লোডশেডিং ও বিদ্যুৎ বিলের চাপ/নীলফামারীতে বাড়ছে সোলারের ব্যবহার

তীব্র গরম, ঘন ঘন লোডশেডিং এবং বিদ্যুতের বাড়তি বিলের কারণে নীলফামারীতে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে সৌরশক্তি। জেলার ফিলিং স্টেশন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের বসতবাড়িতেও সোলার প্যানেলের ব্যবহার বাড়ছে।
এককালীন বিনিয়োগে দীর্ঘদিন নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সুবিধা পাওয়া এবং মাসিক বিলের চাপ থেকে মুক্তি মেলায় গ্রাহকদের মাঝে সৌরবিদ্যুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির এই উৎস শুধু গ্রাহকের খরচই কমাবে না, বরং দেশের বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকিনির্ভরতা কমিয়ে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলার হামিদা ফিলিং স্টেশনে প্রায় এক বছর আগে সোলার প্যানেল স্থাপন করা হয়েছে। সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সুবিধা পাচ্ছে। প্রায় আড়াই লাখ টাকা ব্যয়ে স্থাপিত এই সোলার ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতি মাসে অন্তত ১০ হাজার টাকা বিদ্যুৎ বিল সাশ্রয় হচ্ছে।
ফিলিং স্টেশনের শ্রমিক হামিদুল ইসলাম বলেন, আগে বিদ্যুৎ চলে গেলে মধ্যরাতে ঘুম থেকে উঠে জেনারেটর চালু করতে হতো, তেল দিতে হতো। এখন সোলার ব্যবহারের ফলে যে কোনো সময় নির্বিঘ্নে গ্রাহকদের তেল দেওয়া যায়। জেনারেটরের ঝামেলা আর নেই।
সৈয়দপুর উপজেলার লক্ষণপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের কলেজ ভবনের ছাদেও স্থাপন করা হয়েছে আটটি সোলার প্যানেল। প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ রেজাউল করীম বলেন, বর্তমানে বিদ্যুতের দাম যেভাবে বেড়েছে, তাতে সোলার ব্যবহারের মাধ্যমে আমাদের ব্যয় অনেকটাই কমেছে। শুধু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, নীলফামারীর বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বসতবাড়িতেও সোলারের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে।

তিনি বলেন, একটি সোলার প্যানেলের আয়ুষ্কাল সাধারণত ২০ থেকে ২৫ বছর। ব্যাটারি ও ইনভার্টারের মানভেদে দুই থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত ব্যবহার করা যায়। শুরুতে কিছুটা বেশি খরচ হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি গ্রিডের বিদ্যুতের তুলনায় অনেক বেশি সাশ্রয়ী। সোলারের মাধ্যমে প্রায় সব ধরনের বৈদ্যুতিক যন্ত্র চালানো সম্ভব এবং এটি তুলনামূলকভাবে নিরাপদও।
স্থানীয় সোলার ব্যবহারকারী জোবাইদুর রহমান বলেন, সঠিকভাবে সোলার স্থাপন ও ব্যবহার করতে পারলে দৈনন্দিন বিদ্যুতের চাহিদার একটি বড় অংশ সৌরবিদ্যুত থেকেই পূরণ করা সম্ভব। এতে বিদ্যুতের বিল যেমন কমবে, তেমনি জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর চাপও হ্রাস পাবে।
সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বছরে গড়ে প্রায় ৩৪০ দিন পর্যাপ্ত সূর্যালোক পাওয়া যায়। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বৃদ্ধির ফলে প্রতিবছর প্রায় এক লাখ ৪০ হাজার টন কেরোসিন আমদানি কমছে, আন্তর্জাতিক বাজারে যার মূল্য প্রায় ১২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
এ বিষয়ে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মহুয়া শবনম বলেন, বর্তমান নগরায়ণের যুগে সোলার প্রযুক্তি আগের চেয়ে অনেক বেশি সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী হয়েছে। শুরুতে স্থাপনের খরচ তুলনামূলক বেশি হলেও এটি দীর্ঘ সময় নিরবচ্ছিন্ন সেবা দেয়। ফলে দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ ব্যয় কমানোর ক্ষেত্রে সোলার একটি অত্যন্ত কার্যকর ও লাভজনক বিনিয়োগ।
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও উন্নয়ন গবেষক উমর ফারুক বলেন, উন্নয়ন ও শিল্পায়নের সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। এই চাহিদা পূরণে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ভবনের ছাদে সোলার প্যানেল স্থাপন করা যেতে পারে। নিজেদের প্রয়োজন মিটিয়ে অতিরিক্ত উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে বিক্রির সুযোগও রয়েছে। এতে ব্যক্তি পর্যায়ে অর্থনৈতিক লাভ যেমন হবে, তেমনি জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর চাপ কমবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে।





