ঢাকার পানি নামার ৪১ গেটের ২২টিই অচল

রাজধানীতে শনিবার সকাল থেকে শুরু হওয়া বৃষ্টি রোববার মধ্যরাতের পর রূপ নেয় অতি ভারী বর্ষণে। দুই দিনে ঢাকায় ১৯২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। টানা এই বর্ষণে রাজধানীর নীলক্ষেত, জিগাতলা, গেন্ডারিয়া, মতিঝিল, শান্তিনগর, কাকরাইল, কমলাপুর, শাহজাহানপুর, পুরান ঢাকা, মিরপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। কোথাও চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও পানি নামেনি। অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী ও খেটে খাওয়া মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছায়।
তবে বিশেষজ্ঞ ও প্রকৌশলীরা বলছেন, শুধু অতিবৃষ্টি নয়, রাজধানীর জলাবদ্ধতার বড় কারণ পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার অকার্যকারিতা। খাল, স্লুইসগেট, পাম্পস্টেশন ও ড্রেনেজ অবকাঠামোর বড় অংশ ঠিকমতো কাজ করছে না। ফলে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো থাকার পরও সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ, যন্ত্রপাতির অচলাবস্থা এবং বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়হীনতার কারণে প্রতিবছর একই দুর্ভোগের মুখে পড়তে হচ্ছে নগরবাসীকে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রকৌশল বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বৃষ্টির পানি নদীতে নিষ্কাশনের অন্যতম প্রধান অবকাঠামো ৪১টি স্লুইসগেটের মধ্যে মাত্র ১৯টি কার্যকর রয়েছে। বাকি ২২টির মধ্যে ছয়টি সম্পূর্ণ অচল ও ১৫টি আংশিক সচল থাকলেও কার্যকরভাবে পানি নিষ্কাশনে ভূমিকা রাখতে পারছে না। আবার এসব স্লুইসগেট পরিচালনার জন্য সিটি করপোরেশনের নিজস্ব পর্যাপ্ত জনবলও নেই।
একই সঙ্গে রাজধানীর আটটি প্রধান পানি নিষ্কাশন আউটলেটের একটি গুরুত্বপূর্ণ পাম্পস্টেশনের তিনটি বড় পাম্পের মধ্যে একটি দীর্ঘদিন ধরে বিকল রয়েছে। অন্য পাম্পগুলোও পূর্ণ সক্ষমতায় কাজ করতে পারছে না। ড্রেনে জমে থাকা বর্জ্য দ্রুত অপসারণের জন্য দুই সিটি করপোরেশনের পাঁচটি সাকার মেশিনের মধ্যে একটি দীর্ঘদিন ধরে অচল। অন্যদিকে দুই সিটির আওতায় থাকা ২৬টি খালের বড় অংশ পানিপ্রবাহের জন্য প্রয়োজনীয় সক্ষমতা হারিয়েছে।
আট আউটলেট ও পুরোনো ড্রেনেজ নকশায় জলজট নগরীতে
দুই সিটি করপোরেশন সূত্র বলছে, রাজধানীর জলাবদ্ধতার পেছনে শুধু অতিবৃষ্টি নয়, বরং সীমিত পানি নিষ্কাশন অবকাঠামো, পুরোনো ড্রেনেজ ব্যবস্থা, খাল দখল, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব—সব মিলিয়ে একটি জটিল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। প্রায় ৩০৬.৩৮ বর্গকিলোমিটার এলাকায় ১২৯টি ওয়ার্ডে প্রায় আড়াই কোটি মানুষের বসবাস। অথচ এই বিশাল এলাকার বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের জন্য কার্যকরভাবে নির্ভর করতে হয় মাত্র আটটি আউটেলেটে। মালিবাগ, শান্তিনগর, পল্টন ও মতিঝিল এলাকার পানি টিটিপাড়া পাম্প স্টেশনের মাধ্যমে নিষ্কাশিত হয়।
পুরান ঢাকা, আজিমপুর, গুলিস্তান ও হাজারীবাগ এলাকার পানি ধোলাইখাল-সূত্রাপুর হয়ে বুড়িগঙ্গা নদীতে যায়। গ্রিন রোড, তল্লাবাগ ও পান্থপথ এলাকার পানি হাতিরঝিল হয়ে রামপুরা পাম্প স্টেশনে পৌঁছে। আশুলিয়া এলাকার পানি গোড়ান চটবাড়ি এলাকা দিয়ে, এয়ারপোর্ট এলাকার পানি আব্দুল্লাহপুর আউটলেট, শ্যামলী মোহাম্মদপুর এলাকার পানি কল্যাণপুর এলাকা দিয়ে। আর যাত্রাবাড়ী, শ্যামপুর, জুরাইন ও ডিএনডি এলাকার কিছু অংশের পানি শিমরাইল পাম্প স্টেশনের মাধ্যমে শীতলক্ষ্যা নদীতে নিষ্কাশন করা হয়।
এর মধ্যে হাতিরঝিল পরিচালনা করে রাজউক, কল্যাণপুর ও রামপুরা আউটলেট পরিচালনা করে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি), ধোলাইখাল ও কমলাপুর-টিটিপাড়া আউটলেট পরিচালনা করে ডিএসসিসি, আব্দুল্লাহপুর ও গোড়ান-চটবাড়ি এলাকার আউটলেট পরিচালনা করে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং শিমরাইল আউটলেট নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন পরিচালনা করে।
এদিকে, কমলাপুর স্টেডিয়ামসংলগ্ন টিটিপাড়া পাম্পস্টেশন দিয়ে প্রতি মিনিটে প্রায় ৮ লাখ ৫৫ হাজার লিটার পানি অপসারণের সক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু তিনটি বড় পাম্পের মধ্যে একটি প্রায় দেড় বছর ধরে বিকল। সম্প্রতি নতুন পাম্প কেনার জন্য দরপত্র সম্পন্ন হলেও চলমান বর্ষা মৌসুমে সেটি সচল করা সম্ভব হয়নি।
করপোরেশনের প্রকৌশলীদের দাবি, মেগাসিটি ঢাকার জলবদ্ধতা নিরসনে এত কম সংখ্যক আউটলেট পর্যাপ্ত নয়। কিন্তু পাঁচ দশক আগেও নগরীতে যে কয়টি আউটলেট ছিল এখনও সে কয়টি আউটিলেটের মাধ্যমে পানি নিষ্কাষণ হচ্ছে। নগরপিতা পরিবর্তন হলেও কেউ এই বিষেয়ে নগর দেয়নি।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, রাজধানীতে স্বল্প সময়ে টানা বৃষ্টিপাত হলে বিপুল পরিমাণ পানি একসঙ্গে মাত্র সাতটি আউটলেট দিয়ে নিষ্কাশন করা সম্ভব হয় না। ফলে বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘ সময় ধরে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়।
আবহাওয়ার দীর্ঘমেয়াদি তথ্যও দেখাচ্ছে, বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন এসেছে। ১৯৫৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ঢাকার বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত ২ হাজার ১৭ দশমিক ৭ মিলিমিটার।
যদিও মোট বার্ষিক বৃষ্টিপাতের প্রবণতা কিছুটা কমেছে, তবে অল্প সময়ে অতিভারী বৃষ্টিপাতের ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ঢাকায় একদিনে সর্বোচ্চ ৩৪১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয় ২০০৪ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর। একই সময়ে টানা দুই দিনে ৪৯৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছিল, যা অস্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৫৩ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে ৪৭ বছরে মাত্র তিনবার একদিনে ২৫০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছিল। কিন্তু ২০০১ থেকে ২০২৪ সালের মাত্র ২৪ বছরে একই মাত্রার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে তিনবার। অর্থাৎ বৃষ্টিপাতের ঘনত্ব ও তীব্রতা আগের তুলনায় বেড়েছে, যা পুরোনো ড্রেনেজ ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।
প্রকৌশলীরা বলছেন, রাজধানীর অনেক ড্রেনেজ লাইন কয়েক দশক আগে নির্মিত। তখনকার বৃষ্টিপাতের হিসাব অনুযায়ী এগুলোর নকশা করা হয়েছিল। বর্তমানে অল্প সময়ে অনেক বেশি বৃষ্টিপাত হওয়ায় পুরোনো ড্রেনগুলো সেই চাপ নিতে পারছে না। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে পানির দীর্ঘ নিষ্কাশন পথ।
তারা বলছেন, অনেক এলাকার পানি সরাসরি নদীতে না গিয়ে একাধিক এলাকা ঘুরে দূরের আউটলেটে গিয়ে পড়ে। ফলে এক এলাকার সঙ্গে অন্য এলাকার পানির চাপ যুক্ত হয়ে জলাবদ্ধতা আরও দীর্ঘস্থায়ী হয়। এ ছাড়া ড্রেনে পলিথিন, প্লাস্টিক, রাবার, স্পঞ্জসহ বিভিন্ন বর্জ্য জমে থাকায় পানিপ্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে। নিয়মিত পরিষ্কার করার পরও অল্প সময়ের মধ্যে আবারও ড্রেন ভরাট হয়ে যাচ্ছে।
ডিএসসিসির বিদ্যুৎ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী নূর মোহাম্মদ বলেন, ধোলাইখালের তিনটি পাম্প সচল থাকলেও টিটিপাড়ার তিনটি পাম্পের মধ্যে একটি নষ্ট রয়েছে। এর জন্য দরপত্র সম্পন্ন হয়েছে এবং আগামী সপ্তাহে নতুন পাম্প সংযোজনের পরিকল্পনা রয়েছে।
৪১ স্লুইসগেটের ২২টিই অচল
২০২২ সালের মার্চে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাছ থেকে ৫৫টি স্লুইসগেটের দায়িত্ব নেয় ডিএসসিসি। তবে সম্প্রতি ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং (আইডব্লিউএম) মাঠপর্যায়ে যাচাই করে মাত্র ৪১টি স্লুইসগেটের অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছে। এর মধ্যে ছয়টি পুরোপুরি অকেজো ও ১৫টি আংশিক সচল।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, দীর্ঘদিন রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অধিকাংশ স্লুইসগেটের যান্ত্রিক অংশ নষ্ট হয়ে গেছে। নদীতে জোয়ারের সময় ব্যাক-ফ্লো ঠেকাতে অনেক সময় স্লুইসগেট বন্ধ রাখতে হয়। তখন পাম্পিংয়ের ওপর নির্ভরতা বেড়ে যায়। কিন্তু পাম্পও পুরোপুরি সচল না থাকায় পানি দীর্ঘ সময় আটকে থাকে।
ডিএসসিসির প্রকৌশলীদের দাবি, ওয়াসা থেকে পানি উন্নয়ন বোর্ডে হস্তান্তরের পর দীর্ঘদিন যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়ায় স্লুইসগেটগুলোর বর্তমান অবস্থা তৈরি হয়েছে।
ডিএসসিসির প্রকৌশল বিভাগ জানিয়েছে, নয়াপল্টন, সেগুনবাগিচা, কাকরাইল, শান্তিনগর, শাহজাহানপুর, মতিঝিল ও কমলাপুর এলাকার পানি নালা-নর্দমা ও বক্স কালভার্ট হয়ে টিটিপাড়া পাম্পস্টেশনে গিয়ে জমা হওয়ার কথা। কিন্তু সেখানে যাওয়ার আগেই বিভিন্ন স্থানে পানি আটকে যাচ্ছে।
প্রকৌশলীদের ভাষ্য, পাম্পস্টেশনের সক্ষমতা থাকলেও সেখানে পানি পৌঁছানোর জন্য যে ড্রেন ও কালভার্ট রয়েছে, সেগুলোর ধারণক্ষমতা কমে গেছে। ফলে ভারী বৃষ্টির সময় পানি দ্রুত নিষ্কাশন সম্ভব হচ্ছে না।
অন্যদিকে ধোলাইখাল পাম্পস্টেশন দিয়ে গেন্ডারিয়া, ওয়ারী, সূত্রাপুরসহ পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকার পানি বুড়িগঙ্গা নদীতে নিষ্কাশিত হওয়ার কথা। ঘণ্টায় প্রায় ৮ কোটি ১০ লাখ লিটার পানি অপসারণে সক্ষম এই স্টেশনেও কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ পানি পৌঁছায় না। কারণ, সংযুক্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থার বড় অংশ বর্জ্যে ভরাট হয়ে আছে।
প্রকৌশলীদের মতে, ধোলাইখাল বক্স কালভার্টের প্রায় ৪০ শতাংশ অংশ বর্তমানে বর্জ্যে ভরাট হয়ে গেছে।
নীলক্ষেত–জিগাতলার দুর্ভোগের পেছনে বন্ধ দুটি ড্রেন
প্রতি বর্ষায় নীলক্ষেত থেকে জিগাতলা পর্যন্ত জলাবদ্ধতা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার পেছনে পুরোনো একটি সমস্যার কথা তুলে ধরেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
সিটি করপোরেশন সূত্র জানায়, এরশাদ সরকারের সময় আজিমপুর ও নিউমার্কেট এলাকার পানি দ্রুত বুড়িগঙ্গায় পাঠানোর জন্য তিনটি বড় ড্রেন নির্মাণ করা হয়েছিল।
২০০৯ সালের বিডিআর বিদ্রোহের পর নিরাপত্তাজনিত কারণে বিজিবি সদরদপ্তরের ভেতর দিয়ে যাওয়া দুটি ৩০ ইঞ্চি ড্রেন স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। তৃতীয় ড্রেনটি চালু থাকলেও নিউমার্কেট এলাকার প্লাস্টিক, কাপড় ও অন্যান্য বর্জ্যে সেটির মুখ প্রায়ই বন্ধ হয়ে যায়।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ড্রেনের ম্যানহোলগুলোর অবস্থান দূরে হওয়ায় পরিষ্কার করাও কঠিন হয়ে পড়ে। ২০২২ সালে বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে সিটি করপোরেশনের নজরে এলেও এখনো স্থায়ী সমাধান হয়নি।
স্থায়ী সমাধানের খোঁজে আইডব্লিউএম
ডিএসসিসির এক থেকে পাঁচ নম্বর অঞ্চলের জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান খুঁজতে ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিংকে সমীক্ষার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে সংস্থাটি মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ শুরু করেছে।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সমীক্ষা শেষে ড্রেনেজ নেটওয়ার্কের আধুনিকায়ন, পানির নিষ্কাশন পথ সংক্ষিপ্ত করা, অকার্যকর স্লুইসগেট মেরামত, পাম্পের সক্ষমতা বাড়ানো এবং নতুন সাকার মেশিন যুক্ত করার সুপারিশ বাস্তবায়ন করা হবে।
বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসান বলেন, ‘ঢাকা শহরের জলাবদ্ধতা আসলে একটি নানাবিধ ও জটিল সমস্যা। আমরা যদি জলবায়ু বা প্রযুক্তির জটিলতায় না গিয়ে সহজভাবে পানি চক্রের মাধ্যমে বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করি, তবে মূল সংকটটি পরিষ্কার হবে। স্বাভাবিক পানি চক্র অনুযায়ী বৃষ্টি হলে দুটি ঘটনা ঘটে—পানির একটি অংশ ভূপৃষ্ঠ দিয়ে গড়িয়ে নিচু এলাকার দিকে চলে যায়, আর অন্য অংশটি মাটির নিচে প্রবেশ করে, যা ভূগর্ভস্থ পানির স্তরকে সমৃদ্ধ করে। কিন্তু ঢাকা শহরে এই দুটি প্রাকৃতিক পথই সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ। আমাদের শহরের উপরিভাগ বা সারফেসকে আমরা কনক্রিট দিয়ে ঢেকে ফেলেছি।’
তিনি বলেন, ‘১৯৯৫ সালের দিকেও ঢাকার প্রায় ৪০ ভাগের বেশি এলাকায় সবুজ উদ্ভিদ ও জলাভূমি ছিল, যার মাধ্যমে বৃষ্টির পানি সহজে মাটির নিচে চলে যেতে পারত। ২০২৩ সালের গবেষণায় দেখা গেছে, এই পরিমাণ ১০ ভাগের নিচে নেমে এসেছে। ফলে পানি মাটির নিচে যাওয়ার কোনো সুযোগ পাচ্ছে না। অতীতে ঢাকার যেসব এলাকা ফ্লাড ফ্লো জোন বা প্রাকৃতিক জলাধার ছিল, সেগুলো আবাসন কোম্পানিগুলো বালি ফেলে ভরাট করে ফেলেছে। অপরিকল্পিতভাবে অবকাঠামো গড়ে তোলায় পানি গড়িয়ে যাওয়ার কোনো পথ নেই। তার ওপর, আমাদের বিদ্যমান ড্রেনেজ ব্যবস্থার যে ধারণক্ষমতা, বৃষ্টি হলে পানি আসে তার চেয়ে অনেক বেশি। স্বাভাবিকভাবেই ড্রেন উপচে শহরে জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে।’
মেহেদী আহসান বলেন, ‘পানি গড়িয়ে যাওয়ার প্রধান মাধ্যম হলো ক্যানেল বা ড্রেন। কিন্তু ঢাকার খালগুলো দখল ও ময়লা-আবর্জনা ফেলে ভরাট করে ফেলা হয়েছে। ফলে পানি নিষ্কাশন পুরোপুরি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এমনকি অতিবৃষ্টিতে যখন চারপাশের নদীর পানির স্তরও বেড়ে যায়, তখন শহরের ক্যানেলের পানি আর নদীতে নামতে পারে না এবং দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়।’
এ নগরপরিকল্পনাবিদ বলেন, ‘জলাবদ্ধতা নিরসনে অবকাঠামোগত সংকটের চেয়েও বড় সংকট আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক জায়গায়। আগে এই ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিল ওয়াসা। যখন এটি সিটি কর্পোরেশনের কাছে ন্যস্ত করা হলো, তখন কিন্তু সিটি কর্পোরেশনের অর্গানোগ্রাম পুনর্গঠন বা লোকবল বৃদ্ধি করা হয়নি। এই বিশেষায়িত কাজটি করার জন্য পর্যাপ্ত ও দক্ষ জনবল সিটি কর্পোরেশনের নেই। ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন নতুন ‘জলাবদ্ধতা বিভাগ’ খোলার জন্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠিয়ে রাখলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে তা আটকে আছে।’
তিনি বলেন, পুরো শহরকে শুধু পাম্প-নির্ভর করে বাঁচানো সম্ভব নয়, কারণ এটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং রক্ষণাবেক্ষণ সাপেক্ষ। তবে বর্তমান বাস্তবায় এই মেগাসিটির জন্য মাত্র সাতটি আউটলেট কোনোভাবেই পর্যাপ্ত নয়। বর্তমানে যে স্লুইসগেটগুলো আছে সেগুলো দ্রুত কার্যকরের পাশাপাশি আরও স্লুইসগেট বাড়াতে হবে। এছাড়া আমাদের কেবল সাময়িক বা আপৎকালীন পাম্পিংয়ের ওপর নির্ভর না করে, দীর্ঘমেয়াদী নগর-পরিকল্পনার দিকে যেতে হবে। শহরের জলাশয়গুলো পুনরুদ্ধার করতে হবে এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করে দ্রুত দক্ষ জনবল নিয়োগ দিতে হবে।’
সংশ্লিষ্টদের মতামত
ডিএসসিসির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী রাজিব খাদেম বলেন, ‘রাজধানীর জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ ড্রেনেজ লাইনে জমে থাকা বর্জ্য ও ব্লকেজ। মানুষ নিয়মিত পলিথিন, প্লাস্টিক, রাবার ও স্পঞ্জ ফেলায় ড্রেন দ্রুত বন্ধ হয়ে যায়। একই সঙ্গে বর্তমানে বৃষ্টিপাতের তীব্রতা আগের তুলনায় বেড়েছে, অথচ পুরোনো ড্রেনেজ ব্যবস্থার ধারণক্ষমতা সেই চাপ সামাল দেওয়ার মতো নয়। অনেক এলাকার পানি দীর্ঘ পথ ঘুরে নদীতে পৌঁছায় বলেও জলাবদ্ধতা দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে।’
তিনি জানান, আইডব্লিউএমের সমীক্ষার সুপারিশ অনুযায়ী ড্রেনেজ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, পানি নিষ্কাশনের পথ সংক্ষিপ্ত করা, অকার্যকর স্লুইসগেট মেরামত, পাম্পের কার্যকারিতা বৃদ্ধি এবং নতুন সাকার মেশিন সংযোজনের পরিকল্পনা রয়েছে।
ডিএনসিসির প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান বলেন, ‘পরিস্থিতি মোকাবিলায় ড্রেন, নালা ও পানি নিষ্কাশনের পথ সচল রাখতে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। পানি জমে থাকা এলাকায় দ্রুত অপসারণে প্রয়োজনীয় জনবল ও যন্ত্রপাতি মোতায়েন করা হয়েছে এবং পাম্পগুলো সচল রাখা হচ্ছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন।’
তিনি বলেন, ‘অল্প সময়ে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত, দ্রুত নগরায়নের ফলে পানি ধারণক্ষমতা কমে যাওয়া, খাল ও ড্রেন ভরাট বা সংকুচিত হওয়া, অপরিকল্পিতভাবে বর্জ্য ফেলা এবং পুরোনো ড্রেনেজ ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ—এসব কারণ মিলিয়েই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, অবকাঠামোর আধুনিকায়নের পাশাপাশি নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, কার্যকর সমন্বয় এবং নাগরিকদের সচেতনতা ছাড়া রাজধানীর জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।








