Advertisement

আলজাজিরার কলাম/ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের চাবিকাঠি কেন সৌদি আরবের হাতে

নওয়াফ ওবায়েদ
ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের চাবিকাঠি কেন সৌদি আরবের হাতে
মরক্কোর রাবাতে ১৯৬৯ সালের ২২ সেপ্টেম্বর ইসলামী শীর্ষ সম্মেলনের উদ্বোধনে সৌদি আরবের বাদশাহ ফয়সাল। ছবি: সংগৃহীত

ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার প্রায় আট দশক পেরিয়ে গেছে। কিন্তু স্বাধীন ও সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন এখনও আরব-ইসরায়েল সংকটের মূল প্রশ্ন হয়ে রয়েছে। এই সংকট ঘিরে বহু যুদ্ধ হয়েছে। শান্তি চুক্তি সই হয়েছে। নানা কূটনৈতিক উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই প্রধান কৌশলগত সমস্যার সমাধান এখনও মেলেনি।

সৌদি আরব ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন ও ইসরায়েলের সঙ্গে একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তি করার প্রচেষ্টায় সামনের সারিতে রয়েছে। এই বিষয়ে দেশটির প্রতিশ্রুতি খুবই স্পষ্ট। ২০২৪ সালে তারা ‘গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর দ্য ইমপ্লিমেন্টেশন অব দ্য টু-স্টেট সলিউশন’ (দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান বাস্তবায়নে বৈশ্বিক জোট) গঠনে সহ-পৃষ্ঠপোষকতা দেয়। বর্তমানে ইতালির রোমে এই জোটের বৈঠক চলছে।

বাদশাহ সালমান ও যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান সৌদি আরবের পূর্বসূরি শাসকদের পথই অনুসরণ করছেন। অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় ধরে এ বিষয়ে রিয়াদ এক চুলও নড়েনি। ইসরায়েলের সঙ্গে শান্তি স্থাপন সম্ভব কি না—প্রশ্ন কখনও সেটি ছিল না। আসল প্রশ্ন হলো, এই শান্তিকে সর্বাত্মক, বৈধ ও স্থায়ী করার জন্য প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি হয়েছে কি না।

এই কাঠামোর আওতায় ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন একই সমাধানের দুটি সমান্তরাল অংশ। একটিকে আগে রেখে অন্যটি করার কোনো সুযোগ নেই। দুটির কাজই একসঙ্গে চলতে হবে।

এই নীতির সূচনা করেছিলেন বাদশাহ ফয়সাল। তিনি ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারকে সৌদি আরবের জাতীয় নিরাপত্তা নীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি করেছিলেন। তার উত্তরসূরিরাও এই নীতি বজায় রেখেছেন। তবে অঞ্চলের পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে মিলিয়ে তারা কূটনৈতিক প্রকাশে কিছুটা পরিবর্তন এনেছেন। কূটনৈতিক পরিবেশের বদল ঘটলেও তাদের মূল লক্ষ্য অপরিবর্তিতই রয়েছে।

১৯৮১ সালে বাদশাহ ফাহাদ তার নামের এই পরিকল্পনার মাধ্যমে সৌদি নীতিকে একটি আনুষ্ঠানিক শান্তি প্রস্তাবে রূপ দেন। একে ‘ফাহদ পরিকল্পনা’ বলা হয়। এতে দখলকৃত আরব ভূখণ্ড থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার এবং ফিলিস্তিনিদের জাতীয় অধিকারের স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছিল। এর দুই দশক পর তৎকালীন যুবরাজ ও পরবর্তী সময়ে বাদশাহ আবদুল্লাহ ২০০২ সালে ‘আরব শান্তি উদ্যোগ’-এর মাধ্যমে এই কৌশলকে আরও বিস্তৃত করেন। এই উদ্যোগে আরব বিশ্ব ইসরায়েলকে একটি প্রস্তাব দেয়। ১৯৬৭ সালে দখল করা ভূখণ্ড থেকে ইসরায়েলকে সরে যেতে হবে। একই সঙ্গে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন করতে হবে। এর বিনিময়ে পুরো আরব বিশ্ব ইসরায়েলের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক ও পূর্ণাঙ্গ শান্তি স্থাপন করবে।

ফলে বর্তমান সৌদি নেতৃত্ব উত্তরাধিকার সূত্রেই একটি সুপ্রতিষ্ঠিত কৌশলগত নীতি পেয়েছে। তাদের কোনো অমীমাংসিত নীতি নিয়ে নতুন করে বিতর্কে জড়াতে হচ্ছে না। তাদের এখন একটাই দায়িত্ব। তা হলো, বর্তমান কূটনৈতিক পরিবেশ কয়েক দশক ধরে অপরিবর্তিত থাকা শর্তগুলো পূরণ করতে পারছে কি না, তা মূল্যায়ন করা।

এই ধারাবাহিকতা সৌদি রাজপরিবারের রাজনৈতিক বৈধতার এক বড় প্রশ্নের সঙ্গেও যুক্ত। তাদের কাছে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের বিষয়টি কেবল পররাষ্ট্রনীতির অংশ নয়। এটি সৌদি আরবের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বৈধতার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। সৌদি বাদশাহ হলেন ‘দুই পবিত্র মসজিদের খাদেম’। তাছাড়া আরব ও মুসলিম বিশ্বে দেশটির দীর্ঘদিনের এক বিশেষ নেতৃত্ব রয়েছে। এই অবস্থানই ফিলিস্তিনের প্রতি সৌদি আরবের সমর্থনকে আরও জোরালো করে।

২০২০ সালের ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’ বা আব্রাহাম চুক্তির পর সৌদি আরবের এই অনড় অবস্থানের গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই চুক্তির মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইন ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলে। পরে মরক্কো ও সুদানও এতে যোগ দেয়। এই চুক্তি দেখিয়েছিল যে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনে কোনো অগ্রগতি ছাড়াই আরব-ইসরায়েল সম্পর্ক স্বাভাবিক করা সম্ভব। চুক্তিটি আঞ্চলিক কূটনীতিতে পরিবর্তন এনেছিল ঠিকই। কিন্তু এটি ফিলিস্তিন সমস্যার সমাধান করতে পারেনি। এই অঞ্চলের শান্তি প্রক্রিয়াকেও পূর্ণতা দিতে পারেনি।

যুক্তরাষ্ট্রের একের পর এক সরকার মনে করেছে, সৌদি আরবের অংশগ্রহণ এই চুক্তির সবচেয়ে বড় শূন্যতা। রিয়াদকে ছাড়াই আব্রাহাম চুক্তির পরিধি হয়তো বাড়ানো সম্ভব। কিন্তু সৌদি আরবের অংশগ্রহণ ছাড়া এই চুক্তি কখনোই পূর্ণাঙ্গ কৌশলগত রূপ পাবে না।

ট্রাম্প প্রশাসন আবারও সৌদি-ইসরায়েল সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিষয়টিকে তাদের আঞ্চলিক কূটনীতির কেন্দ্রে রেখেছে। তবে এই কূটনৈতিক তৎপরতাকে অবশ্যই ৭ অক্টোবরের পরবর্তী বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে মূল্যায়ন করতে হবে।

গাজা যুদ্ধ এক সম্পূর্ণ নতুন কূটনৈতিক পরিবেশ তৈরি করেছে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর যুদ্ধবিরতি উদ্যোগ এবং ‘বোর্ড অব পিস’ (শান্তি বোর্ড) গঠন করা হয়। এর মূল লক্ষ্য ছিল যুদ্ধ বন্ধ করা, ওই এলাকায় স্থিতিশীলতা আনা এবং পুনর্গঠন শুরু করা। এই উদ্যোগগুলোর আসল গুরুত্ব রাজনৈতিক সমাধানের বিকল্প হওয়া নয়। বরং এগুলো এমন এক অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে চায়, যার মাধ্যমে একটি স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান সম্ভব হতে পারে।

তবে সৌদি আরবের মূল রাজনৈতিক দাবিটি এখনও অপরিবর্তিতই রয়েছে। তাদের দাবি হলো—বাস্তবেই একটি সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন করতে হবে এবং এই প্রক্রিয়া হতে হবে স্থায়ী ও অপরিবর্তনযোগ্য।

সৌদি আরবের এই অবস্থান রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। বাদশাহ কেবল দেশের রাষ্ট্রপ্রধান নন। তিনি একই সঙ্গে দুই পবিত্র মসজিদের খাদেম। এই দায়িত্ব তাকে পুরো মুসলিম বিশ্বে এক বিশাল ধর্মীয় কর্তৃত্ব এনে দেয়। তাই ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়ার মতো যেকোনো সিদ্ধান্তের জন্য রাজনৈতিক অনুমোদনের পাশাপাশি বড় ধরনের ধর্মীয় বৈধতা প্রয়োজন। ভবিষ্যতে আলোচনার অবাস্তব প্রতিশ্রুতি দিয়ে এই বৈধতা অর্জন করা সম্ভব নয়। এর জন্য বাস্তবে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

সৌদি আরবের বিশাল বৈশ্বিক প্রভাব দেশটির এই দাবিকে আরও শক্তিশালী করেছে। এটি আরব বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতি। পুরো আরব বিশ্বের মোট অর্থনৈতিক উৎপাদনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসে সৌদি আরব থেকে। তাছাড়া এই অঞ্চলের একমাত্র দেশ হিসেবে সৌদি আরব জি-২০ জোটের সদস্য। দেশটি বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় জ্বালানি পরাশক্তি এবং অপরিশোধিত তেল রপ্তানিতে সবার ওপরে। এটি মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তিও বটে। এই অর্থনৈতিক ক্ষমতা ও ধর্মীয় মর্যাদা একসঙ্গে মিলে সৌদি আরবের যেকোনো সিদ্ধান্তকে দ্বিপাক্ষিক কূটনীতির চেয়ে অনেক বড় করে তোলে।

এর প্রভাব কেবল সৌদি আরবের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। লেবানন, সিরিয়া, ইরাক ও আলজেরিয়াসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আরব দেশ এখনও ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয়নি। এই দেশগুলোর নিজস্ব সার্বভৌম সিদ্ধান্ত রয়েছে। তবে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের শর্তে যদি সৌদি-ইসরায়েল কোনো চুক্তি হয়, তবে এই অঞ্চলের রাজনৈতিক পরিবেশ পুরোপুরি বদলে যাবে। তখন এসব দেশের সিদ্ধান্ত নেওয়ার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও বদলে যাবে।

লেবাননের উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি বোঝা যেতে পারে। ইসরায়েল-লেবানন সীমান্তে স্থিতিশীলতা ফেরাতে ওয়াশিংটন বৈরুতকে ইসরায়েলের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক গড়ে তোলার তাগিদ দিচ্ছে। তবে সৌদি আরবের সমর্থনে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের পর কোনো চুক্তি সই হলে লেবাননের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব অনেক কম পড়বে। চুক্তি হওয়ার আগের চেয়ে তখন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আলাদা হবে।

এই একই যুক্তি পুরো মুসলিম বিশ্বের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মতো প্রভাবশালী দেশগুলো এখনও ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয়নি। এর প্রধান কারণ ফিলিস্তিন সংকট এখনও অমীমাংসিত রয়ে গেছে। যদি দুই পবিত্র মসজিদের খাদেম (সৌদি বাদশাহ) এমন একটি সমঝোতা মেনে নেন, যা স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র নিশ্চিত করে, তবে অন্য দেশগুলোও সেই পথ অনুসরণ করতে বাধ্য হবে। এটি তাদের সিদ্ধান্ত পুনর্মূল্যায়নের ক্ষেত্রে প্রধান রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বাধাগুলো দূর করবে।

এখানে আগের আব্রাহাম চুক্তির সঙ্গে সৌদি আরবের ভূমিকার মূল তফাত। সৌদি আরবের অংশগ্রহণ কেবল মাত্রার দিক থেকে বড় নয়, এর ধরনও সম্পূর্ণ আলাদা। এটি পুরো আরব ও মুসলিম বিশ্বে এক বিশাল রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় প্রভাব ফেলবে।

বর্তমান কূটনৈতিক প্রক্রিয়া শেষ পর্যন্ত সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে কি না, তা এখনও অনিশ্চিত। এ ক্ষেত্রে ইসরায়েল, ফিলিস্তিন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং কিছু আঞ্চলিক দেশের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তবে সৌদি আরবের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা পুরোপুরি বাদশাহ সালমান ও যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ওপরই ন্যস্ত।

উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া কৌশলগত কাঠামোর আওতায় ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন ও ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টি পর্যায়ক্রমিক কোনো ধাপ নয়। এগুলো সমান্তরালভাবে চলতে থাকা দুটি শর্ত। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি কখনোই স্থায়ী বা দীর্ঘমেয়াদি বৈধতা পেতে পারে না।


লেখক: নওয়াফ ওবায়েদ কিংস কলেজ লন্ডনের ডিপার্টমেন্ট অব ওয়ার স্টাডিজের সিনিয়র ফেলো।