চুয়াডাঙ্গায় ‘কোরআন শিক্ষা কর্মসূচি’ কেন্দ্র করে বিএনপি-জামায়াত মুখোমুখি

এশিয়া পোস্ট নিউজ, চুয়াডাঙ্গা
চুয়াডাঙ্গায় ‘কোরআন শিক্ষা কর্মসূচি’ কেন্দ্র করে বিএনপি-জামায়াত মুখোমুখি
প্রশাসনের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেন। ছবি: এশিয়া পোস্ট

চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলা মডেল মসজিদে জামায়াতে ইসলামীর নারী সংগঠনের কোরআন শিক্ষা প্রশিক্ষণ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে।

শনিবারের (১১ জুলাই) ঘটনার জের ধরে পরদিন রোববার বিকেলে উভয়পক্ষ মুখোমুখি অবস্থানে গেলে এলাকায় চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। শহরে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। পরে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত শনিবার দুপুরে দামুড়হুদা উপজেলা মডেল মসজিদের একটি কক্ষ ভাড়া নিয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নারী বিভাগের উদ্যোগে শতাধিক নারীর অংশগ্রহণে কোরআন শিক্ষা প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। এ সময় বিএনপির স্থানীয় কয়েকজন নেতা সেখানে উপস্থিত হয়ে কর্মসূচির বিষয়ে জানতে চান। জামায়াত নেতারা এটিকে কোরআন শিক্ষা প্রশিক্ষণ বলে দাবি করলেও বিএনপি নেতাকর্মীদের অভিযোগ ছিল, সেখানে গোপন রাজনৈতিক বৈঠক চলছিল।

এ সময় উভয়পক্ষের মধ্যে বাগ্‌বিতণ্ডা হয়। ঘটনার একপর্যায়ে দুটি মাইক্রোবাস দ্রুত স্থান ত্যাগ করলে বিএনপি নেতাকর্মীদের সন্দেহ আরও বৃদ্ধি পায়। তাদের দাবি, ওই গাড়িগুলোতে অস্ত্র থাকতে পারে। তবে এ বিষয়ে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করে এবং কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারী নারীদের নিরাপদে সরিয়ে দেয়।

এ ঘটনার প্রতিবাদে রোববার বিকেলে জামায়াতের দামুড়হুদা উপজেলা শাখা বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশের কর্মসূচি ঘোষণা করে। খবর পেয়ে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরাও পৃথক বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। এ সময় তিন জামায়াত কর্মী মারধরের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ ওঠে।

এদিকে এ ঘটনার পর রোববার ‘জুলাই সনদ’ নামে একটি আইডি থেকে দামুড়হুদা উপজেলা বিএনপির যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মন্টু মিয়াকে নিয়ে একটি পরকীয়া সংক্রান্ত পোস্ট দেওয়া হয়। ওই পোস্টটি শেয়ার করেন উপজেলার কুনিয়াচাঁদপুর গ্রামের আজিজের ছেলে ও দামুড়হুদা সদর ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ড শিবিরের সভাপতি সুমন। এরপর বিএনপির ক্ষুব্ধ কর্মীরা সুমনকে তার দোকান থেকে ধরে এনে মারধর করেন। আহত সুমনকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। পরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে জামায়াতের নেতাকর্মীরা লাঠিসোঁটা নিয়ে বিক্ষোভ মিছিল করেন।

খবর পেয়ে চুয়াডাঙ্গার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক বি এম তারিক উজ জামান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোস্তাফিজুর রহমান, দামুড়হুদা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লাভলী ইয়াসমিন, সহকারী কমিশনার (ভূমি) শাহিন আলম, দামুড়হুদা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মেজবাহ উদ্দিনসহ প্রশাসনের কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন।

পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে জামায়াতের নেতাকর্মীরা লাঠিসোঁটা নিয়ে বিক্ষোভ মিছিল করেন। ছবি: এশিয়া পোস্ট
পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে জামায়াতের নেতাকর্মীরা লাঠিসোঁটা নিয়ে বিক্ষোভ মিছিল করেন। ছবি: এশিয়া পোস্ট

পরে জেলা জামায়াতের নায়েবে আমির মাওলানা আজিজুর রহমান এবং উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি আবেদ উদ দৌলা টিটন তাদের নেতাকর্মীদের শান্ত থাকার আহ্বান জানান।

অপরদিকে প্রশাসন উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক রফিকুল হাসান তনু, যুগ্ম সম্পাদক মন্টু মিয়া ও সাংগঠনিক সম্পাদক প্রভাষক আবুল হাশেমের সঙ্গে কথা বলে উভয়পক্ষকে সরে যেতে অনুরোধ করে। প্রশাসনের মধ্যস্থতায় দুপক্ষই স্থান ত্যাগ করলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।

এ ঘটনায় এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সতর্ক অবস্থানে থাকার কথা জানানো হয়েছে।

এ ঘটনার পর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লাভলী ইয়াসমিন রোববার বিকেল ৪টায় তার দপ্তরে বিএনপি ও জামায়াতের নেতাদের মীমাংসার জন্য ডাকেন। ওই সময় সেখানে উত্তেজনাকর পরিবেশ তৈরি হলে মীমাংসা ভেস্তে যায়।

উপজেলা বিএনপির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, শনিবার দুপুরে উপজেলা মডেল মসজিদ মিলনায়তনে কোনো অনুমতি না নিয়ে নারীদের জড়ো করে তালিম উল কোরআন প্রশিক্ষণ দেওয়ার কারণে উপজেলা বিএনপির পক্ষ থেকে প্রতিবাদ করা হয়। এই প্রতিবাদের কারণে সেখানে উপস্থিত দুপক্ষের নেতাকর্মীদের মধ্যে ধাক্কাধাক্কিও হয়।

জামায়াতের নেতারা দাবি করেন, তাদের দলীয় কর্মকাণ্ড হবে, তাতে বাধা কীসের। নিয়ম মেনেই এ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

দামুড়হুদা উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক রফিকুল হাসান তনু বলেন, মডেল মসজিদ একটি রাজনৈতিক দলের কার্যালয় হতে পারে না। আমরা মডেল মসজিদ মিলনায়তনে মিটিং করতে চাইলে কর্তৃপক্ষ আমাদের অনুমোদন দেয় না। ফেসবুকে ফেক আইডি ব্যবহার করে আমাদের দলের নেতাকর্মীদের চরিত্রহনন করছে। আর ওই চরিত্রহননের বিষয়গুলো ওই দলের নেতাকর্মীরা তাদের ফেসবুক আইডিতে শেয়ার করে অস্থিতিশীল অবস্থা তৈরি করছে।

চুয়াডাঙ্গার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বিএনপি-জামায়াত আলাদা মিছিল বের করলে শহরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরে নেতাদের সঙ্গে কথা বলে উভয়পক্ষকে বুঝিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করা হয়।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লাভলী ইয়াসমিন বলেন, উপজেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বর্তমানে স্বাভাবিক আছে। অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির ঘটনা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।