লবণ ও শ্রমিক সংকটে দিশেহারা চামড়া ব্যবসায়ীরা

এশিয়া পোস্ট নিউজ, ফেনী
লবণ ও শ্রমিক সংকটে দিশেহারা চামড়া ব্যবসায়ীরা
ছবি: সংগৃহীত

পবিত্র ঈদুল আজহা-পরবর্তী সময়ে দেশের অন্যতম চামড়ার মোকাম ফেনীর পাঁচগাছিয়া বাজারসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলায় কাঁচা চামড়া সংরক্ষণ ও কেনাবেচায় চরম বিপর্যয় নেমে এসেছে। তীব্র গরমের মধ্যে একদিকে লবণের আকাশচুম্বী দাম ও সরবরাহ সংকট। অন্যদিকে চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য পর্যাপ্ত শ্রমিক না পাওয়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন স্থানীয় মৌসুমী ও আড়তদার ব্যবসায়ীরা। সঠিক সময়ে লবণ দিতে না পারায় এবং আড়তে জায়গা সংকুলান না হওয়ায় ইতোমধ্যেই ফেনী শহরের পাঁচগাছিয়া বাজারের ফেনী-নোয়াখালী সড়কের পাশে ও খোলা জায়গায় পড়ে থাকা শত শত চামড়ায় পচন ধরতে শুরু করেছে। এতে দেশের অন্যতম চামড়া শিল্পে বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

শুক্রবার (২৯ মে) সকালে সরেজমিনে ​ফেনীর প্রধান চামড়ার আড়ত পাঁচগাছিয়া বাজার ঘুরে দেখা গেছে, আড়তে লাখ লাখ চামড়া ঢুকছে। আর রাস্তার পাশে প্রচণ্ড রোদে ফেলে রাখা হয়েছে হাজার হাজার চামড়া। কিছু ব্যবসায়ী লবণ সংকটের কারণে উচ্চ দামে খাবারের চিকন লবণ কিনে চামড়ায় দিচ্ছেন। আর যারা লবণ পাচ্ছেন না তাদের চামড়া পড়ে আছে রাস্তায়। তাছাড়া শ্রমিক সংকটের কারণে চামড়া প্রক্রিয়াজাত করা যাচ্ছে না। যারা কাছ করছেন তারা একেক জন দিনপ্রতি ৩ হাজার টাকা চুক্তিতে কাজ করছেন। ঈদের কারণে জেলার বাইরের শ্রমিকরা বাড়িতে চলে যাওয়ার কারণে শ্রমিকের সংকট দেখা দিয়েছে।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ঈদকে কেন্দ্র করে ফেনীর বাজারে হঠাৎ করেই মোটা লবণের কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়েছে এবং বস্তাপ্রতি লবণের দাম কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ​পাশাপাশি চামড়া ছিলে তাতে লবণ মাখানোর জন্য স্থানীয়ভাবে তীব্র শ্রমিক সংকট দেখা দিয়েছে। প্রতি পিস চামড়ায় লবণ লাগানোর জন্য শ্রমিকদের যে মজুরি দেওয়ার কথা ছিল, তীব্র গরমে কাজ কঠিন হওয়ায় শ্রমিকরা তার চেয়ে দ্বিগুণ মজুরি দাবি করছেন। ফলে একটি চামড়া কিনে তা ট্যানারিতে পাঠানোর উপযোগী করতে যে বাড়তি ৩০০-৪০০ টাকা খরচ হচ্ছে, সেই পুঁজি আড়তদারদের কাছে নেই।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পাঁচগাছিয়া বাজারের নুর নবী এন্টারপ্রাইজের ম্যানেজার মেহেদী হাসান এশিয়া পোস্টকে জানান, গরিবের হক হিসেবে আমরা বিভিন্ন মাদ্রাসা থেকে লক্ষাধিক চামড়া কিনেছি। কিন্তু মোটা লবণ সরবরাহ না করায় আমরা এসব চামড়া লবনজাত করতে পারছি না। তাই বাধ্য হয়ে চড়া দামে খাবারের চিকন লবণ কিনে চামড়ায় দিচ্ছি। তাছাড়া ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা পারিশ্রমিকেও কোনো লেবার পাচ্ছি না। বাধ্য হয়ে রোদের মধ্যে চামড়া রাস্তায় ফেলে রাখা ছাড়া উপায় নেই। এ জন্য অনেক চামড়া পঁচে চিলে পড়ে যাচ্ছে।

এ ছাড়া অনেক ক্রেতা চামড়া বিক্রি করতে না পেরে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। ​ফেনীর প্রায় ৯৫ শতাংশ কোরবানিদাতা ন্যায্য দাম না পেয়ে চামড়াগুলো স্থানীয় মাদ্রাসা ও লিল্লা বোর্ডিংয়ে দান করে দিয়েছিলেন। কিন্তু আড়তদাররা চামড়া কিনতে অনীহা প্রকাশ করায় বিপাকে পড়েছে এই দ্বীনি প্রতিষ্ঠানগুলোও।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চামড়া বিক্রি করতে আসা ফেনী সদর উপজেলার বাসিন্দা নুর হোসেন খাঁন এশিয়া পোস্টকে জানান, এতিমদের হকের এই চামড়া বিক্রি করে যে টাকা আসত, তা দিয়ে সারাবছর এতিমখানা চলত। কিন্তু এবার আড়তদাররা চামড়া নিতেই চাইছে না, যা চামড়াশিল্পের জন্য এক কালো অধ্যায়। এ বিষয়ে সরকারকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানাচ্ছি।

​ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, যদি ঢাকা থেকে ট্যানারি মালিকরা সরাসরি চামড়া কেনা শুরু না করেন এবং শ্রমিক সংকট ও লবণের দাম নিয়ন্ত্রণে না আসে, তবে ফেনী জেলায় কোটি কোটি টাকার জাতীয় সম্পদ চামড়া রাস্তায় পচে একবারে নষ্ট হয়ে যাবে।