Advertisement
হুমায়ূন প্রয়াণ দিবস

হুমায়ূন আহমেদের অদ্ভুত চরিত্রগুলো

খান মুহাম্মদ রুমেল
হুমায়ূন আহমেদের অদ্ভুত চরিত্রগুলো
হুমায়ূন আহমেদ। ছবি: সংগৃহীত

২০১২ সালের ১৯ জুলাই নিউইয়র্কের নীলাকাশে কি ঝকঝকে রোদ ছিল, নাকি ফিনিক ফোঁটা জোছনায় ভাসছিল গাছপালা শহর নগর রাজপথ? চাইলে হয়তো খোঁজ বের করা সম্ভব সেদিনের প্রকৃতির রূপ। কারণ, এইদিন মার্কিন মুলুকের এক হাসপাতালে ধীরে ধীরে জীবনের আলো আঁধারকে বিদায় বলে অনন্ত ঘুমের দেশে যাত্রা করেছিলেন বাংলাদেশের এক কিংবদন্তি। তিনি হুমায়ূন আহমেদ। নন্দিত শব্দমালার আজব কারিগর। যিনি চেয়েছিলেন চাঁদনি পসর রাতের মৃত্যু। হুমায়ূন আহমেদের চলে যাওয়ার সময়টা বাংলাদেশের ঘড়িতে আটকে ছিল রাত ১১টা ২০ মিনিট ১৯ জুলাই ২০১২-তে।

হাতের আঙুল গুনে এরপর কেটে গেছে ১৪টি বছর। হুমায়ূন আহমেদ দিনে দিনে প্রাসঙ্গিক হয়েছেন আরও। বৃষ্টির অবিরাম ঝরে পড়ায়, থমকে থাকা অলস দুপুরে, বিষাদ সন্ধ্যায়, রোদজ্বলা রাজপথে, চলে যাওয়া বসন্তের দিনে, কোজাগরি জোছনা রাতে কিংবা বোহেমিয়ান গল্পের আসরে তার চর্চা চলে প্রতিদিন।

এক জীবনে হুমায়ূন আহমেদ যেখানে হাত দিয়েছেন, ফলিয়েছেন সোনা। গদ্যের মায়াবী পথে হাঁটতে হাঁটতে দাঁড়িয়েছেন ক‍্যামেরার পেছনে, সেলুলয়েডে এঁকেছেন মহাকাব্যিক জীবন। গান লিখেছেন, কবিতায় ফুল ফুটিয়েছেন। তার চারপাশে আলো হয়ে ফুটেছে অনেক ফুল। নক্ষত্র খচিত নিজের আকাশ তিনি সাজিয়েছেন নিজের মতো। সব‍্যসাচীর মতো চলেছে তার কলম। প্রয়াণ দিবসে বলতে চাই তার সৃষ্ট চরিত্রগুলো নিয়ে।

গল্প-উপন্যাসে হুমায়ূন আহমেদ চরিত্র সৃষ্টি করেছেন অসংখ্য চরিত্র। চরিত্রগুলো চেনাজানা, যেন আমাদের চারপাশেই থাকে। আবার কিছু চরিত্র যেন অচেনা, আমাদের স্বাভাবিক জীবনের সঙ্গে মেলে না। কেমন যেন পাগল পাগল অথবা আত্মভোলা। যেমন, হিমু, মিসির আলি, শুভ্র, রূপা, জরি, পরী, চিত্রা, মৃ্ন্ময়ী, পারুল, আনিস, খোকা, শফিক, রফিক, মজিদ ছাড়াও তার উপন্যাসে মামা, খালা, ফুপা-ফুপু এমনকি কাজের লোকগুলোও কেমন যেন মাথা আউলা। অদ্ভুত-উদ্ভট কাণ্ডকারখানাকার সঙ্গে তারা বেশ রহস্যময় কথাবার্তাও বলে। সে-জন্য সাধারণ হয়েও তারা যেন অসাধারণ।

অনেকে মনে করেন, হুমায়ূন আহমেদের প্রথম দিকের উপন্যাসগুলোতে চরিত্রগুলোর সাধারণ-স্বাভাবিক গতি-প্রকৃতিই ছিল। তার প্রথম উপন্যাস নন্দিত নরকে (১৯৭২) থেকে শুরু করে শঙ্খনীল কারাগার (১৯৭৩), সৌরভ (১৯৮৪), ফেরা (১৯৮৬), গৌরীপুর জংশন (১৯৯০) ইত্যাদি উপন্যাসে চরিত্রগুলো তার পরের দিকের চরিত্রগুলোর চেয়ে অনেক বেশি স্বাভাবিক-বাস্তব। বিশেষ করে নাটক লেখা শুরু করার পর থেকে এবং জনপ্রিয় ধারার উপন্যাসগুলো লেখা শুরু করার পর থেকে হুমায়ূন আহমেদের মধ্যে সত্যবাদী সহজ সরল, কোনো কোনো ক্ষেত্রে অদ্ভুত সব চরিত্র সৃষ্টির প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়।

আবার হিমু, মিসির আলী ও শুভ্র চরিত্র তিনটি সৃষ্টি করার পর থেকে তার মধ্যে এক ধরনের লজিক-অ্যান্টি লজিকের দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। মিসির আলীকে নিয়ে হুমায়ূন আহমেদ প্রথম লেখেন ‘দেবী’ (১৯৯৫ ) উপন্যাস। মিসির আলীর অ্যান্টি-লজিক হিসেবে হিমু আসে ১৯৯০ সালে, ‘ময়ূরাক্ষী’ উপন্যাসে। শুভ্রর প্রথম আবির্ভাব ‘শাদা গাড়ি’ নামক একটি ছোট গল্পে, পরে সম্পূর্ণ চরিত্র আসে ‘দারুচিনি দ্বীপ’ (১৯৯১) উপন্যাসে। এই তিনটি চরিত্র বেশি জনপ্রিয় হওয়ার কারণে হুমায়ূনের সাহিত্যে এক ধরনের অদ্ভুত ব্যাপারই বেশি চোখে পড়ে পাঠকের। অদ্ভুত বলতে তারা কেউ এতটাই আলাভোলা যে স্বাভাবিক বোধবুদ্ধি দিয়ে তাদের ধরা যায় না।

যেমন হিমু। কোনো লজিক মেনে চলে না। পিতা তাকে মহাপুরুষ বানানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই মহাপুরুষ হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে অদ্ভুত সব আচরণ করে। খালি পায়ে হলুদ পাঞ্জাবি পরে ঘুরে বেড়ায়। অদ্ভুত কথাবার্তা বলে মানুষকে ভড়কে দিতে পছন্দ করে। একবার সে চুলদাঁড়ি কাটতে গিয়ে ভ্রু পর্যন্ত কামিয়ে ফেলে! জীবনযাপনে সে কোনো প্রচলিত যুক্তিতর্কের ধার ধারে না। আবার মিসির আলী তার উল্টো, এতটাই যৌক্তিক যে যুক্তির বাইরে এক চুলও নড়েন না। শুভ্র একজন শুদ্ধ মানুষ। মানে মানুষের যে স্বাভাবিক ভুল-ত্রুটি, মানবিক গুণাবলীর কিছু মাত্রা আছে এই তিনটি চরিত্র সেই মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে।

হুমায়ূনের সব চরিত্রই অদ্ভুত, এই কথা অবশ্য তার সব উপন্যাসের ক্ষেত্রে খাটে না। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধ ও ইতিহাস-আশ্রিত চরিত্রগুলোর বেলায়। ছোটগল্পেও তিনি অনেক বেশি সিরিয়াস। গল্পের চরিত্রগুলোও মোটামুটি বাস্তব। বেশ কিছু বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি লিখেছিলেন হুমায়ূন আহমেদ। তার বৈজ্ঞানিক কল্পাকাহিনীর চরিত্রগুলোও অতটা অদ্ভুত নয়। বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির মধ্য দিয়েও হুমায়ূন আহমেদ আমাদের চেনাজানা মানুষদের নিয়েই গল্প লিখেছেন।

হুমায়ূন আহমেদের অসংখ্য উপন্যাসের নায়কদের মধ্যে হিমু-প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। তারা রাত-বিরাতে ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসে। কেমন যেন উদাসীন। বাউণ্ডলে। বিশেষ করে চাঁদের আলোয় কয়েকজন যুবক, কবি, মন্দ্রসপ্তক, দারুচিনি দ্বীপ ইত্যাদি উপন্যাসের নায়কেদের মধ্যে এটা ভালোই লক্ষ্য করা যায়। দারুচিনি দ্বীপ উপন্যাসে নানা কাণ্ড অদ্ভূতের একশেষ। শুভ্রর মতো শুদ্ধ মানুষকেও দেখা যায় বন্ধুদের প্ররোচনায় এক ট্রেনযাত্রীর মুখে থুতু মারতে!

হুমায়ূন আহমেদের চরিত্রগুলোর একটা প্রধান প্রবণতা হলো- তারা কেউ জটিল নয়, খুবই সহজ-সরল; কিন্তু রহস্যময়। তারা কথা বলে থেমে থেমে, হেঁয়ালির সুরে। পুরুষ চরিত্রগুলোর তুলনায় সাধারণত নারী চরিত্ররা বেশি কথা বলে। নায়িকাগুলো খুব কোমল, নরম মনের। কাজের লোকগুলো খিটখিটে মেজাজের। বাবা-মাগুলো কেমন যেন বোকাসোকা। বুদ্ধিমত্তার দিক দিয়ে নায়কদের তুলনায় হুমায়ূন আহমেদের নায়িকরাই যেন বেশি বুদ্ধিমান। যদিও অদ্ভুত কাণ্ডে তারাও কম যায় না। অপরূপ সুন্দরী তরুণীরা এমন কাণ্ড করে যা দেখে সাধারণ নায়কদের মাথা ঘুরে যায়! এসব কারণেই কি হুমায়ূনের চরিত্ররা এত জনপ্রিয়!

হুমায়ূন আহমেদের নাটক-সিনেমার চরিত্ররাও ঠিক স্বাভাবিক প্রচলিত সুরে ও স্বরে কথা বলে না। মানে অন্যরা যেমন হড়বড়িয়ে কথা বলে সেরকমটা না। কেমন যেন থেমে থেমে সংলাপ দেয় তারা। যাকে বলতে পারি হুমায়ূনীয় স্টাইল। হুমায়ূনের চরিত্রদের এই প্রভাব তার পাঠকদের ওপর ভালোভাবেই পড়েছে। বিশেষ করে তরুণ-বয়সে যারা তার উপন্যাস একটানা পড়েছে তারা কেমন যেন হুমায়ূনীয় আচরণ করে। অসংখ্য তরুণের হিমু হওয়ার প্রচেষ্টা তো আমরা জানি। হিমুর প্রভাবে হিমু পরিবহন নামে একটি সংগঠনই খুলে ফেলেছে একদল তরুণ-তরুণী। জোছনা রাতে তারা দল বেঁধে জোছনা দেখতে বেরোয়। এখনও বাস্তব জীবনে আমরা যদি কোনো অদ্ভুত চরিত্রের মুখোমুখি হই, বলে বসি, হুমায়ূন আহদের ক্যারাক্টার!

হুমায়ূন আহমেদ কি এসব চরিত্র বাস্তব থেকেই নিয়েছেন না কি সবই তার কল্পনা? তিনি নিজে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন কিছু তার বাস্তব দেখা আর কিছু কল্পনা। হুমায়ূন আহমেদের মা আয়শা ফয়েজ এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, মেঝ ছেলে মুহাম্মাদ জাফর ইকবালের লেখার চেয়ে বড় ছেলে হুমায়ূন আহমেদের লেখা তিনি বেশি পছন্দ করেন। কারণ, হুমায়ূনের গল্প-উপন্যাসে অনেক চেনাজানা মানুষের খোঁজ মেলে।

অনেক পাঠকও হুমায়ূন আহমেদের গল্প-উপন্যাসে নিজেকে খুঁজে পান। এ-কথা কে অস্বীকার করবে যে, সব মানুষের চরিত্রেই কিছু অস্বাভাবিকতা, অদ্ভুত ব্যাপার আছে। হুমায়ূন আহমেদ সেসবই তুলে এনেছেন নিজের কলমে শিল্পের তুলিতে। তাই তার চরিত্ররা কাছের হয়েও অনেক দূরের, চেনা হয়েও যেন কেমন অচেনা। এই রহস্যময়তার মধ্যেই হুমায়ূন আহমেদের চরিত্ররা ঘুরপাঁক খায়। যেমন আমরাও ঘুরপাঁক খাই আমাদের নিজেদের জীবনে, নিজেরই চরিত্র নিয়ে! আমরাও যেমন নিজের কাছে অচেনা, তেমনি হুমায়ূন আহমেদের চরিত্রদেরও যেন ধরি ধরি মনে করি ধরতে গেলে আর মেলে না...।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী ও সাহিত্যিক।