বন বিভাগ সক্ষম, এবার তাদের সক্ষমতা বাড়ান

সুন্দরবনের শ্যালা নদীর তীরে আন্ধারমানিক এলাকা। সময় ১২ জুলাই, দুপুর ১টা ৫ মিনিট। প্রায় ১০ ফুট লম্বা ও ৬ ফুট চওড়া খাঁচার সামনে অপেক্ষা করছেন বন বিভাগের কর্মকর্তারা, বাঘ বিশেষজ্ঞ, ভেটেরিনারি চিকিৎসক, প্রাণী অধিকারকর্মী, গবেষক, সাংবাদিক এবং নদীর তীরে দাঁড়িয়ে থাকা শত শত উৎসুক মানুষ। টানটান উত্তেজন। সবার চোখ লঞ্চে বহনকৃত খাঁচার দরকার দিকে; মুহূর্তটি ক্যামেরাবন্দি করতে প্রস্তুত অসংখ্য লেন্স।
খাঁচার দরজা খুলতেই কয়েক সেকেন্ডের জন্য যেন সময় থমকে দাঁড়ায়। তারপর ধীর পায়ে, কিছুটা সতর্ক দৃষ্টিতে চারপাশ দেখে বাঘিনীটি এগিয়ে যায়। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সে হারিয়ে যায় সুন্দরবনের গভীর সবুজে। সেই দৃশ্য শুধু উপস্থিত মানুষকেই আবেগাপ্লুত করেনি; এটি ছিল বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের ইতিহাসে এক বিরল ও গর্বের মুহূর্ত।
কয়েক মাস আগেও এই একই বাঘিনী ছিল মৃত্যুর খুব কাছাকাছি। শিকারিদের পাতা স্টিলের ফাঁদে আটকে গুরুতর আহত হয়েছিল সে। দীর্ঘ সময় ফাঁদে আটকে থাকার কারণে তার শরীরে গভীর ক্ষত তৈরি হয়, সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে এবং স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার সম্ভাবনাও ক্ষীণ হয়ে পড়ে।
অনেকের ধারণা ছিল, হয়তো আর কখনো তাকে বনে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব হবে না। কিন্তু প্রায় ছয় মাস ধরে নিবিড় চিকিৎসা, পর্যবেক্ষণ, পুনর্বাসন এবং আচরণগত মূল্যায়নের পর বন বিভাগ যেটি করে দেখিয়েছে, তা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের সংরক্ষণ ইতিহাসে একটি মাইলফলক।
এটি কেবল একটি বাঘকে মুক্ত করে দেওয়ার ঘটনা নয়; এটি একটি রাষ্ট্রের সক্ষমতার প্রতীক। এটি প্রমাণ করে, আন্তরিকতা, দক্ষতা এবং বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা একসঙ্গে কাজ করলে বাংলাদেশের মতো সীমিত সম্পদের দেশেও বিশ্বমানের সংরক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব।
রয়েল বেঙ্গল টাইগার শুধু একটি বন্যপ্রাণী নয়; এটি সুন্দরবনের প্রাণ, বাংলাদেশের জাতীয় গর্ব এবং বিশ্ব ঐতিহ্যের প্রতীক। বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের সুস্থতা অনেকাংশেই নির্ভর করে এই শীর্ষ শিকারির অস্তিত্বের ওপর। একটি বনজ বাস্তুতন্ত্রে বাঘ শীর্ষ স্তরের শিকারি (Apex Predator) হিসেবে হরিণ, বন্য শূকরসহ বিভিন্ন তৃণভোজী প্রাণীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করে। এর ফলে বনজ উদ্ভিদ ও জীববৈচিত্র্যের স্বাভাবিক ভারসাম্য বজায় থাকে। তাই একটি বাঘকে রক্ষা করা মানে কেবল একটি প্রাণীকে বাঁচানো নয়; বরং পুরো একটি বাস্তুতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা।
বিশ্ব বন্যপ্রাণী তহবিলের (ডব্লিউডব্লিউএফ) তথ্য অনুযায়ী, গত এক শতকে পৃথিবীর প্রায় ৯৫ শতাংশ বাঘের আবাসস্থল হারিয়ে গেছে। একসময় পৃথিবীতে এক লাখেরও বেশি বাঘ থাকলেও বর্তমানে বন্য পরিবেশে তাদের সংখ্যা চার হাজারের কিছু বেশি। বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, ভুটান, রাশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশ মিলিয়ে বাঘের অস্তিত্ব এখন টিকে আছে। বাংলাদেশের সুন্দরবন এই বৈশ্বিক বাঘের সংখ্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ধারণ করে।
বাংলাদেশের সর্বশেষ বাঘ শুমারি অনুযায়ী, সুন্দরবনে বর্তমানে প্রায় ১২৫টি রয়েল বেঙ্গল টাইগার রয়েছে। কয়েক দশক আগেও এই সংখ্যা নিয়ে গভীর উদ্বেগ ছিল। যদিও সাম্প্রতিক জরিপে সংখ্যাগত কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেছে, তবুও এই সাফল্যের পেছনে বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। কারণ বাঘের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি এখনো মানুষের সৃষ্টি।
শিকারিদের পাতা ফাঁদ, বনজ সম্পদ লুট, আবাসস্থল সংকুচিত হওয়া, নদীপথে অনিয়ন্ত্রিত চলাচল, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং মানুষ-বাঘ সংঘাত ইত্যাদি সব মিলিয়ে সুন্দরবনের বাঘ আজও ঝুঁকির মধ্যেই রয়েছে। বিশেষ করে স্টিলের তারের ফাঁদ (Snare Trap) বর্তমানে সবচেয়ে ভয়ংকর হুমকিগুলোর একটি। এসব ফাঁদে শুধু বাঘ নয়; হরিণ, বন্য শূকর, মেছো বিড়াল, বন বিড়ালসহ অসংখ্য বন্যপ্রাণী আহত বা নিহত হয়। একটি ফাঁদ কখন কোন প্রাণীর জীবন কেড়ে নেবে, সেটি শিকারিরাও জানে না।
সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) রেজাউল করিম চৌধুরীর বক্তব্য পরিস্থিতির ভয়াবহতাই তুলে ধরে। তিনি জানিয়েছেন, প্রায় প্রতিদিনই বন বিভাগের টহল দল নতুন নতুন ফাঁদ উদ্ধার ও ধ্বংস করছে। অনেক সময় শিকারিদের গ্রেপ্তারও করা হয়। কিন্তু পরদিন আবার নতুন ফাঁদ পেতে দেওয়া হয়। সীমিত জনবল ও বিশাল বনাঞ্চল নিয়ে এই লড়াই অত্যন্ত কঠিন।
বাস্তবতা হলো, বন বিভাগে নিবেদিতপ্রাণ কর্মকর্তা-কর্মচারীর ভীষণ অভাব। তাদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ এবং প্রযুক্তিও পর্যাপ্ত নয়। আধুনিক ড্রোন নজরদারি, স্মার্ট প্যাট্রোলিং, উন্নত ক্যামেরা ট্র্যাপ, জিপিএস-ভিত্তিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা, প্রশিক্ষিত ভেটেরিনারি রেসপন্স টিম এবং দ্রুত উদ্ধার সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে কমিউনিটিভিত্তিক সংরক্ষণ কার্যক্রম সম্প্রসারণও জরুরি। কারণ সুন্দরবনের সবচেয়ে কাছের মানুষগুলোই হতে পারেন এর সবচেয়ে কার্যকর রক্ষক।
বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ড. রেজা খান যথার্থই বলেছেন, ‘বন বিভাগের এই অভিযান আন্তরিক প্রশংসার দাবিদার। বিশ্বের অন্যতম কঠিন প্রাকৃতিক পরিবেশে একটি পূর্ণবয়স্ক রয়েল বেঙ্গল বাঘিনীকে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে এনে সফলভাবে বনে অবমুক্ত করা কোনো সাধারণ অর্জন নয়। এটি বন কর্মকর্তাদের সাহস, পেশাদারত্ব, ধৈর্য এবং বৈজ্ঞানিক দক্ষতার অনন্য উদাহরণ।’
তবে এই সাফল্যে আত্মতুষ্ট হওয়ার সুযোগ নেই। একটি বাঘিনীকে বাঁচানো যেমন আনন্দের, তেমনি আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো এমন পরিস্থিতি যেন আর সৃষ্টি না হয়। এজন্য শিকারি চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ, গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি, সীমান্তবর্তী এলাকায় সমন্বিত অভিযান এবং বন্যপ্রাণী অপরাধের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ শুধু বন বিভাগের একার দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্র, সমাজ এবং প্রতিটি নাগরিকের সম্মিলিত দায়িত্ব।
একটি বাঘিনীর সুন্দরবনে ফিরে যাওয়ার গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয় প্রকৃতি যদি একটি সুযোগ পায়, সে নিজেই ঘুরে দাঁড়াতে পারে। প্রয়োজন শুধু মানুষের সদিচ্ছা, বিজ্ঞানভিত্তিক উদ্যোগ এবং ধারাবাহিক সংরক্ষণ প্রচেষ্টা।
সুন্দরবনের প্রতিটি বাঘ আমাদের জাতীয় ঐতিহ্য, পরিবেশগত নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতার প্রতীক। তাই একটি বাঘকে রক্ষা করা মানে কেবল একটি প্রাণকে বাঁচানো নয়; বরং একটি বন, একটি বাস্তুতন্ত্র এবং বাংলাদেশের প্রাকৃতিক পরিচয়কে টিকিয়ে রাখা।
এই বাঘিনীর ফিরে আসা তাই শুধু একটি মুক্তির গল্প নয়; এটি আমাদের জন্য এক শক্তিশালী বার্তা; আমরা চাইলে পারি। অর্থাৎ বন বিভাগ সক্ষম, শুধু নেই তার সক্ষমতা। এখন প্রয়োজন সেই সক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করার রাজনৈতিক প্রচেষ্টা, পর্যাপ্ত বিনিয়োগ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।
লেখক: ইনচার্জ, আরটিভি অনলাইন এবং পরিবেশ বিষয়ক সাংবাদিক
.png)






