কোয়ার্টারে ৩৪ ম্যাচ ধরে অপরাজিত মরক্কোর সামনে এমবাপ্পেরা

চার বছর আগে মরক্কোর স্বপ্ন থামিয়েছিল ফ্রান্স। কাতার বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ২-০ গোলে হেরে আফ্রিকা ও আরব ফুটবলের সবচেয়ে রূপকথার অভিযাত্রা শেষ করেছিল আটলাস লায়নরা। চার বছর পর আবার সেই ফ্রান্স, আবার বিশ্বকাপের নকআউট। শুধু মঞ্চটা এবার সেমিফাইনাল নয়, কোয়ার্টার ফাইনাল। আর মরক্কোও আগের চেয়ে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী, অনেক বেশি পরিণত।
কানাডাকে ৩-০ গোলে হারিয়ে শেষ আটে উঠেছে মরক্কো। স্কোরলাইন যত সহজ দেখাচ্ছে, ম্যাচটা তত সহজ ছিল না। প্রথমার্ধে সহ-আয়োজক কানাডা চাপ তৈরি করেছিল, প্রেসিংয়ে মরক্কোকে অস্বস্তিতে রেখেছিল। কিন্তু বড় ম্যাচে সুযোগ কাজে লাগানোর যে ঠান্ডা মাথা লাগে, সেটিই দেখিয়েছে মরক্কো। বিরতির পর আজেদিন উনাহির জোড়া গোল আর যোগ করা সময়ে সুফিয়ান রহিমির গোল কানাডার বিশ্বকাপ স্বপ্ন শেষ করে দেয়।
এই জয় মরক্কোর জন্য শুধু আরেকটি নকআউট জয় নয়। ২০২২ বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে উঠে বিশ্বকে চমকে দেওয়া দলটি এবার আর চমক নয়, নিজেদের শক্তিতে প্রতিষ্ঠিত এক প্রতিদ্বন্দ্বী। ব্রাজিলের সঙ্গে ড্র, নেদারল্যান্ডসকে পেনাল্টি শুটআউটে বিদায়, এরপর কানাডার বিপক্ষে দাপুটে দ্বিতীয়ার্ধ, মরক্কোর পথচলা বলে দিচ্ছে তারা এবারও শুধু গল্প লিখতে আসেনি, আরও দূরে যেতে এসেছে। উল্লেখ্য টানা ৩৪ ম্যাচ ধরে অপরাজিত মরক্বো দল।
তবে কোয়ার্টার ফাইনালের পরীক্ষাটা হবে সবচেয়ে কঠিন। সামনে ফ্রান্স, সামনে কিলিয়ান এমবাপ্পে। প্যারাগুয়ের বিপক্ষে ফ্রান্স খুব ঝলমলে ফুটবল খেলেনি। ম্যাচটা ছিল কঠিন, গরমে ক্লান্তিকর, লড়াইটা ছিল ধৈর্যের। শেষ পর্যন্ত দেজিরে দুয়ের আদায় করা পেনাল্টি থেকে গোল করে ফ্রান্সকে ১-০ ব্যবধানে জিতিয়ে দেন এমবাপে। সেই গোলেই এবারের বিশ্বকাপে তার গোলসংখ্যা দাঁড়ায় ৭।
ফ্রান্সের জন্য স্বস্তি, তারা খারাপ দিনেও জিততে জানে। কিন্তু সতর্কবার্তাও আছে। প্যারাগুয়ের বিপক্ষে দিদিয়ে দেশমের দলের আক্রমণভাগ প্রত্যাশামতো ধারালো ছিল না। এমবাপ্পে গোল করেছেন, কিন্তু ওপেন প্লে থেকে ফ্রান্স খুব বেশি পরিষ্কার সুযোগ তৈরি করতে পারেনি। মরক্কোর মতো সংগঠিত, দ্রুত এবং আত্মবিশ্বাসী দলের বিপক্ষে এমন ম্যাচ যথেষ্ট হবে কি না, সেই প্রশ্ন থাকছেই।
মরক্কোর সবচেয়ে বড় শক্তি এখন শুধু রক্ষণ নয়। ২০২২ সালে তারা বেশি আলোচিত হয়েছিল প্রতিরোধ, শৃঙ্খলা ও পাল্টা আক্রমণের জন্য। এবার মোহাম্মদ ওয়াহবির অধীনে দলটি আরও আক্রমণাত্মক, প্রেসিংনির্ভর এবং বল পায়ে আত্মবিশ্বাসী। তবে কানাডার বিপক্ষে পরিস্থিতি বুঝে আবারও পুরোনো মরক্কোকেই দেখা গেছে, নিচে নেমে চাপ সামলানো, ছন্দ ভাঙা এবং সুযোগ পেলে নির্মম হওয়া।
ইসমায়েল সাইবারি, ব্রাহিম দিয়াজ, উনাহি, আশরাফ হাকিমি, ইয়াসিন বুনু, সবাই মিলে দলটিকে আরও সম্পূর্ণ করে তুলেছেন। তবে কানাডার বিপক্ষে সাইবারির চোট মরক্কোর জন্য চিন্তার জায়গা। টুর্নামেন্টে দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আক্রমণভাগের খেলোয়াড় তিনি। তাঁর ঊরুতে ব্যথা আছে, তবে চোটের মাত্রা জানতে আরও অপেক্ষা করতে হবে।
ফ্রান্স-মরক্কো ম্যাচে আবেগের স্তরও কম নয়। ফরাসি ফুটবলের সঙ্গে মরক্কোর ফুটবল-সংস্কৃতির গভীর সংযোগ আছে। মরক্কোর অনেক খেলোয়াড় ইউরোপে বেড়ে ওঠা, অনেকের ফুটবল শিক্ষা ফরাসি বা বেলজিয়ান কাঠামোর সঙ্গে জড়িত। আবার ২০২২ সালের সেই সেমিফাইনালের স্মৃতিও আছে, যেখানে মরক্কো সাহস দেখিয়েও ফাইনালের দরজা খুলতে পারেনি।
এবার তাই ম্যাচটা শুধু কোয়ার্টার ফাইনাল নয়, মরক্কোর জন্য এক ধরনের হিসাব মেলানোর সুযোগও। ফ্রান্সের জন্য এটি শিরোপা জয়ের পথে আরেকটি বাধা। এমবাপ্পেদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকবে এমন এক দল, যারা এখন নিজেদের বড় দলের কাতারেই ভাবতে শিখেছে। আর মরক্কোর সামনে থাকবে এমন এক দল, যারা বিশ্বকাপের এই পর্যায়ে জেতাকে অভ্যাস বানিয়ে ফেলেছে।
শেষ পর্যন্ত লড়াইটা হতে পারে ফ্রান্সের তারকাখচিত শক্তি বনাম মরক্কোর সম্মিলিত সাহসের। এমবাপ্পে যদি জায়গা পান, ম্যাচ একাই বদলে দিতে পারেন। কিন্তু মরক্কো যদি ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, হাকিমিদের ডান দিক, দিয়াজের সৃজনশীলতা আর উনাহির বক্সের বাইরের হুমকি ফ্রান্সকেও অস্বস্তিতে ফেলতে পারে।
২০২২ সালে মরক্কোর স্বপ্ন থামিয়েছিল ফ্রান্স। ২০২৬ সালে সেই স্বপ্ন কি এবার ফ্রান্সকেই থামাবে, নাকি এমবাপ্পেরা আবারও বড় মঞ্চের নির্মম বাস্তবতা মনে করিয়ে দেবেন, উত্তর মিলবে কোয়ার্টার ফাইনালে।




