হালান্ড-ছক নিয়েই নরওয়ে-ট্যাবু ভাঙতে প্রস্তুত ব্রাজিল

এশিয়া পোস্ট স্পোর্টস
হালান্ড-ছক নিয়েই নরওয়ে-ট্যাবু ভাঙতে প্রস্তুত ব্রাজিল
অনুশীলনে ব্রাজিল দল। ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বকাপে ব্রাজিলের সামনে এমন প্রতিপক্ষ খুব কমই আসে, যাদের বিপক্ষে ইতিহাস স্বস্তির নয়। নরওয়ে সেই বিরল নামগুলোর একটি। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল এখনো নরওয়েকে হারাতে পারেনি। চার দেখায় দুই হার, দুই ড্র। ১৯৯৮ বিশ্বকাপেও নরওয়ের কাছে ২-১ গোলে হেরেছিল সেলেসাওরা।

সেই অস্বস্তির ইতিহাস নিয়েই শেষ ষোলোর ম্যাচে নরওয়ের মুখোমুখি হচ্ছে ব্রাজিল। নিউ জার্সির ইস্ট রাদারফোর্ডে ম্যাচটি শুরু হবে স্থানীয় সময় রোববার বিকেলে, বাংলাদেশ সময় সোমবার রাত ২টায়। কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ের আগে তাই ব্রাজিলের সামনে শুধু নকআউট পরীক্ষা নয়, পুরোনো এক ট্যাবু ভাঙার চ্যালেঞ্জও।

নরওয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি চোখ বন্ধ করেই বলা যায়, আর্লিং হালান্ড। ম্যানচেস্টার সিটির এই স্ট্রাইকারকে এক মুহূর্ত জায়গা দিলেই ম্যাচ বদলে যেতে পারে। ব্রাজিলও সেটা খুব ভালো করেই জানে। কোচ কার্লো আনচেলত্তি বলেছেন, হালান্ডকে নতুন করে ব্যাখ্যা করার কিছু নেই, তার ডিফেন্ডাররা তাকে ভালোভাবেই চেনেন।

ব্রাজিলের মাঝমাঠের অন্যতম ভরসা ব্রুনো গিমারায়েসও পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন, হালান্ডকে থামানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো তার কাছে বল পৌঁছাতে না দেওয়া। ব্রুনো বলেছেন, ‘আমাদের চেষ্টা করতে হবে, যেন বল ওর কাছে না পৌঁছায়। আমরা আক্রমণ করলেও ওর কাছে সব সময় কাউকে থাকতে হবে, যেন জায়গা না পায়। কারণ এক বল পেলেই সে ম্যাচের সিদ্ধান্ত বদলে দিতে পারে।’

শুধু হালান্ড নয়, নরওয়ের শক্তি আরও বিস্তৃত। মার্টিন ওডেগার্ড মাঝমাঠে ছন্দ তৈরি করতে পারেন, সেট পিসে বিপদ বাড়াতে পারেন। নরওয়ে উচ্চতা, ক্রস ও দ্বিতীয় বলের লড়াই দিয়ে ব্রাজিলকে পরীক্ষা করবে, সেটাও জানেন ব্রুনো। তার ভাষায়, কর্নার বা ফ্রি-কিক পেলেই নরওয়ে গোলের জন্য সর্বশক্তি দেবে। তাই পুরো সপ্তাহ ধরেই ব্রাজিল তাদের শক্তি নিষ্ক্রিয় করার প্রস্তুতি নিয়েছে।

নরওয়েও অবশ্য নিজেদের বাস্তবতা জানে। কোচ স্তালে সলবাকেন বলেছেন, ব্রাজিল জয়ের দাবিদার হলেও তার দল সুযোগ তৈরি করতে পারে। তার বার্তা পরিষ্কার, উপলক্ষের চাপ নয়, ম্যাচটাই খেলতে হবে। হালান্ডকে সঠিক জায়গায় বল দেওয়ার পথ খুঁজে পাওয়াই হবে নরওয়ের বড় কাজ।

এই বিশ্বকাপে ব্রাজিলের মাঝমাঠে ব্রুনো নিজেই বড় প্রভাব রেখেছেন। জাপানের বিপক্ষে শেষ ৩২-এর ম্যাচে গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লির শেষ মুহূর্তের জয়সূচক গোলের মূল কারিগর ছিলেন তিনি। সেটি ছিল টুর্নামেন্টে তার চতুর্থ অ্যাসিস্ট। ২০০০ সালের পর বিশ্বকাপে এক আসরে চার গোলে সহায়তা করা ফুটবলারদের ছোট তালিকায় এখন তার নামও আছে।

জাপানের বিপক্ষে সেই জয় ব্রাজিলকে শেষ ষোলোয় তুলেছে, কিন্তু ম্যাচটি আনচেলত্তির জন্য সতর্কবার্তাও ছিল। গুছিয়ে রক্ষণ করা দলের বিপক্ষে ব্রাজিলকে ভাঙতে কষ্ট হয়েছে। নরওয়ে যদি একইভাবে জায়গা বন্ধ করে, সঙ্গে হালান্ড ও ওডেগার্ডের দ্রুত আক্রমণ যোগ করে, তাহলে ব্রাজিলের জন্য পরীক্ষা আরও কঠিন হবে।

একাদশ নিয়েও কিছু প্রশ্ন আছে। লুকাস পাকেতা চোটে নেই। রাফিনিয়া দুই সপ্তাহ পর অনুশীলনে ফিরেছেন, কিন্তু শুরু থেকে খেলার মতো পুরোপুরি ফিট নন। আনচেলত্তি জানিয়েছেন, তিনি বেঞ্চে থাকতে পারেন এবং প্রয়োজন হলে কিছু সময় খেলতে পারেন। নেইমারও ফিট, রাফিনিয়ার ফেরা ব্রাজিলকে আরও অভিজ্ঞ আক্রমণাত্মক বিকল্প দিচ্ছে।

তবে পাকেতার অনুপস্থিতি মাঝমাঠে ভারসাম্যের প্রশ্ন তৈরি করেছে। আনচেলত্তির সামনে বিকল্প আছে, কিন্তু পাকেতার মতো একই ধরনের খেলোয়াড় নেই। প্রতিপক্ষের শক্তি, ম্যাচের পরিকল্পনা ও নিজেদের আক্রমণাত্মক ভাবনা মিলিয়েই সিদ্ধান্ত নিতে হবে তাকে।

ব্রাজিলের জন্য এই ম্যাচ তাই দ্বিমুখী পরীক্ষা। একদিকে হালান্ডকে বল থেকে দূরে রাখা, অন্যদিকে নিজেদের আক্রমণকে যথেষ্ট ধারালো করা। নরওয়ের উচ্চতা, ক্রস ও সেট পিস সামলাতে হবে; আবার ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, মাথেউস কুনিয়া, নেইমার ও মার্তিনেল্লিদের দিয়ে সেই রক্ষণও ভাঙতে হবে।

ইতিহাসের অস্বস্তিটাও ছোট নয়। নরওয়ে এমন এক দল, যাদের বিপক্ষে ব্রাজিল খেলেছে, কিন্তু কখনো জেতেনি। ১৯৯৮ সালের সেই হার এখনো পরিসংখ্যানের পাতায় আলাদা করে থাকে। তবে ব্রাজিলের এই প্রজন্মের সামনে সুযোগ আছে সেই দাগ মুছে দেওয়ার।

শেষ পর্যন্ত কথার উত্তর মিলবে মাঠেই। ব্রাজিল কি প্রথমবার নরওয়েকে হারিয়ে ইতিহাসের অস্বস্তি মুছবে, নাকি হালান্ডরা আরেকবার সেলেসাওদের পুরোনো দুঃস্বপ্ন জাগিয়ে তুলবেন, অপেক্ষা এখন সেই উত্তর দেখার।