Advertisement

ক্যানসারে ধুঁকছেন মা, পরিবারের দায়িত্ব এখন ১০ বছরের মরিয়মের কাঁধে

এশিয়া পোস্ট নিউজ, জামালপুর
ক্যানসারে ধুঁকছেন মা, পরিবারের দায়িত্ব এখন ১০ বছরের মরিয়মের কাঁধে
পরিবারের জন্য রান্না করছেন শিশু মরিয়ম। ছবি: এশিয়া পোস্ট

যে বয়সে বই-খাতা হাতে নিয়ে মাদ্রাসায় যাওয়ার কথা, সেই বয়সেই সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছে ১০ বছরের মরিয়ম। ক্যানসারে আক্রান্ত মায়ের সেবা, দুই বছরের ছোট বোনের দেখাশোনা, রান্নাবান্না ও ঘরের কাজেই কেটে যায় তার দিন। অর্থাভাবে মায়ের চিকিৎসা প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় একদিকে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন ফাতেমা বেগম, অন্যদিকে থমকে যাচ্ছে ছোট্ট মরিয়মের শৈশব ও পড়াশোনা।

জামালপুরের মেলান্দহ উপজেলার নাংলা ইউনিয়নের ভুরুঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা ফাতেমা বেগম। স্বামী আব্দুর রহিম ও তিন মেয়েকে নিয়ে ভালোই চলছিল তাদের সংসার। কিন্তু প্রায় এক বছর আগে ফাতেমার ক্যানসার ধরা পড়ার পর থেকেই বদলে যায় তাদের জীবনের সবকিছু। সুখের সেই সংসারে নেমে আসে একের পর এক দুঃসময়।

সংসারের স্বচ্ছলতা ফেরাতে ধারদেনা করে ২০২৪ সালে সিঙ্গাপুরে যান আব্দুর রহিম। কিন্তু বিদেশে থাকতেই স্ত্রীর ক্যানসারের খবর পেয়ে ২০২৫ সালে দেশে ফিরে আসেন তিনি। এরপর আর বিদেশে যাওয়া হয়নি। স্ত্রীকে বাঁচানোর জন্য নিজের জমানো টাকা, বিদেশে উপার্জিত অর্থ এবং ধার করে জোগাড় করা টাকাসহ প্রায় সাত লাখ টাকা চিকিৎসায় ব্যয় করেন আব্দুর রহিম। দীর্ঘদিন চিকিৎসা চালাতে গিয়ে এখন পরিবারটি নিঃস্ব। অর্থের অভাবে ফাতেমা বেগমের কেমোথেরাপি ও প্রয়োজনীয় ওষুধ কেনা প্রায় বন্ধ হয়ে এসেছে।

অসুস্থ মাকে খাইয়ে দিচ্ছেন শিশু মরিয়ম। ছবি: এশিয়া পোস্ট
অসুস্থ মাকে খাইয়ে দিচ্ছেন শিশু মরিয়ম। ছবি: এশিয়া পোস্ট

কান্নাজড়িত কণ্ঠে ফাতেমা বেগম বলেন, আমার ছোট মেয়ের বয়স যখন ছয় মাস, তখন প্রথম স্তনে একটি টিউমার ধরা পড়ে। কিন্তু শিশুটিকে রেখে চিকিৎসা করাতে পারিনি। পরে এক বছর পর ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পরীক্ষা করালে জানতে পারি, আমার ক্যানসার হয়েছে। এরপর একজনের পরামর্শে প্রায় আট-নয় মাস হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা নিই। কিন্তু এতে অবস্থার উন্নতি তো হয়নি, বরং ক্ষত আরও বড় হয়েছে এবং নিয়মিত রক্ত পড়তে শুরু করেছে। ভুল চিকিৎসার কারণে দিনদিন আমি আরও দুর্বল হয়ে যাচ্ছি। আমার চিকিৎসা করাতে গিয়ে আমার স্বামী সর্বস্ব হারিয়েছেন। এখন আমাদের হাতে কোনো টাকা নেই। আমি আমার সন্তানদের জন্য বাঁচতে চাই। তাদের মুখের দিকে তাকিয়ে দেশের বিত্তবান ও সহৃদয় মানুষের কাছে অনুরোধ, আপনারা দয়া করে আমার চিকিৎসার জন্য সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিন।

অর্থাভাবে চিকিৎসা প্রায় বন্ধ হওয়ার পর থেকে দিন দিন ফাতেমা বেগমের শারীরিক অবস্থার অবনতি হচ্ছে। তীব্র ব্যথায় তিনি স্বাভাবিকভাবে বসতে কিংবা শুয়ে থাকতে পারেন না। বিশেষ করে রাতে যন্ত্রণার তীব্রতায় তার চোখে ঘুম আসে না। অনেক সময় ব্যথায় তার কান্না ও আর্তনাদে স্বামী, সন্তান এমনকি আশপাশের প্রতিবেশীদেরও নির্ঘুম রাত কাটাতে হয়।

মায়ের অসুস্থতার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে ১০ বছরের মরিয়মের জীবনে। একসময় স্থানীয় মাদ্রাসায় নিয়মিত পড়াশোনা করলেও এখন মায়ের সেবা, রান্নাবান্না, কাপড় ধোয়া এবং দুই বছরের ছোট বোনের দেখাশোনা করতেই কেটে যায় তার দিন। ফলে তার লেখাপড়া প্রায় বন্ধ হওয়ার পথে।

মরিয়ম বলে, আমার আম্মু অনেক অসুস্থ। সারাদিন আম্মুর পাশে থাকতে হয়। আম্মুকে ভাত খাওয়াই, ওষুধ দিই, কাপড় ধুই আর ছোট বোনকে দেখি। আগে মাদ্রাসায় যেতাম, বন্ধুদের সঙ্গে পড়তাম। এখন আর নিয়মিত যেতে পারি না। রাতে আম্মু ব্যথায় কাঁদলে আমারও খুব কষ্ট হয়। ডাক্তার বলেছেন, আম্মুর চিকিৎসার জন্য অনেক টাকা লাগবে, কিন্তু আমাদের কাছে সেই টাকা নেই। সবাই যদি একটু সাহায্য করেন, তাহলে হয়তো আমার আম্মু সুস্থ হয়ে যাবে। আম্মু সুস্থ হলে আমি আবার আগের মতো মাদ্রাসায় যেতে চাই, পড়াশোনা করতে চাই।

ফাতেমার স্বামী আব্দুর রহিম বলেন, ২০০৯ সালে বাবা মারা যাওয়ার পর সংসারের দায়িত্ব কাঁধে এসে পড়ে। পরে ঋণ করে সিঙ্গাপুরে গিয়েছিলাম, কিন্তু এক বছর পর খালি হাতেই দেশে ফিরতে হয়। এখন স্ত্রীর ক্যানসার ধরা পড়ার পর আমাদের জীবন আরও কঠিন হয়ে গেছে। আমার স্ত্রী এতটাই অসুস্থ যে পাঁচ মিনিটও তাকে একা রেখে কোথাও যেতে পারি না। তার দেখাশোনা করতে গিয়ে আমি নিজেও কোনো কাজ করতে পারছি না। ফলে সংসারে কোনো আয়ও নেই। প্রতিদিন শুধু ওষুধ কিনতেই ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা লাগে, যা জোগাড় করতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে। এখন আর একা স্ত্রীর চিকিৎসার খরচ বহন করা সম্ভব নয়। তাই দেশবাসী ও বিত্তবান মানুষের কাছে আমার অনুরোধ, আপনারা আমার স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিন।

পরিবারের দায়িত্ব এখন ১০ বছরের মরিয়মের কাঁধে। ছবি: এশিয়া পোস্ট
পরিবারের দায়িত্ব এখন ১০ বছরের মরিয়মের কাঁধে। ছবি: এশিয়া পোস্ট

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রতিবেশীরা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী খাবার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র দিয়ে পরিবারটিকে সহায়তা করছেন। তবে ক্যানসারের মতো ব্যয়বহুল রোগের চিকিৎসার খরচ বহন করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। অর্থের অভাবে চিকিৎসা বন্ধ থাকলে ফাতেমা বেগমের জীবন আরও ঝুঁকির মুখে পড়বে। তাই তার চিকিৎসা অব্যাহত রাখতে সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সহযোগিতা প্রয়োজন।

এ বিষয়ে মেলান্দহ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জিন্নাতুল আরা বলেন, অসুস্থ ওই নারীর আর্থিক সহায়তার প্রয়োজনের বিষয়টি আমরা জেনেছি। তাকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ আবেদন করতে বলা হয়েছে। আবেদন পেলেই সরকারের নিয়ম অনুযায়ী যত দ্রুত সম্ভব আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করা হবে। আর তাদের সন্তানের নিয়মিত স্কুলে যেতে না পারার বিষয়টি আপনাদের মাধ্যমেই জানতে পারলাম। সরকার যেখানে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত মেয়েদের শিক্ষা ফ্রি করে দিয়েছে, সেখানে এমন পরিস্থিতি কেন তৈরি হয়েছে তা খতিয়ে দেখা হবে। পরিবারটির জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হবে।

বিষয় :জামালপুর