Advertisement

রাজনৈতিক আনুগত্য নয়; রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখে দক্ষতা ও সততা

কাজী জিয়া উদ্দিন
রাজনৈতিক আনুগত্য নয়; রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখে দক্ষতা ও সততা
কাজী জিয়া উদ্দিন। ছবি: সংগৃহীত

মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ ও রাজনীতিবিদ উড্রো উইলসনের মতে, ‘রাজনীতি নীতি নির্ধারণ করবে, প্রশাসন সেই নীতি বাস্তবায়ন করবে।’ রাষ্ট্র ও সরকারের মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। সরকার পরিবর্তনশীল; রাষ্ট্র স্থায়ী। রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আসে ও যায়। কিন্তু প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অন্যান্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান জনগণের কল্যাণে ধারাবাহিকভাবে কাজ করে। এ কারণেই আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার অন্যতম প্রধান ভিত্তি একটি রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ, পেশাদার, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন।

বাংলাদেশের সংবিধান, সরকারি কর্মচারী আইন এবং সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালার অন্তর্নিহিত দর্শনও একই কথা বলে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কোনো রাজনৈতিক দলের নয়; তারা রাষ্ট্রের কর্মচারী। তাদের আনুগত্য ব্যক্তি বা দলের প্রতি নয়, সংবিধান, আইন ও জনগণের প্রতি।

কিন্তু স্বাধীনতার পাঁচ দশক অতিক্রম করার পরও প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে রাজনৈতিক পরিচয়, গোষ্ঠীগত বিভাজন ও অঘোষিত আনুগত্যের সংস্কৃতি নিয়ে উদ্বেগ রয়ে গেছে। শুধু প্রশাসন নয়, বিশ্ববিদ্যালয়, স্বাস্থ্যখাত, বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠন এমনকি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভেতরেও দলীয় বিভাজনের ছাপ ক্রমেই স্পষ্ট হয়েছে। ফলে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে-রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো কি জনগণের সেবা করবে, নাকি রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার সম্প্রসারিত ক্ষেত্র হয়ে উঠবে?

সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯ এবং সরকারি কর্মচারী আইন, ২০১৮ সরকারি কর্মচারীদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার বিষয়ে স্পষ্ট সীমারেখা নির্ধারণ করেছে। এই বিধানগুলোর মূল দর্শন অত্যন্ত সরল-রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে রাজনৈতিক আনুগত্য নয়; আইন, তথ্য, জনস্বার্থ ও পেশাগত বিবেচনাই হবে একমাত্র মানদণ্ড।

অবশ্যই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কল্যাণ সমিতি থাকবে, চিকিৎসকদের পেশাজীবী সংগঠন থাকবে, প্রকৌশলী বা প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সংগঠনও থাকবে। কিন্তু এসব সংগঠন যদি পেশাগত উৎকর্ষের পরিবর্তে রাজনৈতিক অবস্থান নির্ধারণের মঞ্চে পরিণত হয়, তবে তা রাষ্ট্রীয় স্বার্থের পরিপন্থী হয়ে দাঁড়ায়।

প্রশাসনের রাজনৈতিকীকরণের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় মেধার অবমূল্যায়নের মাধ্যমে। যখন দক্ষতার চেয়ে রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা বেশি মূল্য পায়, তখন সৎ ও যোগ্য কর্মকর্তারা ধীরে ধীরে প্রান্তিক হয়ে পড়েন। প্রতিষ্ঠানের ভেতরে একটি বিপজ্জনক বার্তা ছড়িয়ে পড়ে-ভালো কাজের চেয়ে ভালো সম্পর্কই বেশি কার্যকর। এই সংস্কৃতি কেবল ব্যক্তি নয়, পুরো প্রতিষ্ঠানকেই দুর্বল করে।

এর পরিণতি দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ। ইতিহাসবিদ লর্ড অ্যাকটনের বহুল উদ্ধৃত পর্যবেক্ষণ-ক্ষমতা মানুষকে দুর্নীতির দিকে প্রবণ করে, আর সীমাহীন ক্ষমতা সম্পূর্ণভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত করে। যখন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় পরিচালিত হয়, তখন জবাবদিহি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং দলীয় সুরক্ষা দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিরোধকে ক্ষয় করে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা তার রাজনৈতিক শৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক অবক্ষয় গ্রন্থে দেখিয়েছেন, রাষ্ট্রের সক্ষমতার মূল ভিত্তি একটি দক্ষ ও রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ প্রশাসন। দুর্বল প্রশাসন মানেই দুর্বল রাষ্ট্র। একইভাবে বিশ্বব্যাংক, অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা এবং জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব দেশে প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী, সেসব দেশে বিনিয়োগ, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও মানব উন্নয়ন তুলনামূলকভাবে বেশি।

বিশ্ববিদ্যালয় ও হাসপাতাল সমাজের দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। একটি জ্ঞান সৃষ্টি করে, অন্যটি জীবন রক্ষা করে। এই দুই ক্ষেত্র যদি দলীয় বিভাজনের প্রভাবে আক্রান্ত হয়, তবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় গবেষণা, উদ্ভাবন, চিকিৎসাসেবা ও ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের বিকাশ। একজন শিক্ষককে মূল্যায়ন করা উচিত তার গবেষণা, প্রকাশনা ও শিক্ষাদানের মান দিয়ে; একজন চিকিৎসককে মূল্যায়ন করা উচিত তার পেশাগত দক্ষতা, মানবিকতা ও সেবার গুণমান দিয়ে-রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে নয়।

ইতিহাসও আমাদের সতর্ক করে। উনবিংশ শতাব্দীর যুক্তরাষ্ট্রে বিজয়ী রাজনৈতিক দল নিজেদের সমর্থকদের সরকারি পদে নিয়োগ দিত। এই ব্যবস্থা ‘লুণ্ঠনভিত্তিক নিয়োগব্যবস্থা’ নামে পরিচিত ছিল। এর ফলে প্রশাসনে অদক্ষতা, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও অস্থিরতা ভয়াবহ আকার ধারণ করে। পরে ১৮৮৩ সালের প্রশাসনিক সংস্কার আইনের মাধ্যমে মেধাভিত্তিক সিভিল সার্ভিস প্রতিষ্ঠিত হয়। আজকের শক্তিশালী মার্কিন প্রশাসনের পেছনে সেই সংস্কারেরই গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে।

এশিয়ার সফল রাষ্ট্রগুলোর অভিজ্ঞতাও একই শিক্ষা দেয়। সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠাতা নেতা লি কুয়ান ইউ বলেছিলেন, প্রথম শ্রেণির সরকার গড়তে হলে প্রথম শ্রেণির মানুষকে দায়িত্ব দিতে হবে। সিঙ্গাপুরের প্রশাসনের ভিত্তি মেধা, সততা ও নিরপেক্ষতা। জাপানের যুদ্ধোত্তর পুনর্গঠন এবং দক্ষিণ কোরিয়ার দ্রুত শিল্পায়নের পেছনেও দক্ষ, পরিকল্পনামুখী ও পেশাদার প্রশাসনের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশও চাইলে এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে পারে। প্রথমত, সংবিধানের ৭৭ অনুচ্ছেদে উল্লিখিত ন্যায়পাল প্রতিষ্ঠান দ্রুত কার্যকর করা প্রয়োজন। একটি স্বাধীন ন্যায়পাল প্রশাসনিক পক্ষপাত, হয়রানি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিকার দিতে পারে। দ্বিতীয়ত, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা পর্যবেক্ষণের জন্য একটি স্বাধীন কমিশন গঠন করা যেতে পারে, যা রাজনৈতিক প্রভাব সংক্রান্ত অভিযোগ তদন্ত করবে এবং নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশ করবে। তৃতীয়ত, পদোন্নতি ও পদায়নে স্বচ্ছ ডিজিটাল মেধা-ভিত্তিক মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। পাশাপাশি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, সহকর্মী, অধস্তন ও সেবাগ্রহীতার মতামতের সমন্বয়ে বহুমাত্রিক মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু করা যেতে পারে।

অবসরের পরপরই রাজনৈতিক পদ গ্রহণের ক্ষেত্রে অপেক্ষাকাল আরও দীর্ঘ করার বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে, যাতে চাকরিকালীন সিদ্ধান্ত নিয়ে অযথা প্রশ্ন না ওঠে। একই সঙ্গে প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও সংস্থার জন্য বার্ষিক সততা ও সুশাসন সূচক প্রকাশ, জনসেবা নেতৃত্ব একাডেমি প্রতিষ্ঠা, অনিয়ম প্রকাশকারীদের আইনি সুরক্ষা শক্তিশালী করা এবং বিশ্ববিদ্যালয় ও হাসপাতালের জন্য অরাজনৈতিক পেশাগত আচরণ সনদ প্রণয়ন সময়ের দাবি।

প্রশাসনের আধুনিকায়নে তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ। পদায়ন, বদলি, প্রশিক্ষণ, পদোন্নতি ও কর্মদক্ষতার তথ্য বিশ্লেষণের জন্য সমন্বিত ডিজিটাল ব্যবস্থা নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণকে আরও স্বচ্ছ ও তথ্যভিত্তিক করতে পারে।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি নীতিগত। আমরা কি এমন একটি রাষ্ট্র চাই, যেখানে কর্মকর্তারা রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে মূল্যায়িত হবেন? নাকি এমন একটি রাষ্ট্র চাই, যেখানে সততা, দক্ষতা, কর্মনিষ্ঠা ও জনসেবাই হবে মূল্যায়নের একমাত্র মানদণ্ড?

নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ডগলাস নর্থ লিখেছিলেন, ‘প্রতিষ্ঠানই হলো সমাজ পরিচালনার নিয়ম।’ উন্নয়ন শুধু সেতু, সড়ক, মেট্রোরেল বা টানেল নির্মাণের নাম নয়; উন্নয়ন হলো এমন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, যা ব্যক্তি বা সরকারের পরিবর্তনের পরও দক্ষতা, ন্যায় ও জবাবদিহির সঙ্গে কাজ করে। দলীয়কৃত প্রশাসন সাময়িক রাজনৈতিক সুবিধা এনে দিতে পারে, কিন্তু শক্তিশালী রাষ্ট্র গড়ে ওঠে নিরপেক্ষ, পেশাদার ও নৈতিক প্রশাসনের ওপর। উন্নত বাংলাদেশের অভিযাত্রায় তাই সবচেয়ে জরুরি সংস্কার হতে পারে একটি নতুন প্রশাসনিক সামাজিক চুক্তি-যেখানে পদোন্নতির ভিত্তি হবে মেধা, ক্ষমতার উৎস হবে আইন, আর আনুগত্যের কেন্দ্র হবে সংবিধান ও জনগণ। ইতিহাসের শিক্ষা স্পষ্ট-রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখে না রাজনৈতিক আনুগত্য; রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখে দক্ষতা, সততা, ন্যায়পরায়ণতা এবং জনগণের আস্থা।


লেখক: কলামিস্ট ও সাবেক ডিআইজি