্থার লিসমার, জেইএইচ ম্যাকডোনাল্ড এবং এফএইচ ভার্লির মতো প্রখ্যাত চিত্রশিল্পীদের নিয়ে গঠিত এই দলটি ইউরোপীয় ঐতিহ্যবাহী চিত্রকলার গণ্ডি পেরিয়ে সম্পূর্ণ নতুন ও আধুনিক শৈলীতে কানাডার বিশাল ও দুর্গম প্রকৃতির রূপ ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলেন। তাদের মূল উদ্দেশ্য প্রকৃতির নিখুঁত প্রতিকৃতি আঁকা ছিল না; বরং প্রকৃতির বৈচিত্র্য মানুষের মনে যে গভীর অনুভূতির সৃষ্টি করে, তা-ই ক্যানভাসে রূপ দেওয়া ছিল তাদের মূল লক্ষ্য।

এই শিল্প আন্দোলনের পেছনে সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা ছিলেন বিখ্যাত চিত্রশিল্পী টম থমসন। তবে দলটির আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশের আগেই মাত্র ৪০ বছর বয়সে আকস্মিকভাবে মারা যান তিনি। শুরুতে কানাডীয় সমালোচকেরা তাদের এই আধুনিক ঘরানার তীব্র সমালোচনা করলেও, ১৯২৪ সালে লন্ডনের ‘ব্রিটিশ এম্পায়ার এক্সিবিশনে’ তাদের চিত্রকর্মগুলো ‘স্বতন্ত্র কানাডীয় চরিত্র’ হিসেবে বিপুল প্রশংসা পায়। এর পর থেকেই তারা নিজ দেশেও বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করেন।

তবে গ্রুপ অব সেভেনের এই চিত্রশিল্পে কানাডার প্রকৃতিকে সম্পূর্ণ জনমানবহীন ও আদিম হিসেবে উপস্থাপন করায় পরবর্তীতে তা তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে। সমালোচকদের মতে, কানাডার এই ‘স্বতন্ত্র রূপ’ ফুটিয়ে তুলতে গিয়ে দেশের প্রকৃত ভূমিপুত্র বা আদিবাসীদের অস্তিত্বকে সম্পূর্ণ বর্জন করা হয়েছিল। উনিশ শতকের শেষভাগ থেকে কানাডা সরকারের বর্ণবাদী নীতির কারণে আদিবাসীদের জোরপূর্বক নিজস্ব ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করে আবাসিক স্কুলে বন্দি করা হয়, যা তাদের শিল্প ও সংস্কৃতির স্বাভাবিক বিকাশকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে।

এই ঐতিহাসিক বঞ্চনা এবং সমসাময়িক চারুকলার মূলধারায় আদিবাসী শিল্পীদের প্রবেশাধিকার না পাওয়ার প্রতিবাদে ১৯৭০-এর দশকের শুরুতে উইনিপেগে ‘প্রফেশনাল নেটিভ ইন্ডিয়ান আর্টিস্টস ইনকর্পোরেটেড’ নামের একটি দল গঠিত হয়। পরবর্তীতে সংবাদমাধ্যম যাকে ‘দ্য ইন্ডিয়ান গ্রুপ অব সেভেন’ নামে অভিহিত করে। ড্যাফনি ওডজিগ, অ্যালেক্স জানভিয়ার এবং নরভাল মরিসোর মতো বিখ্যাত আদিবাসী শিল্পীরা ছিলেন এই দলের অন্যতম কর্ণধার।

মূল গ্রুপ অব সেভেনের চিত্রকর্ম ছিল মূলত ঔপনিবেশিক দৃষ্টিকোণ থেকে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগের রূপরেখা। অন্যদিকে, আদিবাসী শিল্পীদের সৃষ্টিকর্ম ছিল এই মাটির সাথে তাদের হাজার বছরের আত্মিক ও আধ্যাত্মিক বন্ধনের বহিঃপ্রকাশ। বর্তমানে একবিংশ শতাব্দীতে এসে এই দুই ভিন্ন ধারার শিল্পকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিতে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। ন্যাশনাল গ্যালারি অব কানাডা এখন ইতিহাসকে বিকৃত না করে আদিবাসী ও অ-আদিবাসী উভয় ধারার শিল্পকর্মকে একই গ্যালারিতে পাশাপাশি প্রদর্শন করছে। এর মাধ্যমে এই সত্যটিকেই সার্বজনীন স্বীকৃতি ও সম্মান জানানো হচ্ছে যে কানাডা আজ বহুসাংস্কৃতিক রাষ্ট্র হলেও এই ভূমির আদি শিল্প ও প্রথম বাসিন্দা মূলত আদিবাসীরাই।

সূত্র: বিবিসি