রয়টার্সের এক্সক্লুসিভ/অস্ট্রেলিয়ায় কিশোর-কিশোরীদের সোশ্যাল মিডিয়া নিষেধাজ্ঞা প্রথম ধাপেই ব্যর্থ, বলছে গবেষণা

রয়টার্স
অস্ট্রেলিয়ায় কিশোর-কিশোরীদের সোশ্যাল মিডিয়া নিষেধাজ্ঞা প্রথম ধাপেই ব্যর্থ, বলছে গবেষণা
ছবি: সংগৃহীত

অস্ট্রেলিয়ায় অনূর্ধ্ব-১৬ বা ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের ওপর জারি করা বিশ্বের প্রথম নিষেধাজ্ঞাটি কার্যকরের প্রথম ধাপেই বড়সড় ধাক্কা খেয়েছে। সরকারের বয়স যাচাইকরণ প্রক্রিয়ার পরামর্শক দলের একটি নতুন গবেষণা থেকে জানা গেছে, অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলো ব্যবহারকারীদের বয়স পরীক্ষার প্রাথমিক ধাপটিই সঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারছে না, যার ফলে এই আইনটি কার্যকারিতা হারাচ্ছে।

গত বছরের ডিসেম্বর থেকে অস্ট্রেলিয়ার নতুন সোশ্যাল মিডিয়া আইন অনুযায়ী ইনস্টাগ্রাম, স্ন্যাপচ্যাট এবং ইউটিউবের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোতে ১৬ বছরের কম বয়সীদের অ্যাকাউন্ট খোলার ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এই আইন মানতে প্ল্যাটফর্মগুলোকে ‘যুক্তিসঙ্গত পদক্ষেপ’ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল এবং সরকার বয়স নির্ধারণের জন্য বহুমাত্রিক পরীক্ষা পদ্ধতির সুপারিশ করেছিল।

সফটওয়্যার টেস্টিং প্রতিষ্ঠান ‘কেজেআর’-এর গবেষকেরা এই আইন কার্যকর হওয়ার পর ৫০টি পরীক্ষামূলক বা ডামি অ্যাকাউন্ট খোলেন, যেখানে জন্মতারিখ অনুযায়ী বয়স উল্লেখ করা হয়েছিল ১৬ বছর। কিন্তু এই ৫০টি অ্যাকাউন্টের একটির ক্ষেত্রেও কোনো প্ল্যাটফর্ম বয়স প্রমাণের জন্য কোনো তথ্য বা নথিপত্র চায়নি। বর্তমানে এই অ্যাকাউন্টগুলোর সবকটিই সক্রিয় রয়েছে এবং মেটার ইনস্টাগ্রাম, স্ন্যাপচ্যাট, টিকটক ও ইউটিউবসহ ৯টি বড় প্ল্যাটফর্মে এগুলো ব্যবহৃত হচ্ছে।

এই পরীক্ষার মাধ্যমে বয়স যাচাইকরণ ব্যবস্থার একটি বড় গলদ সামনে এসেছে। এতদিন পর্যন্ত সবার মনোযোগ ছিল ছবি বা ফেসিয়াল রিকগনিশনের মাধ্যমে বয়স যাচাই করার প্রযুক্তির দিকে। কিন্তু এর আগের প্রাথমিক ধাপ যা মূলত একজন ব্যবহারকারীর সামগ্রিক অনলাইন কার্যক্রম দেখে তার আনুমানিক বয়স অনুমান করে সেই প্রযুক্তিটি কমবয়সী ব্যবহারকারীদের শনাক্ত করে পরবর্তী জোরালো পরীক্ষার মুখোমুখি করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হচ্ছে।

গবেষকদের মতে, যুব ব্যাংকিং পণ্যের বিজ্ঞাপন ডামি অ্যাকাউন্টগুলোতে আসায় স্পষ্ট যে প্ল্যাটফর্মগুলো ব্যবহারকারীর বয়সসীমা আন্দাজ করতে পেরেছিল, তবুও তারা বয়স যাচাইয়ের কোনো তাগিদ দেখায়নি। এমনকি ‘এক্স’ প্ল্যাটফর্মে ১৬ বছর বয়স দিয়ে খোলা একটি অ্যাকাউন্টে পর্নোগ্রাফিক কনটেন্টও প্রদর্শন করা হয়েছে। একমাত্র অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক লাইভ-স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম ‘কিক’ বয়স প্রমাণ ছাড়া অ্যাকাউন্ট খুলতে দেয়নি, কারণ নতুন প্ল্যাটফর্ম হওয়ায় ব্যবহারকারীর বয়স অনুমান করার মতো যথেষ্ট ডেটা তাদের কাছে নেই।

মেটার একজন মুখপাত্র এই গবেষণার পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেছেন, ডামি অ্যাকাউন্টগুলোতে বয়স ১৬ বছর অর্থাৎ সীমার ওপরে দেখানো হয়েছিল এবং এগুলো সত্যিকারের কোনো কিশোর-কিশোরীর মতো কনটেন্ট পোস্ট বা যুক্ত ছিল না। তাই তাদের আচরণগত নির্দেশক প্রযুক্তি এগুলোকে অনূর্ধ্ব-১৬ হিসেবে চিহ্নিত করেনি।

নিষেধাজ্ঞা চালুর পর প্রথম মাসে প্রায় ৪৭ লাখ সন্দেহভাজন কমবয়সী অ্যাকাউন্ট মুছে ফেলার দাবি করা হলেও, প্রতিনিয়ত এই আইন লঙ্ঘনের খবর আসছে। গত মার্চ মাসে অস্ট্রেলীয় সরকার পাঁচটি বড় প্ল্যাটফর্মের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি দিয়েছিল। এরপর গত মাসে সরকার এই নিয়ম লঙ্ঘনের সর্বোচ্চ জরিমানা দ্বিগুণ করে এবং প্রযুক্তি জায়ান্টদের বিরুদ্ধে আদালতে যাওয়ার সতর্কবার্তা দেয়, কারণ সরকার মনে করছে প্ল্যাটফর্মগুলো এই নিষেধাজ্ঞাটিকে ব্যর্থ করার চেষ্টা করছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই আইনের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো ‘প্রতারণা’ বা ভুল তথ্য দেওয়া। ১৬ বছরের কম বয়সী কিশোর-কিশোরীরা অ্যাকাউন্ট খোলার সময় সহজেই ভুল জন্মতারিখ ব্যবহার করে এই নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যাচ্ছে, যা কঠোরভাবে পরীক্ষা করার কোনো কার্যকর ব্যবস্থা প্ল্যাটফর্মগুলোতে এখনও অনুপস্থিত।