ভরা মৌসুমেও চাঁদপুরে ইলিশের আকাল, অভাব-অনটনে জেলেরা

ইলিশের শহর হিসেবে পরিচিত চাঁদপুরে এবার ভরা মৌসুমেও দেখা মিলছে না আশানুরূপ ইলিশের। অথচ বিগত বছরগুলোতে মেঘনা-পদ্মার মোহনায় শত শত মাছ ধরার নৌকা, আড়তে ইলিশের জমজমাট কেনাবেচা আর ক্রেতাদের ভিড়ে মুখর থাকত পুরো এলাকা। কিন্তু এবার সেই চেনা চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। ভরা মৌসুমেও ইলিশ না পেয়ে অভাব-অনটনে দিন কাটাতে হচ্ছে নদীকেন্দ্রিক হাজারো জেলের।
চাঁদপুরের মতলব উত্তর, মতলব দক্ষিণ, হাইমচর ও সদর উপজেলার মেঘনা-পদ্মা নদীকেন্দ্রিক জেলেপল্লিগুলোতে এখন হতাশার ছাপ স্পষ্ট। দিন-রাত নদীতে জাল ফেলেও পর্যাপ্ত মাছ না পাওয়ায় অনেক জেলের নৌকার জ্বালানি খরচও উঠছে না। অনেকেই ঋণ ও কিস্তির টাকা পরিশোধ করতে না পেরে দিশেহারা। কেউ কেউ বাধ্য হয়ে বিকল্প পেশায় ঝুঁকছেন।
চাঁদপুর সদরের স্থানীয় জেলেরা জানান, মাছ ধরেই তাদের সংসার চলে। কিন্তু এখন দিন-রাত নদীতে জাল ফেলেও আশানুরূপ ইলিশ মিলছে না। অনেক সময় ইঞ্জিনচালিত নৌকার জ্বালানি খরচও ওঠে না।
মতলব উত্তর উপজেলার জেলেপল্লির জেলে দিলীপ চন্দ্র রায় বলেন, কিস্তি উঠাইয়া নৌকা কিনে মাছ ধরি। সারা রাত জাল ফেলেও অনেক সময় একটি মাছও পাওয়া যায় না। নৌকা, তেল, বরফ সব খরচ নিজের পকেট থেকে দিতে হয়। মাছ না পাওয়ায় কিস্তির টাকা দিতেও হিমশিম খাচ্ছি।
চাঁদপুর সদর উপজেলার রাজরাজেশ্বর এলাকার জেলে মো. জসিম বলেন, ইলিশের তুলনায় কয়েক দিন ধরে বড় পাঙাশ বেশি ধরা পড়ছে। বড় পাঙাশ ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা, মাঝারি ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা এবং ছোট পাঙাশ ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
আড়তদারদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ৩০০ থেকে ৫০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে এক হাজার থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা, ৬০০ থেকে ৮০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ এক হাজার ৭০০ থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা এবং এক কেজি বা তার বেশি ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার ৩০০ টাকা কেজি দরে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, একসময় চাঁদপুরের আড়তগুলোতে আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে ক্রেতারা ইলিশ কিনতে ভিড় করতেন। এখন মাছের সংকটের কারণে সেই চিত্রও পাল্টে গেছে। সরবরাহ কম থাকায় ক্রেতাদের অনেকেই খালি হাতে ফিরে যাচ্ছেন। কিছু মাছ এলেও দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।
চাঁদপুরের হরিনা মৎস্যঘাটের মাছ ব্যবসায়ী কামাল উদ্দিন বলেন, হরিনা মাছঘাটে ২৪ জন আড়তদার রয়েছেন। কিন্তু বর্তমানে মাছের আমদানি খুবই কম। প্রতিদিন বড় আকারের ইলিশ আসে মাত্র দুই থেকে আড়াই মণ। এক কেজি বা তার বেশি ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে দুই হাজার ৫০০ থেকে তিন হাজার ৩০০ টাকা দরে।
আরেক মাছ ব্যবসায়ী মো. হাসান বলেন, সকাল থেকে আড়তে বসে আছি, কিন্তু ইলিশ নেই বললেই চলে। জেলেরা মাছ পাচ্ছে না, তাই বাজারও জমছে না। চাহিদা অনুযায়ী মাছ দিতে পারছি না।
ইলিশ কিনতে এসে হতাশ রিকশাচালক কালু মিয়া। তিনি বলেন, ‘ইলিশের বাজারে আগুন। একটা ইলিশের দাম দিয়া এক বস্তা চাল কিনতে পারমু। রিকশা চালাইয়া দিনে ৫০০-৬০০ টাকা আয় করি। কোনো রকমে সংসার চলে। বাচ্চাটা ইলিশ মাছ খাইতে চাইছিল। বাজারে গিয়ে দেখি একটা ইলিশের দামই দুই-আড়াই হাজার টাকা। আমাগো গরিবের মুখে ইলিশ জুটব না। চাঁদপুরের মানুষ হইয়াও ইলিশ খাইতে পারি না।’
চাঁদপুর মৎস্য বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হাজী শবে বরাত সরকার বলেন, বর্তমানে বড় স্টেশন মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে প্রতিদিন প্রায় ২০ থেকে ২৫ মণ ইলিশ আসছে। গত সপ্তাহে এর চেয়েও কম ছিল। ইলিশের আমদানি বাড়লে বাজারও স্বাভাবিক হবে।
সমিতির সভাপতি আব্দুল বারী জমাদার বলেন, সরবরাহ কম থাকায় বাজারে ইলিশের দাম বেশি। জেলেরা বেশি মাছ পেলে দামও কমে আসবে।
মতলবের মাটি ও মানুষ সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা শামীম খান বলেন, গত কয়েক বছর ধরে নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীর দূষিত শিল্পবর্জ্যের পানি মেঘনায় এসে মিশছে। এতে মাছের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা প্রয়োজন।
ইলিশ গবেষক আনিসুর রহমান বলেন, আগের তুলনায় ইলিশের সরবরাহ কম এবং বড় ইলিশের সংখ্যাও কমেছে। তবে এখনই কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না। নদীর পানির গুণগত মান, স্রোত, পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন ও মাছের চলাচলের পথসহ বিভিন্ন বিষয় বৈজ্ঞানিকভাবে বিশ্লেষণ করা হবে। সব তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা শেষে মৎস্য অধিদপ্তরের কাছে সুপারিশভিত্তিক প্রতিবেদন দেওয়া হবে।
চাঁদপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. ফখরুল ইসলাম বলেন, সরকারের জাটকা ও মা ইলিশ সংরক্ষণ কর্মসূচি বাস্তবায়নে নিয়মিত অভিযান, সচেতনতামূলক কার্যক্রম এবং জেলেদের খাদ্য সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। ইলিশ উৎপাদন কমে যাওয়ার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে মাঠপর্যায়ে কাজ চলছে। বর্তমানে ইলিশের দাম কিছুটা বেশি থাকলেও সামনে আমদানি বাড়লে বাজার স্বাভাবিক হবে বলে আশা করছি।
এদিকে ইলিশের উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণ অনুসন্ধানে মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করেছে পাঁচ সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ দল। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও ইলিশ গবেষক আনিসুর রহমানের নেতৃত্বে সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (সিইজিআইএস) বিশেষজ্ঞরা জেলা মৎস্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে বিভিন্ন উপজেলার জেলের সংখ্যা, সরকারি সহায়তা, বিকল্প কর্মসংস্থান, প্রণোদনা এবং ইলিশ উৎপাদন কমে যাওয়ার সম্ভাব্য কারণ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করেছেন।
.png)






