মেধার চেয়ে দলীয় পরিচয় বড় হলে রাষ্ট্রের ক্ষতি কোথায়?

একজন বিসিএস পরীক্ষার্থীর সঙ্গে আমার পরিচয় প্রায় এক দশক আগের। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে সে দিনের পর দিন একটি ছোট্ট পাঠাগারে বসে পড়াশোনা করত। বন্ধুরা চাকরিতে যোগ দিয়েছে, কেউ বিদেশে চলে গেছে, কেউ ব্যবসা শুরু করেছে—কিন্তু সে বিশ্বাস করত, রাষ্ট্রের চাকরিতে প্রবেশের সবচেয়ে বড় পুঁজি হলো মেধা ও অধ্যবসায়। একদিন সন্ধ্যায় ক্লান্ত চোখে সে আমাকে বলেছিল, ‘ভাই, শুধু এটুকু চাই—আমার প্রতিদ্বন্দ্বী যেন আরেকজন মেধাবী হয়; কোনো পরিচয় নয়।’
বছর পেরিয়ে গেছে। সেই তরুণ আজ সরকারি কর্মকর্তা। কিন্তু তার সেই কথাটি আজও কানে বাজে। কারণ রাষ্ট্রের চাকরি নিয়ে যখনই রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়, আমি সেই সন্ধ্যার কথোপকথনে ফিরে যাই।
সম্প্রতি জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল গোলাম পরওয়ার বলেছেন, ‘চাকরিতে মেধার দরকার নেই, এখন বিএনপির পদ থাকাই যোগ্যতা।’ বক্তব্যটি রাজনৈতিক। এতে একটি গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগটি সত্য কি না, তা নির্ধারণের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও তথ্য-প্রমাণের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু অভিযোগের রাজনৈতিক সত্যতা যাচাইয়ের আগে একটি বড় প্রশ্ন সামনে আসে—রাষ্ট্রের চাকরিতে যোগ্যতার সংজ্ঞা নিয়ে যদি জনমনে সন্দেহ তৈরি হয়, সেটি কি নিজেই একটি উদ্বেগের বিষয় নয়?
রাষ্ট্রের শক্তি শুধু সেনাবাহিনী, অর্থনীতি বা অবকাঠামোয় নয়; রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তার প্রতিষ্ঠান। আর প্রতিষ্ঠানের প্রাণ হলো মানুষ। সেই মানুষ নির্বাচন করার পদ্ধতি যদি প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তাহলে ভবনের দেয়াল অটুট থাকলেও ভিত দুর্বল হতে শুরু করে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রশাসনকে ঘিরে অভিযোগ নতুন নয়। স্বাধীনতার পর থেকে প্রায় প্রতিটি রাজনৈতিক অধ্যায়েই কোনো না কোনো সময়ে প্রশাসনের দলীয়করণ, নিয়োগে প্রভাব, পদোন্নতিতে পক্ষপাত কিংবা বদলির রাজনীতি নিয়ে বিতর্ক হয়েছে। সরকার বদলেছে, অভিযোগের ভাষা বদলেছে, কিন্তু মূল প্রশ্নটি একই থেকেছে—রাষ্ট্র কি নাগরিকের কাছে সমান দূরত্বে দাঁড়িয়ে আছে?
আমি প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু বাংলাদেশ সচিবালয়ে দীর্ঘদিন প্রশাসনিক বিষয় নিয়ে সাংবাদিকতা করতে গিয়ে একটি বিষয় বারবার দেখেছি—একজন সচিব, অতিরিক্ত সচিব, যুগ্মসচিব ও একজন জেলা প্রশাসক কিংবা একজন পুলিশ সুপারের নামের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে তাঁর নিয়োগ বা পদায়ন নিয়ে জনধারণা। বাস্তবে তিনি যতই দক্ষ হোন, যদি মানুষ মনে করে তিনি কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে সেই জায়গায় পৌঁছেছেন, তাহলে তার সিদ্ধান্তও সন্দেহের চোখে দেখা শুরু হয়। রাষ্ট্রের জন্য এর চেয়ে বড় দুর্ভাগ্য আর কী হতে পারে?
গোলাম পরওয়ারের বক্তব্যকে তাই কেবল একটি রাজনৈতিক বাক্য হিসেবে দেখলে বিষয়টির গভীরতা ধরা পড়ে না। এটি এমন এক বিতর্ক, যা আমাদের বাধ্য করে ভাবতে—আমরা কি এমন একটি নিয়োগব্যবস্থা গড়ে তুলতে পেরেছি, যেখানে কোনো রাজনৈতিক দলেরই এমন অভিযোগ তোলার সুযোগ থাকবে না?
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য হওয়া বা রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাস করা একজন নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। গণতন্ত্রে সেই অধিকারকে সম্মান করতেই হবে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় চাকরির দরজা খুলবে নাগরিকের রাজনৈতিক পরিচয়ে নয়; তার মেধা, যোগ্যতা, সততা ও দক্ষতায়। একইভাবে, কারও রাজনৈতিক মতের কারণে তাকে অযোগ্য বিবেচনা করাও রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতার পরিপন্থী।
রাষ্ট্রের চাকরি আসলে জনগণের আস্থার চাকরি। একজন সরকারি কর্মকর্তা যখন একটি ফাইলে স্বাক্ষর করেন, তখন তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি হিসেবে নয়; সংবিধানের প্রতিনিধি হিসেবে স্বাক্ষর করেন। এই নৈতিক অবস্থানই রাষ্ট্রকে রাষ্ট্র বানায়।
আজকের পৃথিবীতে উন্নয়ন কেবল বড় বড় সেতু বা উড়ালসড়ক দিয়ে পরিমাপ করা হয় না। উন্নয়ন মাপা হয় একটি রাষ্ট্র কতটা দক্ষতার সঙ্গে তার মানবসম্পদকে কাজে লাগাতে পারছে, কতটা নিরপেক্ষভাবে যোগ্য মানুষকে দায়িত্ব দিচ্ছে এবং কতটা জবাবদিহির মধ্যে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছে—এসব দিয়েও।
যদি কোনো তরুণ বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে যে কঠোর পরিশ্রম তাকে কাঙ্ক্ষিত স্থানে পৌঁছে দিতে পারে, তাহলে ক্ষতি শুধু তার ব্যক্তিগত নয়; রাষ্ট্রও একজন সম্ভাবনাময় নাগরিককে হারায়। আর যখন হাজার হাজার তরুণের মনে একই সংশয় জন্ম নেয়, তখন সেটি আর ব্যক্তিগত হতাশা থাকে না; সেটি রাষ্ট্রীয় সংকটে পরিণত হয়।
এখানেই রাজনৈতিক দলগুলোর আত্মসমালোচনার জায়গা রয়েছে। বিরোধী দলে থাকলে প্রশাসনের নিরপেক্ষতার কথা বলা সহজ; ক্ষমতায় গেলে সেই নীতি রক্ষা করা কঠিন। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা সম্ভবত এখানেই। আমরা প্রায়ই নীতিকে নয়, অবস্থানকে সমর্থন করি। অথচ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো যদি প্রতিবার রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে নতুন আনুগত্যের পরীক্ষায় বসে, তাহলে প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতা কখনোই শক্তিশালী হবে না।
অভিযোগের জবাব অভিযোগ দিয়ে নয়, প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা দিয়েই দেওয়া যায়। নিয়োগপ্রক্রিয়া, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার মূল্যায়ন, পদোন্নতির মানদণ্ড এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির পদ্ধতি যত বেশি স্বচ্ছ হবে, রাজনৈতিক বিতর্কের পরিসরও তত সংকুচিত হবে। জনগণ তখন ব্যক্তির বক্তব্য নয়, প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতার ওপর ভরসা করবে।
আমি মনে করি, রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ হওয়া উচিত তার মেধাবী নাগরিকদের প্রতি আস্থা সৃষ্টি করা। একজন তরুণ যখন পরীক্ষার হলে প্রবেশ করবে, তখন তার মনে একটাই বিশ্বাস থাকা উচিত—আজ তার ভাগ্য নির্ধারণ করবে তার উত্তরপত্র; কোনো দলীয় পরিচয় নয়।
গোলাম পরওয়ারের বক্তব্য হয়তো রাজনৈতিক বিতর্কের অংশ হিসেবেই ইতিহাসে জায়গা পাবে। এর পক্ষে-বিপক্ষে আরও অসংখ্য বক্তব্য আসবে। কিন্তু এই বিতর্ক যদি আমাদের রাষ্ট্রীয় নিয়োগব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ, আরও জবাবদিহিমূলক এবং আরও মেধাভিত্তিক করার প্রয়োজনীয়তা স্মরণ করিয়ে দেয়, তাহলে সেটিই হবে সবচেয়ে ইতিবাচক ফল।
কারণ শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্র টিকে থাকে না কোনো দলের জয় বা পরাজয়ে; রাষ্ট্র টিকে থাকে তার প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতায়। আর সেই বিশ্বাসযোগ্যতার প্রথম শর্ত হলো—যোগ্যতার সিঁড়ি যেন কখনো পরিচয়ের শর্টকাটে হারিয়ে না যায়।
.png)





