কয়লার ময়লাতেই জীবিকা তাদের

দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া কয়লাখনির বর্জ্য নিষ্কাশনের কালো ও বিষাক্ত ড্রেনে জাল পেতে ‘কালো সোনা’ খ্যাত কয়লার গুঁড়া সংগ্রহ করছেন স্থানীয় শতাধিক নারী। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শীত, গ্রীষ্ম কিংবা বর্ষায় টানা ১৫ থেকে ১৬ বছর ধরে এই দুর্গম পেশায় যুক্ত থেকে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন তারা।
সরেজমিন দেখা গেছে, নিজেদের তৈরি বিশেষ নেটের হালচা দিয়ে খনির পানি প্রবাহের ড্রেন থেকে ভাসমান কয়লা সংগ্রহ করছেন তারা। খনির ভূগর্ভ থেকে কয়লা উত্তোলন ও শোধনের পর বর্জ্য পানি পাম্পের মাধ্যমে ভূ-পৃষ্ঠের ড্রেন দিয়ে বাইরে নিষ্কাশন করা হয়। দীর্ঘ সময় ধরে পানির নিচে থেকে যতটুকু কয়লা পাওয়া যায়, তা রোদে শুকিয়ে বিক্রি করেই চলে এই নারীদের জীবন-জীবিকা।
শীত, গ্রীষ্ম কিংবা বর্ষা—জীবিকার তাগিদে ময়লা নিষ্কাশনের এই ড্রেনই এখন তাদের আয়ের প্রধান উৎস। ঝড়-বৃষ্টি বা হিমেল শীতকে উপেক্ষা করে দিনরাত এই বিষাক্ত পানিতে নেমে কয়লা খুঁজতে হয় তাদের। অভাবের সংসারে একটু সচ্ছলতার আশায় তারা বেছে নিয়েছেন দুর্গম এই পথ।

কথা হয় খনির পার্শ্ববর্তী চৌহাটি গ্রামের বাসিন্দা জেসমিন, মরিয়ম ও রুখসানার সাথে। তারা জানান, আশপাশের কয়েকটি গ্রামের ১২০ জন নারী সমবায় ভিত্তিতে কাজগুলো করছেন। দীর্ঘ ১৫ থেকে ১৬ বছর ধরে চলছে তাদের এই সংগ্রাম। এই ১২০ জন নারী মোট আটটি দলে বিভক্ত হয়ে (প্রতি দলে ২০ থেকে ২৫ জন) পালাক্রমে ময়লা পানিতে নেমে কয়লা সংগ্রহ করেন। প্রতিটি দল সপ্তাহে একদিন টানা ২৪ ঘণ্টা কাজ করার সুযোগ পায়।
পানি দিয়ে কয়লা আসার পরিমাণ খনির যন্ত্র চালুর ওপর নির্ভর করে। কখনও বেশি, আবার কখনও কম আসে। ভাগ্য ভালো থাকলে কোনো কোনো দিন প্রতিটি দল সাত থেকে আট মণ, আবার কখনও ১০ থেকে ১২ মণ কয়লা সংগ্রহ করতে পারে। পরে এসব কয়লা প্রতি মণ ৪০০ থেকে ৫০০ টাকায় বিক্রি হয়। ইটভাটা চালু থাকলে দাম বেড়ে দাঁড়ায় ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায়। দলগত কাজ হওয়ায় একজন সদস্য মাসে গড়ে ৩ দিন এই সুযোগ পান এবং দিনে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা আয় করতে পারেন।
কয়লা সংগ্রহকারী জেসমিন আফসোস করে বলেন, যেদিন কাজ থাকে, সেদিন সকালে খেয়ে বেলা ১১টার দিকে পানিতে নেমে পড়ি। অভাবের কারণেই এই কষ্ট করা। তবে দুঃখের বিষয় হলো, খনির পাশের গ্রামের মানুষ হয়েও আমাদের পরিবারের সদস্যরা এখানে চাকরি পায়নি। বাইরের লোক চাকরি করছে, অথচ আমাদের কোনো সুযোগ দেওয়া হয়নি।
মনোয়ারা বেগম নামের এক নারী বলেন, কালো পানিতে নেমে কয়লা তুলে যে টাকা পাই, তাতে কোনো মতে সংসার চলে। প্রায় ১৬ বছর ধরে এই কাজ করছি। কোনো দিন কিছু না পেয়ে খালি হাতেও ফিরতে হয়।
মরিয়ম নামের আরেকজন জানান, নেট সেলাই করে ড্রেনের পিলারের সাথে বেঁধে রাখা হয়। পানির সাথে কয়লা ভেসে যাওয়ার সময় তা নেটে আটকে যায়। মাঝেমধ্যে বাঁশের মাথায় লোহার তৈরি অস্ত্র দিয়ে ময়লা পরিষ্কার করতে হয়। দিনশেষে যা আয় হয়, সবাই সমানভাগে ভাগ করে নেন।

এদিকে দীর্ঘ সময় কয়লাযুক্ত বিষাক্ত পানিতে কাজ করায় স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন এই নারীরা। পানিবাহিত রোগ, চর্মরোগ ও শ্বাসকষ্টে ভুগছেন অনেকেই। স্থানীয়রা জানান, এই কাজ করতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে অনেকে এখন শয্যাশায়ী বা পেশা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। কিন্তু অভাবের কারণে নতুন নতুন নারী এসে যুক্ত হচ্ছেন এই ঝুঁকিপূর্ণ কাজে।
এ বিষয়ে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের আবাসিক চিকিৎসক ডা. আহসান আলী সরকার বলেন, দীর্ঘ সময় দূষিত পানিতে থাকায় হাত ও পায়ের তালুতে ক্ষতের সৃষ্টি হয়। ভূগর্ভস্থ কয়লার সূক্ষ্ম কণা ও রাসায়নিক উপাদান ত্বক, ফুসফুস ও শ্বাসযন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতি করে। বড় কোনো জটিলতা না হলে এই নারীরা চিকিৎসকের কাছে যান না, যা পরবর্তীতে প্রাণঘাতী রূপ নেয়। তাদের স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়াতে এবং চিকিৎসার আওতায় আনা জরুরি।
.png)






