Advertisement

ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদন/ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র থেকে ইসরায়েলকে বাঁচাতে সক্ষম নৌবাহিনী নেই যুক্তরাষ্ট্রের

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র থেকে ইসরায়েলকে বাঁচাতে সক্ষম নৌবাহিনী নেই যুক্তরাষ্ট্রের
যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর মোতায়েনকৃত একটি রণতরি। ছবি: সংগৃহীত

ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে ইসরায়েলকে সুরক্ষিত রাখার কার্যত সামরিক সক্ষমতা নেই যুক্তরাষ্ট্রের। পাশাপাশি ন্যাটোভুক্ত অঞ্চল ও নিজস্ব ভূখণ্ডের প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করার মতো পর্যাপ্ত যুদ্ধজাহাজ মার্কিন নৌবাহিনীতে নেই।

একইসঙ্গে উভয় অভিযান চালানো অসম্ভব হয়ে পড়ায় ইসরায়েলের চেয়ে মার্কিন ভূখণ্ড সুরক্ষাকে বেশি অগ্রাধিকার দেওয়ার বাধ্যবাধকতা তৈরি হতে পারে বলে প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনকে লিখিতভাবে সতর্ক করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের একজন ঊর্ধ্বতন কমান্ডার।

শনিবার (১ আগস্ট) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্ট।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন ইউরোপীয় কমান্ডের (ইইউকম) প্রধান জেনারেল অ্যালেক্সাস গ্রিনকেউইচ চলতি সপ্তাহে পেন্টাগনে শীর্ষ কর্মকর্তাদের কাছে এক গোপনীয় চিঠি পাঠিয়েছেন।

সংবেদনশীল এই তথ্যের বিষয়ে অবগত দুই কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের শর্তে জানান, জেনারেল গ্রিনকেউইচ ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে অবিলম্বে অতিরিক্ত একটি নৌ-ডেস্ট্রয়ার মোতায়েনের দাবি জানিয়েছেন। অতিরিক্ত রণতরি না পাওয়া গেলে মার্কিন ভূখণ্ডের সুরক্ষাকে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষার চেয়ে এগিয়ে রাখতে হবে।

একজন মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তার বরাতে ওয়াশিংটন পোস্ট জানিয়েছে, ঊর্ধ্বতন কমান্ডাররা যখন মনে করেন ওয়াশিংটনে অভিযানগত ঝুঁকির দিকে মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন, তখন এই ধরনের নোটিস দেওয়া অস্বাভাবিক নয়। সীমিত সংখ্যক জাহাজ, জনবল ও অস্ত্রের জন্য সামরিক কমান্ডগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবেও এগুলো গণ্য হতে পারে।

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পাঁচ মাস পর ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার কূটনৈতিক আলোচনা ভেস্তে পড়া এবং টানা ক্ষেপণাস্ত্রা হামলায় মার্কিন সামরিক বাহিনীর ওপর তৈরি হওয়া চরম চাপের বাস্তব চিত্রই ফুটে উঠেছে এই সতর্কবার্তায়।

দীর্ঘস্থায়ী এই সংঘাতের ফলে মার্কিন নৌবাহিনীর অত্যাধুনিক ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। বিশ্বজুড়ে একাধিক সামরিক অভিযানে যুক্ত থাকা রণতরিগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা ও মেরামতে বড় জটিলতা তৈরি হয়েছে।

বর্তমানে মার্কিন ইউরোপীয় কমান্ড মূলত ভূমধ্যসাগরে নিয়োজিত তাদের শক্তিশালী ডেস্ট্রয়ারগুলো দিয়ে ইসরায়েলকে রক্ষা করে আসছে। সাগরে থাকা এই মার্কিন ডেস্ট্রয়ারগুলো উন্নত রাডার প্রযুক্তি ব্যবহার করে ইরান ও ইয়েমেনের হুথিদের ছোড়া শত শত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আকাশেই ধ্বংস (ইন্টারসেপ্ট) করছে। কিন্তু একই সময়ে ইউকম প্রধানকে ন্যাটোর প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গীকার রক্ষা এবং রাশিয়ার দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে মার্কিন ভূখণ্ড রক্ষার সক্ষমতা বজায় রাখতে হচ্ছে।

ঐতিহাসিকভাবে ঘনিষ্ঠ স্পেনের রোটা ঘাঁটিতে নৌবাহিনীর পাঁচটি ডেস্ট্রয়ার থাকার কথা থাকলেও অতিরিক্ত চাপের কারণে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ বিঘ্নিত হচ্ছে। বর্তমানে ইউএসএস পল ইগনাশিয়াস ও ইউএসএস রুজভেল্ট ভূমধ্যসাগরে এবং অপর তিনটি ডেস্ট্রয়ার স্পেনের রোটার অবস্থান করছে।

অপরদিকে, মধ্যপ্রাচ্য ও আরব সাগরে মার্কিন নৌশক্তির এক বিশাল সমাবেশ ঘটানো হয়েছে। তেহরান কর্তৃক কৌশলগত হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ করার পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ আরোপের নির্দেশ দেন। ফলে নৌবাহিনীকে তাদের রণতরি একাধিক ফ্রন্টে বিভক্ত করতে হয়।

বর্তমানে আরব সাগরে বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জর্জ এইচডব্লিউ বুশ ও ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কনের সঙ্গে ১১টি ডেস্ট্রয়ারসহ অন্তত ১৫টি যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন রয়েছে। এগুলো ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ নামক মার্কিন বাণিজ্য সুরক্ষা ও অবরোধ নীতিতে যুক্ত রয়েছে।

এ ছাড়া লোহিত সাগরে ইউএসএস গঞ্জালেজ নামের আরও একটি ডেস্ট্রয়ার হুতি হামলা মোকাবিলায় নিয়োজিত।

পেন্টাগনের পূর্ববর্তী মূল্যায়নে দেখা গেছে, গত পাঁচ মাসের যুদ্ধে ইসরায়েল তাদের নিজস্ব ব্যবস্থার চেয়ে মার্কিন দূরপাল্লার থাড (টিএইচএএডি) ও নৌ-ইন্টারসেপ্টর ব্যবস্থার ওপর বহুগুণ বেশি নির্ভর করেছে।

প্রতিরক্ষাবিষয়ক থিঙ্কট্যাংক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) মিসাইল ডিফেন্স প্রজেক্টের পরিচালক টম কারাকো বলেন, ‘দীর্ঘ যুদ্ধ সামরিক প্রস্তুতি ও গোলাবারুদের মজুতের ওপর চরম আঘাত এনেছে। এখন প্রশ্ন হলো যুক্তরাষ্ট্রের আসল স্ট্র্যাটেজি বা কৌশলটি কী?’

নভেম্বরের আসন্ন মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের মুখে ঘরোয়া রাজনীতিতেও ট্রাম্প প্রশাসনের এই যুদ্ধনীতি চরম বিরোধিতার সম্মুখীন। পেট্রোল, খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধির কারণে মার্কিন জনগণের সিংহভাগই এই যুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। ফলে ইসরায়েলকে রক্ষা করতে গিয়ে নিজস্ব অস্ত্রাগার ও ভূখণ্ডের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ফেলার এই প্রশাসনিক দ্বিমুখী সংকট মার্কিন রাজনীতিতে বড় ঝড়ের পূর্বাভাস দিচ্ছে।