পশ্চিমবঙ্গে মুসলিম শিশু ধর্ষণ-হত্যা/শুভেন্দুর কথামতো মূল অভিযুক্তকে ধরেই ‘গুলি করে হত্যা’

এশিয়া পোস্ট নিউজ, কলকাতা
শুভেন্দুর কথামতো মূল অভিযুক্তকে ধরেই ‘গুলি করে হত্যা’
বারুইপুর মহকুমা হাসপাতাল। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ ২৪ পরগণার বারুইপুরে মুসলিম কিশোরী ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছেন। পুলিশের দাবি, অভিযুক্ত প্রভাস মণ্ডল এক পুলিশ কর্মকর্তার সার্ভিস রিভলবার নিয়ে ছিনিয়ে গুলি চালায়। আত্মরক্ষার্থে পাল্টা গুলি ছোড়ে পুলিশ। এতেই প্রাণ হারান তিনি।

বুধবার (৮ জুলাই) সকালে তার মৃত্যু হয়েছে। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। এরপর থেকে তিনি পুলিশি হেফাজতেই ছিলেন।

বারুইপুর জেলা পুলিশ জানিয়েছে, মঙ্গলবার রাত ১২টা ৪৫ মিনিট নাগাদ ঘটনার তদন্ত ও দৃশ্য পুনর্নির্মাণের (ক্রাইম সিন রিক্রিয়েশন) জন্য প্রভাস মণ্ডলকে বারুইপুরের সূর্যপুর এলাকার ঘটনাস্থলে নেওয়া হয়। সেখানে গাড়ি থেকে নামানোর পরপরই প্রভাস আচমকা এক পুলিশ কর্মকর্তার সার্ভিস রিভলবার ছিনিয়ে নিয়ে গুলি চালান এবং পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন।

পুলিশ আরও জানায়, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ প্রথমে তাকে সতর্ক করে। কিন্তু তিনি না থামায় পুলিশ বাধ্য হয়ে পাল্টা গুলি চালায়। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাকে দ্রুত স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

নারী সুরক্ষা নিশ্চিতে উত্তরপ্রদেশের আদলে এই ‘এনকাউন্টারের’ ঘটনা রাজ্যজুড়ে তীব্র আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। এর আগে বিরোধী দলের নেতা হিসেবে বিজেপি নেতা ও বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী হুংকার দিয়ে বলেছিলেন, ‘রেকর্ড করে রাখুন বিরোধী দলনেতার কথা, বিজেপি ক্ষমতায় এলে এই ধর্ষকদের কোর্টে পাঠাব না; সকালে জমা নেব, বিকেলে খরচ করব। যোগী আদিত্যনাথ ও হিমন্ত বিশ্বশর্মার দেখানো পথে সরকার চলবে, কথা দিয়ে গেলাম।’

রাজ্যে নতুন সরকার গঠনের পর বারুইপুরের এই ঘটনায় ঠিক তেমনই ‘অ্যাকশন’ দেখল পশ্চিমবঙ্গ। ঘটনার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই ‘এনকাউন্টার’ করা হলো মূল অভিযুক্তকে। প্রভাস ‘এনকাউন্টারের’ ঘটনার একটি পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট তৈরি করা হচ্ছে। পাশাপাশি, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী গোটা ঘটনাটির ম্যাজিস্ট্রেট পর্যায়ের তদন্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

বারুইপুর কাণ্ডে সবার প্রথমে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন প্রভাস মণ্ডল। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেই পরবর্তীতে আরও কয়েকজন ধরা পড়ে। পুলিশ জানায়, জিজ্ঞাসাবাদে প্রভাসের বয়ানে বারবার অসঙ্গতি পাওয়া যাচ্ছিল। এমনকি ঘটনার দিন পুকুর থেকে কিশোরীর দেহ উদ্ধারে নিজে সহযোগিতা করে পুলিশ ও গ্রামবাসীদের নজর ঘোরানোর চেষ্টাও করেছিলেন তিনি। তবে স্থানীয় বাসিন্দারা সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে তাকে শনাক্ত করে পুলিশের হাতে তুলে দেন।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, প্রভাস পুলিশকে বারবার বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছিলেন। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি দাবি করেন, মাত্র ১০ হাজার টাকার লোভে ওই কিশোরীকে তুলে এনেছিলেন তিনি। তার দাবি অনুযায়ী, কিশোরীকে যৌন নির্যাতনের পর বস্তাবন্দি করে পুকুরে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্টেও জানা গেছে, সংজ্ঞাহীন অবস্থায় সম্ভবত শিশুটিকে বস্তায় ভরে পানিতে ফেলা হয়, যার ফলে পানিতে ডুবেই তার মৃত্যু হয়েছে।

এদিকে মঙ্গলবার রাতে এই মামলার চতুর্থ অভিযুক্ত কবীর মোল্লাকেও গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ফলে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মূল চারজনই এখন আইনের আওতায় এলো, যাদের মধ্যে মূল অভিযুক্তের মৃত্যু হলো।

অন্যদিকে বারুইপুরে ক্ষুব্ধ জনতার পুলিশের ওপর হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনাতেও কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে প্রশাসন। সরকারি কাজে বাধা ও সহিংসতায় জড়িত থাকার অভিযোগে এ পর্যন্ত ২০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সিসিটিভি ও ভিডিও ফুটেজ দেখে বাকিদেরও চিহ্নিত করার কাজ চলছে।

এর আগে রোববার সকালে বারুইপুরের সূর্যপুর এলাকার একটি পুকুর থেকে ১১ বছর বয়সি এক মুসলিম কিশোরীর বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধার হয়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রণক্ষেত্রে পরিণত হয় বারুইপুর। দোষীদের গ্রেপ্তার ও ফাঁসির দাবিতে রেললাইন অবরোধ ও পুলিশের গাড়িতে ভাঙচুর চালানো হয়। উত্তেজিত জনতার গণপিটুনিতে সন্দেহভাজন এক ব্যক্তির মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলাকায় ব্যাপক পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।