ওলিসের ঝাপসা ছবির যে মিথ্যা গল্পে বিভ্রান্ত সবাই

ফ্রান্সের ফুটবলার মাইকেল ওলিসের ইনস্টাগ্রামে ঢুকে অবাক হয়েছিলেন অনুসারীরা। বিশ্বকাপ চলাকালে সেখানে একের পর এক ঝাপসা, দানাদার ও পিক্সেল ভেঙে যাওয়া ছবি প্রকাশ করা হচ্ছিল। কোনোটি এতটাই অস্পষ্ট ছিল যে ছবির মানুষটিকেও ঠিকমতো চেনা যাচ্ছিল না।
মন্তব্যের ঘরে শুরু হয় হাসি-তামাশা। কেউ লেখেন, ছবিগুলো পুরোনো নকিয়া ফোন দিয়ে তোলা হয়েছে। কেউ আবার প্রশ্ন করেন, ওলিসের আলোকচিত্রী কি বাড়িতে বসে কাজ করছেন?
এর মধ্যেই ছড়িয়ে পড়ে চমকপ্রদ একটি গল্প। দাবি করা হয়, ফরাসি আলোকচিত্রী ফ্লোরেন্স পেরনেকে বিশ্বকাপের অনুমতিপত্র দেয়নি ফিফা। এর প্রতিবাদে ঘরে বসে টেলিভিশনের পর্দা থেকে ওলিসের ছবি তুলছেন তিনি। অথচ ওলিস তাকে কোনো কৃতিত্বও দিচ্ছেন না।
ফিফার প্রত্যাখ্যান, এক আলোকচিত্রীর অভিনব প্রতিশোধ এবং রহস্যময় ইনস্টাগ্রাম—সব মিলিয়ে গল্পটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমও একই দাবি প্রকাশ করে। দ্য গার্ডিয়ান পর্যন্ত লিখেছিল, পেরনের তোলা ছবিই নিজের ইনস্টাগ্রামে প্রকাশ করেছেন ওলিস।

কিন্তু গল্পটির সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, এর গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর কোনোটিই সত্য নয়।
বিষয়টি নিয়ে মুখ খুলতে বাধ্য হন পেরনে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি ওলিসের আলোকচিত্রী নন এবং ফুটবলারটির ইনস্টাগ্রামের ছবিগুলোও তোলেননি। এমনকি বিশ্বকাপের অনুমতিপত্র চেয়ে ফিফার কাছে আবেদনই করেননি তিনি। তাই ফিফা তাকে প্রত্যাখ্যান করেছে কিংবা তিনি প্রতিশোধ নিচ্ছেন, এমন দাবিরও ভিত্তি নেই।

পেরনের আলাদা একটি প্রকল্প অবশ্য সত্য। বিশ্বকাপের ম্যাচ টেলিভিশনে দেখে সরাসরি পর্দার ছবি তুলেছেন তিনি। পর্দার পিক্সেল, ঝাপসা রং এবং ক্যামেরার সেন্সরের কারণে তৈরি বিশেষ নকশা তার ছবিগুলোকে আলাদা চেহারা দিয়েছে। সেই কাজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনাও তৈরি করেছে।
একই সময়ে প্রায় একই ধরনের ছবি প্রকাশ করতে শুরু করেন ওলিস। দুই প্রকল্পের দৃশ্যগত মিল দেখেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহারকারীরা ধরে নেন, ছবিগুলো পেরনের তোলা। পরে সেই অনুমানের সঙ্গে ফিফার প্রত্যাখ্যান ও প্রতিশোধের গল্প যুক্ত হয়। কিছু সংবাদমাধ্যমও যথাযথ যাচাই ছাড়াই তা প্রকাশ করায় দাবিটি আরও বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে। একটি আলোকচিত্রবিষয়ক সংবাদমাধ্যম সরাসরি লিখেছিল, অনুমতি না পেয়েই টেলিভিশনের ছবি তোলার পথে গিয়েছেন পেরনে।
পেরনের ব্যাখ্যা এবং মার্কার অনুসন্ধান অনুযায়ী, ওলিসের ছবিগুলোর প্রকৃত আলোকচিত্রী জার্মানির লুকাস কোরশান। বিশ্বকাপে ওলিসের সঙ্গে থেকে ছবি তুলেছেন তিনি এবং ফুটবলারটির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জন্য আলাদা একটি দৃশ্যভাষা তৈরি করেছেন।
এই ধরনের ছবি তোলার ধারণাটিও নতুন নয়। বেলজিয়ান আলোকচিত্রী হ্যারি গ্রুইয়ার্ট ১৯৭২ সালে টেলিভিশনের পর্দায় প্রচারিত মিউনিখ অলিম্পিক ও মহাকাশ অভিযানের ছবি তুলেছিলেন। পরে তার সেই কাজ ‘টিভি শটস’ নামে পরিচিত হয়। ওলিসের ছবিগুলোতেও সেই পুরোনো ধারার প্রভাব রয়েছে।
শেষ পর্যন্ত দেখা গেল, পেরনের টেলিভিশন থেকে তোলা ছবি সত্য, ওলিসের অদ্ভুত ছবিগুলোও সত্য। তবে দুটি আলাদা কাজকে একসঙ্গে জুড়ে তৈরি করা ফিফার প্রত্যাখ্যান ও প্রতিশোধের গল্পটি ছিল ইন্টারনেটের বানানো।




