Advertisement

বাসচালকের বাড়িতে ‘সম্পদের খনি’, টাকা গুনতে গুনতে নষ্ট হলো ৫ মেশিন

এশিয়া পোস্ট নিউজ, কলকাতা
বাসচালকের বাড়িতে ‘সম্পদের খনি’, টাকা গুনতে গুনতে নষ্ট হলো ৫ মেশিন
সাবেক তৃণমূল কংগ্রেস নেতা নুব্রত মণ্ডলের ঘনিষ্ঠ সহযোগী তুলু মণ্ডল ও উদ্ধারকৃত টাকা। ছবি: সংগৃহীত

পশ্চিমবঙ্গের বীরভূমে এক সাবেক বাসচালকের বাড়ি থেকে উদ্ধার হওয়া টাকার পাহাড় গুনতে গিয়ে হিমশিম খেয়েছেন পুলিশ ও ব্যাংক কর্মকর্তারা। নগদ অর্থের পরিমাণ এতটাই বেশি ছিল যে, টাকা গণনার পাঁচটি মেশিন বিকল হয়ে যায়। পরে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

বুধবার (২৯ জুলাই) গভীর রাতে শুরু হওয়া অভিযানে সাবেক বাসচালক মিনার মণ্ডলের বাড়ি থেকে অন্তত ২৮ কোটি রুপি নগদ এবং ১৫ কেজি স্বর্ণ জব্দ করা হয়েছে। বর্তমান বাজারমূল্যে স্বর্ণের মূল্য প্রায় ২১ কোটি রুপি। সব মিলিয়ে উদ্ধার হওয়া সম্পদের মূল্য প্রায় ৪৯ কোটি রুপি।

গ্রেপ্তার মিনার মণ্ডল পেশায় সাবেক বাসচালক। বর্তমানে তিনি পাথর ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তিনি পাথর ব্যবসায়ী তুলু মণ্ডলের আত্মীয়। তুলু মণ্ডল সাবেক তৃণমূল কংগ্রেস নেতা অনুব্রত মণ্ডলের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত। চলতি মাসের শুরুতে তিনি ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী শিবিরে যোগ দেন।

পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, মিনারের বাড়ির চারটি আলমারির মধ্যে দুটিতে নগদ টাকা রাখা ছিল। এ ছাড়া বাড়ির বিভিন্ন গোপন স্থানে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল টাকা ও স্বর্ণ। মিনারের জীবনযাপন ছিল অত্যন্ত সাধারণ। গ্রামের একেবারে শেষ প্রান্তে অবস্থিত বাড়িটি দেখে সেখানে বিপুল পরিমাণ অর্থ থাকার কোনো সন্দেহ জাগেনি।

পুলিশ জানায়, প্রায় এক সপ্তাহ আগে তুলু মণ্ডল ও মিনার মণ্ডলের ফোনে আড়ি পাতা হয়। পরে জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে মিনার বাড়িতে রাখা বিপুল পরিমাণ অর্থের কথা স্বীকার করেন। এরপরই অভিযান চালানো হয়।

বুধবার রাতে অভিযানের শুরুতে প্রায় ৫ কোটি ৫০ লাখ রুপি গণনা করা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু রাতভর তল্লাশি ও গণনা শেষে উদ্ধার হওয়া অর্থের পরিমাণ বেড়ে ২৮ কোটি রুপিতে পৌঁছায়।

অভিযান শেষে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ ও স্বর্ণ জব্দ করে মিনার মণ্ডলকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি দাবি করেন, উদ্ধার হওয়া অর্থ ও স্বর্ণের প্রকৃত মালিক তুলু মণ্ডল এবং তার কথিত অবৈধ সিন্ডিকেট।

পুলিশ আরও জানিয়েছে, মিনার বর্তমানে পাথর ব্যবসার সঙ্গে জড়িত এবং তুলু মণ্ডলের মালিকানাধীন বিভিন্ন পাথর খাদান ও ক্রাশিং ইউনিটের সঙ্গে তার সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে। এত বিপুল অর্থ ও স্বর্ণের উৎস কী, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

অভিযানটি পরিচালনা করেন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে একটি বড় দল।

অভিযানের পর পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, বালু ও পাথর মাফিয়াদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এই সাফল্য প্রশংসনীয়।

গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বীরভূমের মোহাম্মদ বাজার থানার এলাকায় অবৈধ পাথর ব্যবসায়ী তুলু মণ্ডল ওরফে ওরফে মোহাম্মদ নাজিবউদ্দীনের গোপন আস্তানায় অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ ও স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

তিনি বলেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অব্যাহত থাকবে এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনকারীদের কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।

পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, মিনার মণ্ডল আগে রাজ্য পরিবহন দপ্তরে বাসচালক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পরে তিনি পরিবহন খাত ছেড়ে পাথর ব্যবসায় যুক্ত হন। একজন সাধারণ বাসচালক থেকে কীভাবে তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হলেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

ঘটনার পর পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেসের বিভিন্ন পক্ষ অবৈধ সম্পদের উৎস এবং অভিযুক্তদের সঙ্গে অনুব্রত মণ্ডলের সম্পর্ক নিয়ে একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলছে।

এদিকে, এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ও স্বর্ণ উদ্ধারের পর আবারও আলোচনায় এসেছে ২০২৪ সালে বীরভূমের সিউড়িতে তুলু মণ্ডলের মেয়ের জাঁকজমকপূর্ণ বিয়ে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, ওই বিয়েতে টলিউড ও বলিউডের বেশ কয়েকজন তারকা উপস্থিত ছিলেন এবং পুরো আয়োজনে প্রায় ১০০ কোটি রুপি ব্যয় করা হয়েছিল।

২০২২ সালে পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেসের মহাসচিব পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ অর্পিতা মুখোপাধ্যায়ের দুটি ফ্ল্যাট থেকে প্রায় ৫০ কোটি রুপি নগদ অর্থ এবং বিপুল পরিমাণ স্বর্ণালংকার উদ্ধার হয়েছিল।