১৪ লাখ ৩০ হাজার বছরের পুরোনো পদচিহ্ন ঘিরে নতুন রহস্য

প্রায় ১৪ লাখ ৩০ হাজার বছর আগে বর্তমান কেনিয়ার উত্তরাঞ্চলের একটি হ্রদের অগভীর পানিতে হেঁটেছিল একদল প্রাচীন মানব। তাদের ফেলে যাওয়া পদচিহ্ন আজও জীবাশ্ম হয়ে টিকে আছে। কিন্তু এত বছর পরও বিজ্ঞানীদের সামনে একটি বড় প্রশ্ন—এই পদচিহ্নগুলোর মালিক আসলে কারা ছিলেন?
নতুন এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা বলছেন, পদচিহ্নগুলো হয়তো হোমো ইরেকটাস অথবা প্যারানথ্রোপাস বোইসি প্রজাতির। তবে কোনো পরিচিত প্রজাতির সঙ্গেই এগুলোর বৈশিষ্ট্য পুরোপুরি মিলে না। ফলে গবেষকদের ধারণা, মানব বিবর্তনের ইতিহাসে এখনও অজানা কোনো প্রজাতির অস্তিত্বও থাকতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের পিএনএএস সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়েছে, কেনিয়ার কুবি ফোরা এলাকায় পাওয়া ২১টি পদচিহ্ন সম্ভবত আটজনের মতো প্রাচীন মানব রেখে গিয়েছিল। তারা সবাই একই সময়ে হ্রদের তীর ধরে চলছিল।
গবেষকদের মতে, পদচিহ্নগুলো শুধু পরিচয়ের রহস্যই নয়, প্রাচীন মানবদের সামাজিক আচরণেরও গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হতে পারে।
মানুষের পূর্বপুরুষদের সামাজিক জীবন সম্পর্কে জীবাশ্ম থেকে খুব কম তথ্য পাওয়া গেছে। তবে একসঙ্গে একই দিকে হাঁটার এসব চিহ্ন ইঙ্গিত দেয়, তারা দলবদ্ধভাবে চলাফেরা করত। আধুনিক বানর ও এপদের মতো তারাও সম্ভবত সামাজিক প্রাণী ছিল।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পদচিহ্নগুলোর গোড়ালি থেকে পায়ের আঙুল পর্যন্ত চাপের ধরন আধুনিক মানুষের চেয়ে প্যারানথ্রোপাস বোইসির সম্ভাব্য পদচিহ্নের সঙ্গে বেশি মিল রয়েছে।
এছাড়া তানজানিয়ার বিখ্যাত লায়েটোলি এলাকার অস্ট্রালোপিথেকাস আফারেনসিসের পদচিহ্নের সঙ্গেও কিছু বৈশিষ্ট্যের মিল পাওয়া গেছে। কিন্তু সমস্যা হলো, পদচিহ্নগুলো আকারে এত বড় যে পরিচিত প্যারানথ্রোপাস বোইসির দেহের সঙ্গে তা পুরোপুরি মেলে না।
গবেষকদের মতে, এর দুটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা থাকতে পারে।
প্রথমত, হোমো ইরেকটাসের হাঁটার ধরন ও পায়ের গঠন সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের বর্তমান ধারণা অসম্পূর্ণ হতে পারে। তারা হয়তো আগে ভাবার চেয়ে অনেক বৈচিত্র্যময়ভাবে চলাফেরা করত।
দ্বিতীয়ত, প্যারানথ্রোপাস বোইসির দেহের আকারও হয়তো ধারণার চেয়ে অনেক বেশি বৈচিত্র্যময় ছিল। অনুকূল পরিবেশে তাদের কেউ কেউ প্রায় ছয় ফুট পর্যন্ত লম্বা হতে পারত।
গবেষণার অন্যতম সীমাবদ্ধতা হলো, এই দুই প্রজাতির পায়ের হাড়ের জীবাশ্ম খুবই অল্প পাওয়া গেছে। ফলে পদচিহ্নের সঙ্গে কঙ্কালের সরাসরি তুলনা করা কঠিন।
তাই গবেষকরা বলছেন, তৃতীয় সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। অর্থাৎ ওই এলাকায় এমন কোনো প্রাচীন মানব প্রজাতি বাস করত, যাদের দেহের আকার ছিল হোমো ইরেকটাসের মতো, কিন্তু হাঁটার ধরন ছিল অস্ট্রালোপিথেকাসদের মতো।
পদচিহ্নগুলোর আকার বিশ্লেষণ করে গবেষকদের ধারণা, এগুলো সম্ভবত বড় আকারের পুরুষদের।
তাদের মতে, আটজনের মতো পুরুষ প্রাচীন মানব একসঙ্গে হ্রদের তীর ধরে খাদ্যের সন্ধানে হাঁটছিল। দলবদ্ধভাবে চলাফেরা করলে শিকার বা খাদ্য সংগ্রহে সুবিধা হতো বলেও ধারণা করা হচ্ছে।
২০২৪ সালে একই গবেষক দল কেনিয়ার তুরকানা অববাহিকায় এমন কিছু পদচিহ্নের সন্ধান পেয়েছিল, যেগুলো হোমো ইরেকটাস ও প্যারানথ্রোপাস বোইসি উভয় প্রজাতির বলে ধারণা করা হয়।
সেই আবিষ্কার প্রথমবারের মতো প্রমাণ দেয়, অন্তত দুটি ভিন্ন প্রাচীন মানব প্রজাতি একই সময়ে একই এলাকায় বসবাস করত।
২০২৩ সালের খননে মানুষের পদচিহ্নের পাশাপাশি আরও ১৪৬টি প্রাণীর পদচিহ্ন পাওয়া যায়। এর মধ্যে ৬৭টি ছিল জলহস্তীর।
পদচিহ্নগুলোর আকারে বড় পার্থক্য থাকায় গবেষকদের ধারণা, সেখানে অন্তত দুটি ভিন্ন প্রজাতির জলহস্তী বিচরণ করত।
রহস্য এখনো অমীমাংসিত
গবেষকরা বলছেন, বর্তমান তথ্য দিয়ে নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয় পদচিহ্নগুলো কার।
তবে এ আবিষ্কার মানব বিবর্তনের ইতিহাস সম্পর্কে নতুন প্রশ্ন তুলেছে। হয়তো প্রাচীন মানুষের দেহের গঠন ও চলাফেরার বৈচিত্র্য বিজ্ঞানীদের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি ছিল।
আবার হয়তো এখনও অজানা কোনো মানব প্রজাতির অস্তিত্বের প্রমাণ লুকিয়ে আছে কেনিয়ার সেই প্রাচীন হ্রদের তীরেই।
এই রহস্যের সমাধান মিলতে পারে ভবিষ্যতে আরও জীবাশ্ম ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন আবিষ্কারের মাধ্যমে।
.png)







