Advertisement

রক্ত ঝরেছিল, স্বপ্ন নয়

মো. তরিকুল ইসলাম তারিক
রক্ত ঝরেছিল, স্বপ্ন নয়
ছবি: সংগৃহীত

২৯ জুলাই! ক্যালেন্ডারের পাতায় এটি হয়তো আর দশটা দিনের মতোই একটি তারিখ। কিন্তু আমার জীবনে এটি এক রক্তাক্ত স্মৃতি, এক অসমাপ্ত যন্ত্রণার নাম। আজ থেকে ঠিক তিন বছর আগে, এই দিনেই আমি মৃত্যুকে খুব কাছ থেকে দেখেছিলাম।

দেশে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের দাবিতে তখন আন্দোলন চলছিল। সরকারের পদত্যাগ এবং নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবিতে বিএনপি ও সমমনা রাজনৈতিক দলগুলো ধারাবাহিক কর্মসূচি পালন করছিল। সেই আন্দোলনের অংশ হিসেবেই রাজধানীর মাতুয়াইলে শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলাম।

কিন্তু শান্তিপূর্ণ সেই অবস্থান মুহূর্তেই রক্তাক্ত হয়ে উঠেছিল। গুলির শব্দে কেঁপে উঠেছিল চারপাশ। একের পর এক গুলি এসে বিদ্ধ করেছিল আমার মাথা, মুখ, গলা, বুক, হাত ও পেট। মুহূর্তেই শরীর রক্তে ভিজে যায়। মনে হয়েছিল, এটাই বুঝি জীবনের শেষ মুহূর্ত। কিন্তু মহান আল্লাহর অসীম রহমত, পরিবারের দোয়া এবং অসংখ্য মানুষের ভালোবাসায় আমি মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসি। ফিরে এসেছি ঠিকই, কিন্তু আগের সেই মানুষটি আর হয়ে উঠতে পারিনি।

শরীর থেকে গুলি বের করতে চারটি অস্ত্রোপচার করতে হয়েছে। আজও আমার শরীরের ভেতরে নয়টি গুলি রয়ে গেছে। মাঝেমধ্যেই অসহনীয় ব্যথায় কেঁপে উঠি। কিছু রাত আছে, যখন ব্যথার তীব্রতায় ঘুম ভেঙে যায়। শরীরের ক্ষতগুলো যেন প্রতিদিন নতুন করে মনে করিয়ে দেয়—আমি একদিন মৃত্যুর খুব কাছ দিয়ে হেঁটে এসেছি।

তবুও আমার কোনো আক্ষেপ নেই। কারণ, সেদিন রক্ত ঝরেছিল, কিন্তু আমার স্বপ্ন ঝরেনি। শরীর ক্ষতবিক্ষত হয়েছিল, কিন্তু বিশ্বাস ভেঙে পড়েনি। গুলি মানুষের শরীর বিদ্ধ করতে পারে, আদর্শকে নয়। ভয় সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু ন্যায়ের আকাঙ্ক্ষাকে হত্যা করতে পারে না।

রাজনীতির পথে যারা হাঁটে, তারা জানে—সংগ্রামের মূল্য কখনোই সহজ নয়। কেউ হারায় সময়, কেউ হারায় প্রিয়জন, কেউ হারায় জীবন, আর কেউ আজীবন নিজের শরীরে বয়ে বেড়ায় সেই সংগ্রামের চিহ্ন। আমার শরীরে রয়ে যাওয়া নয়টি গুলি শুধু ধাতুর টুকরো নয়; এগুলো আমার জীবনের একেকটি ইতিহাস, একেকটি রক্তাক্ত সাক্ষ্য। আজও যখন আয়নার সামনে দাঁড়াই, ক্ষতগুলো চোখে পড়ে। তখন মনে হয়—এই দাগগুলো কোনো পরাজয়ের নয়; এগুলো বিশ্বাসের মূল্য, আদর্শের মূল্য, সংগ্রামের মূল্য।

শারীরিক যন্ত্রণা আজও আমাকে ছাড়েনি। হয়তো কোনো দিনও ছাড়বে না। কিন্তু একটি বিষয় আমাকে মানসিক শক্তি দেয়—আমি অন্তত এই বিশ্বাস নিয়ে বেঁচে আছি যে, যে স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে আমরা রাজপথে নেমেছিলাম, সেই অধ্যায়ের অবসান হয়েছে। সেই অনুভূতিই আমার দীর্ঘ যন্ত্রণার ভেতরেও একটুখানি প্রশান্তি এনে দেয়।

আমি প্রতিশোধ চাই না। আমি চাই এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে রাজনৈতিক মতের কারণে আর কোনো মায়ের বুক খালি হবে না; কোনো তরুণকে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার জন্য গুলিবিদ্ধ হতে হবে না; ক্ষমতার ভাষা হবে না অস্ত্র, বরং সংলাপ, সহনশীলতা ও গণতন্ত্র।

তিন বছর কেটে গেছে। সময় এগিয়ে গেছে। কিন্তু আমার শরীরের ভেতরে আটকে থাকা নয়টি গুলি আজও সময়কে থামিয়ে রেখেছে। প্রতিটি ব্যথা আমাকে সেই দিনের কথা মনে করিয়ে দেয়। আবার প্রতিটি নিঃশ্বাস আমাকে মনে করিয়ে দেয়—মানুষকে আহত করা যায়, কিন্তু তার স্বপ্নকে হত্যা করা যায় না।

আমার শরীর থেকে রক্ত ঝরেছিল, কিন্তু আমার বিশ্বাস নয়। আমার শরীর ক্ষতবিক্ষত হয়েছিল, কিন্তু আমার স্বপ্ন নয়। ইতিহাসের প্রতিটি পরিবর্তনের পেছনে কিছু নাম থাকে, আর কিছু নীরব রক্তের দাগ। আমি সেই দাগগুলোরই একজন বহনকারী।

রক্ত ঝরেছিল—স্বপ্ন নয়।

লেখক: যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল।