Advertisement

‘রাজাকার’: অপমানসূচক পরিচয় যেভাবে প্রতিবাদের ভাষায় পরিণত হলো

ছিদ্দিক ফারুক
‘রাজাকার’: অপমানসূচক পরিচয় যেভাবে প্রতিবাদের ভাষায় পরিণত হলো
প্রতিবাদের গ্রাফিতি। ছবি: সংগৃহীত

১৪ জুলাই ২০২৪, বিকেল। ‘প্রশ্ন নয়, প্রশংসা করতে এসেছি’ শিরোনামে গণভবনে যেন সাংবাদিকদের মিলনমেলা। ক্ষমতা কাঠামোকে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করার বদলে সেদিনের সাংবাদিকদের ভাষা হয়ে উঠেছিল ক্ষমতাকে তোয়াজ করা। তখনও কোটা সংস্কারের মাঠপর্যায়ের আন্দোলন পুলিশি বাধার সম্মুখীন হয়নি। সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিক প্রভাষ আমিন একটি প্রশ্ন ও মন্তব্য জুড়ে দিয়ে বলেন, ‘...আমার সামনে যদি দুটি সমান মেধাবী প্রার্থী থাকে; একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, আর অন্যজন রাজাকারের সন্তান, তাহলে আমি নিঃসন্দেহে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানকেই চাকরি দিতে চাই।’ এই প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলে বসেন একটি নাটকীয় বাক্য—‘মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি-পুতিরা কোটা সুবিধা না পেলে তবে কি রাজাকারের নাতি-পুতিরা পাবে?’

টেলিভিশন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেখ হাসিনার এই মন্তব্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের কাছে এই মন্তব্য জ্বলন্ত ম্যাচকাঠির মতো বারুদের স্তূপে গিয়ে পড়ল।

সেই রাতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীদের আবাসিক হলগুলোর তালা ভেঙে ছাত্রীরা বেরিয়ে আসেন এবং হলপাড়ায় জড়ো হতে থাকেন। চারদিক থেকে স্লোগানের আওয়াজ ভেসে আসে—‘তুমি কে আমি কে, রাজাকার রাজাকার’। স্লোগানটি দ্রুত সবার মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে। আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত রাজনৈতিকভাবে সচেতন অনেকেই শুরুতে এই স্লোগানের সমালোচনা করলেও, ক্ষোভের মুখে এটি পাল্টানো সম্ভব ছিল না। মিছিল-সমাবেশ সংগঠিত হলেও একক কোনো কাঠামোবদ্ধ নেতৃত্ব না থাকায় কেউ যেন কারও নির্দেশনা মানছিলেন না। উল্টো এর সঙ্গে যুক্ত হলো নতুন মাত্রা—‘কে বলেছে কে বলেছে, স্বৈরাচার স্বৈরাচার’।

ক্ষমতার ভরকেন্দ্রে বসে থাকা এক শাসকের মুখ থেকে বেরিয়ে আসা অপমানমূলক শব্দ কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পরিণত হলো মানুষের ‘গর্বে’র পরিচয়ে। সেই ব্যঙ্গাত্মক (স্যাটায়ারিক) প্রতিবাদী ‘রাজাকার’ পরিচয়ের হাত ধরে অবশেষে পতন হলো সরকারের; ৫ আগস্ট ভারতে পালিয়ে গেলেন হাসিনা।

কলঙ্ক থেকে পরিচয়

‘রাজাকার’ বাংলাদেশে একটি কলঙ্ক-চিহ্ন, যা মুক্তিযুদ্ধ-বিরোধিতা ও গণহত্যায় সহযোগিতার সমার্থক। শেখ হাসিনা যখন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের এই তকমা পরিয়ে দিতে চাইলেন, তিনি মূলত ক্ষমতার পুরনো কৌশল প্রয়োগ করে ঘৃণার প্রতীক জুড়ে দিয়ে একটি যৌক্তিক আন্দোলনকে অপমান করতে চেয়েছিলেন। বিশেষত, যদি জনগণের ন্যায্য আন্দোলনকে কোনো একটা নির্দিষ্ট অপমানসূচক শব্দ বা পরিচয় দিয়ে বারবার দমন করা হয়, তাহলে জনগণের মধ্যে সেই অপমানমূলক পরিচয়কে কৌশলে ব্যবহার করে ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে। কেবল চব্বিশেই নয়, পুরো আওয়ামী লীগ আমল জুড়েই যখনই কেউ সরকারের অপকর্মের সমালোচনা করেছে, তাকেই ‘রাজাকার’ গালি দেওয়া হয়েছে। ফলে, শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক এই শব্দের বারবার ব্যবহার ঐতিহাসিক অর্থের বদলে ভিন্ন এক রাজনৈতিক অর্থ তৈরি করে।

এককালে যে ‘রাজাকার’ শব্দ দিয়ে একাত্তরের সুনির্দিষ্ট একটি বাহিনীকে বোঝানো হতো—যারা গণহত্যার মতো অপরাধে জড়িত ছিল—তার অপব্যবহার শব্দটিকে একটি সাধারণ তকমায় রূপান্তরিত করে। ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন করে একটি শব্দকে জনগণের প্রতিবাদ দমনের হাতিয়ার করার অন্তিম পরিণতি কী হতে পারে, তার ধ্রুপদী নজির হয়ে থাকল চব্বিশের জুলাই।

ফলে, ক্ষমতা যখন নাগরিককে অপমান করতে বা তাদের আকাঙ্ক্ষাকে দমনের উদ্দেশ্যে অপমানসূচক ভাষা ব্যবহার করে, তা প্রথম দিকে কাজ করলেও ধীরে ধীরে কার্যকারিতা হারায়। জনগণ যখন অপমানের ভাষাকেই নিজেদের ‘পরিচয়’ হিসেবে গ্রহণ করে উল্টো বিদ্রূপে পরিণত করে, তখন সেই ভাষা আঘাত করার ক্ষমতা হারিয়ে প্রতিরোধের অস্ত্রে পরিণত হয়। সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় একেই বলে ‘স্টিগমা রিভার্সাল’ (Stigma Reversal) বা কলঙ্কের উল্টোপিঠ।

স্যাটায়ার, ফ্রেম অ্যালাইনমেন্ট ও ক্ষমতার ভাষা

প্রখ্যাত তাত্ত্বিক মিখাইল বাখতিন বলেছিলেন, লোকসংস্কৃতিতে কার্নিভালের মুহূর্তে সামাজিক শ্রেণিবিন্যাস সাময়িকভাবে উল্টে যায়। হাস্যরস ও বিদ্রূপ তখন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক হাতিয়ার হয়ে ওঠে, কারণ তা ক্ষমতাকে হাস্যকর করে তোলে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে দেখা যায়, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের উক্তি নিয়ে নানা প্যারোডি স্লোগান তৈরি হচ্ছে। হাসিনা পালানোর পর তাঁর পূর্বের মন্তব্য ‘শি হ্যাজ মেড আস স্ট্যান্ড টলার’ (তিনি আমাদের মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে শিখিয়েছেন)-কে বিদ্রূপ করে ছাত্র-জনতা বানিয়েছিল ‘শি হ্যাজ মেইড আস ফ্লাই ফাস্টার’ (তিনি আমাদের দ্রুত পালাতে শিখিয়েছেন)। যেখানে সরাসরি প্রতিরোধ ঝুঁকিপূর্ণ, সেখানে বিদ্রূপ ও প্যারোডিই হয়ে ওঠে প্রতিরোধের ভাষা। ‘তুমি কে আমি কে, রাজাকার রাজাকার’ স্লোগানটি ছিল তেমনই এক আক্রমণাত্মক ও ব্যঙ্গাত্মক প্রতিক্রিয়া।

স্যাটায়ার কেবল হাসির উপকরণ নয়, বরং এটি ‘দুর্বলের অস্ত্র’। প্রখ্যাত নৃবিজ্ঞানী জেমস সি স্কট বলেছিলেন, নিপীড়িতরা তাদের দৈনন্দিন কার্যকলাপ ও হাস্যরসের মাধ্যমেও ক্ষমতার ভাষাকে উল্টে দেয়। সরকারি চাকরিতে কোটার সংস্কার চেয়ে আন্দোলন শুরু হলেও ‘রাজাকার’ মন্তব্যের পর আন্দোলনের গতিপথ আমূল বদলে যায়। তখন কোটার প্রশ্ন ছাপিয়ে এটি মর্যাদা, ন্যায্যতা ও রাষ্ট্রীয় দমনের বিরুদ্ধে এক অস্তিত্বের লড়াইয়ে পরিণত হয়।

১৪ জুলাইয়ের পর ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক আন্দোলন সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। ‘মুক্তিযুদ্ধ ও এর চেতনা শুধু একক কোনো দলের’—এই দাবি দীর্ঘদিন ধরে শাসকদলের বয়ানের কেন্দ্রে ছিল। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ‘রাজাকার’ স্লোগান সেই একচেতিয়া বয়ানের বিরুদ্ধে একটি কাউন্টার-ন্যারাটিভ (প্রতি-বয়ান) তৈরি করে। ছাত্ররা প্রশ্ন তোলে—মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে যে বিভাজনের রাজনীতি তৈরি করা হয়েছিল, তার বৈধতা কতটুকু? সেই হিসেবে এই স্লোগান শুধু তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ছিল না, বরং তা ছিল ঐতিহাসিক স্মৃতির মালিকানা নিয়ে রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের বহিঃপ্রকাশ।

মিম, গ্রাফিতি ও সংক্রামক ভাষা

স্লোগানটি কেবল রাজপথেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; তা দ্রুত দেয়াল-গ্রাফিতি, সামাজিক মাধ্যমের পোস্ট, ভিডিও ও মিমে রূপান্তরিত হয়ে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিম তখনই দ্রুত ছড়ায়, যখন তা সংক্ষিপ্ত, ছন্দোময়, আবেগঘন এবং সহজে অনুকরণযোগ্য হয়। “তুমি কে, আমি কে” স্লোগানটি এই সব শর্তই পূরণ করেছিল। এর প্রশ্ন-উত্তর কাঠামো যেকোনো জমায়েতে তাৎক্ষণিকভাবে সবাইকে অংশ নেওয়ার সুযোগ করে দিত, আর মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতির গভীর আবেগীয় ভার একে নিছক স্লোগানের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী করে তুলেছিল। এটি প্রমাণ করে, ডিজিটাল যুগে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ছাড়াও বিকেন্দ্রীভূত ভাষা ও প্রতীকের মাধ্যমে আন্দোলন কত দ্রুত সংগঠিত হতে পারে।

একটি স্লোগান, একটি সরকারের পতন

আন্দোলন যতই তীব্র হয়েছে, ততই নতুন নতুন স্লোগানের জন্ম হয়েছে। ‘খুনি হাসিনা গদি ছাড়’, ‘কথায় কথায় বাংলা ছাড়, বাংলা কি তোর বাপ-দাদার’, ‘চাইতে গেলাম অধিকার, হয়ে গেলাম রাজাকার’, ‘দফা এক দাবি এক, শেখ হাসিনার পদত্যাগ’সহ অসংখ্য স্লোগানের মিশেলে এই গণ-অভ্যুত্থান পূর্ণতা পায়। কিন্তু ১৪ জুলাই রাতের প্রথম ক্ষোভের বিস্ফোরণই ছিল ভাঙনের মূল বিন্দু, যাকে বলা যায় ‘ট্রিগার মুহূর্ত’। এটি এমন এক মুহূর্ত, যা সাধারণ ক্ষোভকে চূড়ান্ত প্রতিরোধে রূপান্তরিত করেছিল। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতন ও দেশত্যাগ পর্যন্ত যে দীর্ঘ পথ, তার সূচনাবিন্দু খুঁজলে বারবার ফিরে আসতে হয় সেই একটি রাতে, একটি স্লোগানে।

ভাষা কখনো নিরপেক্ষ নয়; তা যেমন ক্ষমতার হাতিয়ার হতে পারে, তেমনি হতে পারে প্রতিরোধের মোক্ষম অস্ত্র। অপমানের ভাষাকে যখন জনগণ ব্যঙ্গাত্মক প্রতি-আখ্যান হিসেবে গ্রহণ করে, তখন তা আর আত্মরক্ষার কৌশল থাকে না, হয়ে ওঠে স্বৈরাচার পতনের সবচেয়ে বড় আক্রমণাত্মক অস্ত্র।

লেখক: গবেষক, প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি)