Advertisement

গাজায় গণহত্যার মধ্যেই ইসরায়েলে ২৫৯৬ অস্ত্রের চালান পাঠায় ভারত

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
গাজায় গণহত্যার মধ্যেই ইসরায়েলে ২৫৯৬ অস্ত্রের চালান পাঠায় ভারত
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ছবি: এশিয়া পোস্ট গ্রাফিকস

ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় সামরিক অভিযান ও গণহত্যা চালানোর মধ্যেই ইসরায়েলে কমপক্ষে ২ হাজার ৫৯৬টি অস্ত্রের চালান পাঠিয়েছিল ভারত। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বরের মধ্যে দেশটির রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ও বেসরকারি নানা সংস্থা এসব চালান পাঠিয়েছিল। এসব চালানে ছিল লাখ লাখ মেশিনগানের যন্ত্রাংশ, ১৫৫ মিমি উচ্চ-বিস্ফোরক কামানের গোলা, স্কাইস্ট্রাইকার ‘কামিকাজে’ ড্রোনের জন্য বিস্ফোরক ওয়ারহেডসহ সাঁজোয়া যানের যন্ত্রাংশ।

বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) প্রকাশিত মানবাধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ‘মেড ইন ইন্ডিয়া: দ্য সাপ্লাই অব উইপনস অ্যান্ড অ্যামিউনিশন টু ইসরায়েল’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বরের মধ্যে এই বিশাল সমরাস্ত্র চালানগুলো ভারতে উৎপাদিত হয় এবং পরবর্তীতে ইসরায়েলে পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে ছিল ৫ লাখ ৬৪ হাজার ৯৭০টি বিস্ফোরক অস্ত্রের অংশ (ড্রোন ওয়ারহেড, আর্টিলারি শেল কেসিং এবং অন্যান্য), সামরিক মানের অস্ত্রের জন্য ৩ লাখ ৯০ হাজার ৫১৬টি ক্ষুদ্র অস্ত্রের যন্ত্রাংশ এবং ইসরায়েলি সশস্ত্র বাহিনীকে সরবরাহকারী বৃহৎ ইসরায়েলি কোম্পানিগুলোকে দেওয়া সামরিক যানবাহনের ২৯৮টি যন্ত্রাংশ

ভারতের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ও বেসরকারি এসব সংস্থা ইসরায়েলে অস্ত্র রপ্তানি করেছে। ছবি: সংগৃহীত
ভারতের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ও বেসরকারি এসব সংস্থা ইসরায়েলে অস্ত্র রপ্তানি করেছে। ছবি: সংগৃহীত

এ ছাড়াও চালানগুলোর মধ্যে রয়েছে বিপুল পরিমাণ মেশিনগানের যন্ত্রাংশ, ‘এলবিট সিস্টেমস’-কে সরবরাহ করা ১৫৫ মিমি উচ্চ-বিস্ফোরক কামানের গোলা, খান ইউনিসের ধ্বংসস্তূপের মধ্যে আবিষ্কৃত স্কাইস্ট্রাইকার ‘কামিকাজে’ ড্রোনের জন্য বিস্ফোরক ওয়ারহেড ও ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর প্রধান ঠিকাদারদের জন্য সাঁজোয়া যানের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ।

অ্যামনেস্টির এই প্রতিবেদনটি গাজায় ইসরায়েলি অভিযানে ভারতের সরাসরি সমর্থন ও সহযোগিতার ওপর ধারাবাহিকভাবে আসা একাধিক অনুসন্ধানের সর্বশেষ সংযোজন। এর আগে চলতি বছরের মে মাসে ফিলিস্তিনি নেতৃত্বাধীন ‘বয়কট, বিনিয়োগ প্রত্যাহার ও নিষেধাজ্ঞা’ (বিডিএস) আন্দোলন ও ‘নো হারবার ফর জেনোসাইড’ (এনএইচজি) নামের অধিকার সংগঠনগুলোর ভারত থেকে ইসরায়েলে সামরিক সরঞ্জামের বিশাল ‘স্রোত’ সম্পর্কে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সতর্ক করেছিল।

একইভাবে, ইসরায়েলি কর কর্তৃপক্ষের (আইটিএ) আমদানিসংক্রান্ত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে বার্তা সংস্থা আলজাজিরার এক অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবরের মধ্যে ইসরায়েলে সামরিক সরঞ্জাম ও অস্ত্র-সম্পর্কিত পণ্য রপ্তানিতে ভারত ছিল বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ।

অস্ত্র রপ্তানির ‘হারমোনাইজড সিস্টেম’ কোডের অন্তর্ভুক্ত এইচএস কোড ৮৭১০। ছবি: সংগৃহীত
অস্ত্র রপ্তানির ‘হারমোনাইজড সিস্টেম’ কোডের অন্তর্ভুক্ত এইচএস কোড ৮৭১০। ছবি: সংগৃহীত

অ্যামনেস্টির গবেষকরা আন্তর্জাতিক শুল্ক শ্রেণিবিন্যাস বা ‘হারমোনাইজড সিস্টেম’ (এইচএস) কোডের আওতাভুক্ত নির্দিষ্ট রপ্তানি তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদনটি চূড়ান্ত করেন। এর মধ্যে ছিল এইচএস কোড ৯৩০১-৯৩০৭ (অস্ত্র, গোলাবারুদ ও যন্ত্রাংশ) এবং এইচএস কোড ৮৭১০ (সাঁজোয়া ও যুদ্ধযান এবং উপাদান)। দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য ছোট অস্ত্রের সন্দেহজনক চালান কিংবা যেসব যন্ত্রাংশের সামরিক পরিচয় শতভাগ নিশ্চিত হওয়া যায়নি; অ্যামনেস্টি সেগুলো বিশ্লেষণ থেকে বাদ দিয়েছে।

অস্ত্র রপ্তানির ‘হারমোনাইজড সিস্টেম’ কোডের অন্তর্ভুক্ত এইচএস কোড ৯৩০১-৯৩০৭। ছবি: সংগৃহীত
অস্ত্র রপ্তানির ‘হারমোনাইজড সিস্টেম’ কোডের অন্তর্ভুক্ত এইচএস কোড ৯৩০১-৯৩০৭। ছবি: সংগৃহীত

অ্যামনেস্টি জানিয়েছে, তারা এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা চেয়ে ভারত সরকার ও সংশ্লিষ্ট নয়টি উৎপাদনকারী সংস্থাকে চিঠি পাঠালেও প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

প্রতিবেদন প্রকাশের পর এক বিবৃতিতে অ্যামনেস্টির মহাসচিব অ্যাগনেস ক্যালামার্ড বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) আদেশে গাজায় ফিলিস্তিনিদের ওপর গণহত্যার ঝুঁকির কথা স্বীকৃতি দেওয়ার পরও ভারতের কর্তৃপক্ষ এটি বলতে পারে না যে, তারা আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘনের ঝুঁকি সম্পর্কে অবগত ছিল না। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী যখন গাজায় গণহত্যা ও চরম দুর্ভোগ বজায় রেখেছিল, তখন ভারতীয় কোম্পানিগুলো তাদের প্রতিরক্ষা খাতে সমরাস্ত্র জুগিয়ে মুনাফা অর্জনে ব্যস্ত ছিল।’

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর দক্ষিণ ইসরায়েলে হামাস-নেতৃত্বাধীন হামলার পর ইসরায়েল গাজায় তার সামরিক অভিযান শুরু করে। এরপর থেকে চলতি বছরের ২৯ জুলাই পর্যন্ত অন্তত ২ লাখ ৪৭ হাজার ৩৮৭ জন ফিলিস্তিনি নিহত বা আহত হয়েছেন।