অবহেলা আর দখলে জৌলুস হারাচ্ছে ‘সেনাপতির দিঘি’

এশিয়া পোস্ট নিউজ, মাদারীপুর
অবহেলা আর দখলে জৌলুস হারাচ্ছে ‘সেনাপতির দিঘি’
সেনাপতির দিঘি। ছবি: এশিয়া পোস্ট

শত শত বছর ধরে মানুষের বিশ্বাস, প্রার্থনা আর লোককথার নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার খাতিয়াল গ্রামের ঐতিহাসিক ‘সেনাপতির দিঘি’। তবে একসময়ের প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য ও বিশাল বৃক্ষরাজিতে ঘেরা এই ঐতিহ্যবাহী জলাধারটি বর্তমানে অবৈধ দখল, অবহেলা ও দিন দিন সংকুচিত হয়ে জৌলুস হারাচ্ছে।

ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, ১৬৬৫ সালের ২৪ ডিসেম্বর সুবেদার শায়েস্তা খানের জ্যেষ্ঠপুত্র উমেদ খানের নেতৃত্বে পরিচালিত নৌ-অভিযানের সময় এ অঞ্চলে পানির সংকট দেখা দেয়। তখন সেনাপতি ইসলাম খাঁর অধীনস্থ সৈন্যরা প্রায় ছয় একর জমির ওপর এই দিঘিটি খনন করেন। সেই থেকে জলাশয়টি ‘সেনাপতির দিঘি’ নামে পরিচিতি পায় এবং সময়ের পরিক্রমায় এলাকার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও লোকজ ঐতিহ্যের অংশে পরিণত হয়।

স্থানীয়দের দাবি, এই দিঘির পাড়ে এসে আন্তরিকভাবে মানত করলে মনের আশা পূরণ হয়। তাই আজও প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে নানা সংকট থেকে মুক্তি পাওয়ার আশায় দূর-দূরান্তের মানুষ এখানে ছুটে আসেন।

কিন্তু শত বছরের এই ঐতিহাসিক দিঘি আজ নানা সংকটে জর্জরিত। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী একটি মহল ধীরে ধীরে দিঘির চারপাশ দখল করে নিচ্ছে। কোথাও গাছ লাগিয়ে, কোথাও মাটি ভরাট করে দিঘির আয়তন ছোট করে ফেলা হচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দা রুবায়েত হোসেন বলেন, একসময় এটি বিশাল দিঘি ছিল। এখন দেখলে সাধারণ একটি পুকুর মনে হয়। ঐতিহ্য রক্ষায় প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।

সুমন বেপারী, আক্কেল মাতুব্বর, রেদোয়ান মাতুব্বর, সুফিয়ান খান, হুমায়ূন আহমেদ ও কিবরিয়া হাওলাদারসহ অনেকেই জানান, দিঘিটি বর্তমানে প্রভাবশালী মাছ শিকারিদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে। ফলে সাধারণ মানুষ এর সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

স্থানীয়দের মতে, ঐতিহাসিক এই দিঘিকে ঘিরে পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা হলে একদিকে যেমন সংরক্ষিত হবে শত বছরের ঐতিহ্য, অন্যদিকে সরকারের রাজস্ব আয়ও বাড়বে। পরিবেশবাদী সংগঠন ‘প্রকৃতির বন্ধু’-র প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক রাজন মাহমুদ বলেন, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও ঐতিহ্য রক্ষায় দিঘিটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সঠিক পরিকল্পনায় এটি একটি আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র হতে পারে।

মাদারীপুরের ইতিহাস গবেষক সুবল বিশ্বাস বলেন, সেনাপতির দিঘি শুধু একটি জলাশয় নয়, এটি মাদারীপুরের ইতিহাস ও সংস্কৃতির অংশ। এর সংরক্ষণ আমাদের সবার দায়িত্ব।

কালকিনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফ-উল-আরেফীন বলেন, দিঘিটি দখল হয়ে যাওয়ার বিষয়ে অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি সরেজমিনে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমাদের লক্ষ্য, এই ঐতিহাসিক ঐতিহ্য যেন হারিয়ে না যায় এবং নতুন প্রজন্মের জন্য সংরক্ষিত থাকে।