অনলাইন শিক্ষার সংকট: প্রযুক্তি, নৈতিকতা ও মূল্যায়ন পদ্ধতি

কোভিড-১৯ মহামারি আমাদের উচ্চশিক্ষাকে এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল। কয়েক মাসের মধ্যেই শ্রেণিকক্ষ স্থানান্তরিত হয়েছিল জুম, গুগল মিট এবং লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (এলএমএস) এর মত টেকনোলজি নির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থায়। তখন অনলাইন শিক্ষা ছিল একটি জরুরি সমাধান। কিন্তু মহামারি পরবর্তী বিশ্বে এটি আর সাময়িক ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচিত হয়নি। অনলাইন শিক্ষা, ব্লেন্ডেড লার্নিং এবং হাইব্রিড শিক্ষা এখন উচ্চশিক্ষার স্থায়ী বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।
কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন এখনও আমাদের সামনে রয়ে গেছে, তা হলো- অনলাইন শিক্ষার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কি? প্রযুক্তি নাকি নৈতিকতা।
আমাদের ধারণা, দ্রুতগতির ইন্টারনেট, উন্নত সফটওয়্যার কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নির্ভর প্ল্যাটফর্মই অনলাইন শিক্ষার মূল চাবিকাঠি। বাস্তবে এগুলো প্রয়োজনীয়, কিন্তু চূড়ান্ত নয়। অনলাইন শিক্ষার প্রকৃত ভিত্তি একমাত্র প্রযুক্তি নয়। বরং বিশ্বাস (ট্রাস্ট) অর্থাৎ শিক্ষক বিশ্বাস করবেন যে শিক্ষার্থী সততার সঙ্গে শিখছে। অন্যদিকে শিক্ষার্থী বিশ্বাস করবে যে তার মূল্যায়ন হবে ন্যায্যভাবে, আর প্রতিষ্ঠান নিশ্চিত করবে যে পুরো প্রক্রিয়াটি হবে স্বচ্ছ, নিরাপদ ও মানবিক। এই বিশ্বাস একবার ভেঙে গেলে বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক প্রযুক্তিও শিক্ষার মান রক্ষা করতে পারবে না।
অনলাইন শিক্ষার নৈতিক ভিত্তি মূলত: চারটি মূলনীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত। যথা- সততা (ইন্টিগ্রিটি), ন্যায্যতা (ফেয়ারনেস), দায়বদ্ধতা (রেসপন্সিবিলিটি) এবং সম্মান (রেসপেক্ট)। এই চারটি নীতিই শুধু অনলাইন শিক্ষার নয়, যেকোনো মানসম্মত শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তি। তার চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো- শিক্ষার্থীরা কী এবং কেন শিখবে, কীভাবে শিখবে?
শিক্ষাবিজ্ঞানের একটি বহুল প্রচলিত নীতি হলো- ‘অ্যাসেসমেন্ট ড্রাইভস লার্নিং’ অর্থাৎ শিক্ষার্থীরা যেভাবে মূল্যায়িত হয়, সেভাবেই শেখে। যদি পরীক্ষায় শুধু সংজ্ঞা, তালিকা কিংবা মুখস্থ তথ্যের মূল্যায়ন করা হয়, তাহলে শিক্ষার্থীরা মুখস্থ করবে। আর যদি মূল্যায়নে বাস্তব সমস্যা সমাধান, বিশ্লেষণ, যুক্তি, সৃজনশীলতা এবং বাস্তব প্রয়োগকে গুরুত্ব দেওয়া হয়, তাহলে শিক্ষার্থীর শেখার ধরনও পরিবর্তিত হবে।
শিক্ষাবিদ জন বিগস তার কনস্ট্রাকটিভ এলাইনমেন্ট তত্ত্বে দেখিয়েছেন লার্নিং আউটকাম, শিক্ষা পদ্ধতি এবং মূল্যায়ন (অ্যাসেসমেন্ট) এই তিনটি যদি পরস্পরের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তাহলে প্রকৃত শিক্ষা অর্জিত ব্যাহত হতে পারে। অর্থাৎ, আমরা যদি শিক্ষার্থীর মধ্যে সমালোচনামূলক চিন্তা, সৃজনশীলতা বা সমস্যা সমাধানের দক্ষতা দেখতে চাই, তাহলে সেই দক্ষতাগুলোরই মূল্যায়ন করতে হবে। অন্যথায়, লার্নিং আউটকাম কেবল কারিকুলামের একটি সুন্দর বাক্য হয়ে থাকবে। বাস্তব শ্রেণিকক্ষে তার কোনো প্রতিফলন ঘটবে না।
অনলাইন শিক্ষার ক্ষেত্রেও বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখানে শিক্ষক শিক্ষার্থীর পাশে বসে নেই; তিনি মূলত মূল্যায়নের মাধ্যমেই শিক্ষার্থীর শেখা যাচাই করেন। তাই সঠিক ও স্বচ্ছ মূল্যায়নই অনলাইন শিক্ষার প্রাণ। ভাবুন, একজন ক্রিকেটার যদি সারাজীবন শুধু দৌড়ানোর পরীক্ষায় অংশ নেয়, তাহলে কি সে কখনও ভালো ব্যাটসম্যান হতে পারবে? অথবা একজন পাইলট যদি শুধু লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়, কিন্তু কখনও সিমুলেটরে বিমান চালানোর দক্ষতায় মূল্যায়িত না হয়, তাহলে কি আমরা তার হাতে একটি যাত্রীবাহী বিমান তুলে দিতে পারি? একইভাবে একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী যদি শুধু মুখস্থ লিখে ভালো ফল করে, কিন্তু বাস্তব সমস্যার সমাধান করতে না পারে, তাহলে সেই শিক্ষা কতটা অর্থবহ হবে?
কোভিড-১৯ সময়ে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা ও পরীক্ষা পদ্ধতিকে কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই অনলাইনে নিয়ে যায়। যার ফলাফল হিসেবে আমরা দেখতে পাই- অস্বাভাবিকভাবে বেশি নম্বর, একই ধরনের উত্তর এবং ব্যাপক একাডেমিক অসততা। এটি আমাদের একটি বড় শিক্ষা দেয়।
যদি আমরা এমন প্রশ্ন করি, যার উত্তর গুগলে এক মিনিটে পাওয়া যায়, তাহলে শিক্ষার্থী গুগলই ব্যবহার করবে। কিন্তু যদি প্রশ্ন হয়- ‘বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য একটি নতুন সমাধান প্রস্তাব কর’ কিংবা ‘তোমার কর্মস্থলের একটি বাস্তব সমস্যার বিশ্লেষণ কর’—তাহলে গুগল বা অনলাইন প্লাটফরম কোনোটিই শিক্ষার্থীর হয়ে সম্পূর্ণ উত্তর লিখে দিতে পারবে না। অর্থাৎ নৈতিক শিক্ষা শুরু হয় নৈতিক মূল্যায়ন নকশা থেকে।
অনলাইন শিক্ষায় স্বচ্ছতা বলতে শুধু রেকর্ডেড ক্লাস বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বোঝায় না। স্বচ্ছতা মানে- শিক্ষার্থীরা আগে থেকেই জানবে কীভাবে মূল্যায়ন হবে, কোন মানদণ্ডে নম্বর দেওয়া হবে, কী করলে একাডেমিক অসদাচরণ হিসেবে গণ্য হবে এবং তাদের ব্যক্তিগত তথ্য কীভাবে ব্যবহার করা হবে।
একজন বিচারক যদি রায় দেওয়ার আগে আইন গোপন রাখেন, তাহলে সেই বিচার কখনও ন্যায়বিচার হতে পারে না। একইভাবে একজন শিক্ষক যদি মূল্যায়নের মানদণ্ড শিক্ষার্থীর কাছ থেকে গোপন রাখেন, তাহলে সেই মূল্যায়নও নৈতিক হতে পারে না।
অনলাইন শিক্ষা ও মূল্যায়নের নানা আলোচনায় আমরা প্রায়ই বলি– শিক্ষার্থীরা চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করছে, নকল করছে, অন্যের অ্যাসাইনমেন্ট কপি করছে। কিন্তু আমাদের কি নিজেদেরও কিছু প্রশ্ন করা উচিত নয়? শিক্ষক কি নিজে ব্যবহৃত উপকরণের যথাযথ সূত্র উল্লেখ করছেন? তিনি কি যেকোন পরীক্ষার খাতা মুল্যায়নের পর সময়মতো গঠনমূলক ফিডব্যাক দিচ্ছেন? মূল্যায়নে কি পক্ষপাতমুক্ত থাকেস? শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত তথ্য কি গোপন রাখছেন? মূল্যায়নের নিয়ম-কানুন বা রুব্রিকস কি আগেই পরিষ্কার করছেন? অর্থাৎ নৈতিকতা শুধুমাত্র শিক্ষার্থীর একার বিষয় নয়, বরং শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং প্রতিষ্ঠান- তিন পক্ষেরই সমান দায়িত্ব।
শিক্ষাবিদ জন ডিউই বলেছিলেন, জীবনের প্রতিটি অভিজ্ঞতা আমাদের কিছু শেখাতে পারে, কিন্তু সেই শিক্ষা তখনই অর্থবহ হয়, যখন আমরা অভিজ্ঞতার ওপর চিন্তা করি, ভুল থেকে শিক্ষা নেই এবং নিজেকে বদলে নেওয়ার সাহস অর্জন করি। অর্থাৎ অভিজ্ঞতা নয়, অভিজ্ঞতার গভীর প্রতিফলনই প্রকৃত শিক্ষার জন্ম দেয়। কিন্তু সেই প্রতিফলন তখনই সম্ভব, যখন মূল্যায়ন শিক্ষার্থীকে শুধু নম্বর নয়, শেখার সুযোগও দেয়।
কারণ অনলাইন শিক্ষার সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো- আমরা কোন সফটওয়্যার ব্যবহার করছি, এটা নয় বরং প্রশ্ন হলো- আমরা কী ধরনের শিক্ষার সংস্কৃতি গড়ে তুলছি? যদি সেই সংস্কৃতির ভিত্তি হয় সততা, ন্যায়, স্বচ্ছতা ও পারস্পরিক সম্মান, তাহলে অনলাইন শিক্ষা কেবল একটি বিকল্প মাধ্যম হবে না; বরং ভবিষ্যতের উচ্চশিক্ষার সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য, ন্যায়ভিত্তিক এবং মানবিক রূপ হয়ে উঠবে। আর সেই শিক্ষাব্যবস্থায় মূল্যায়ন (অ্যাসেসমেন্ট) হবে শুধু নম্বর দেওয়ার প্রক্রিয়া নয়; বরং শেখার সবচেয়ে শক্তিশালী ও নৈতিক হাতিয়ার।
লেখক: ড. ফুয়াদ হোসেন, ডিন, স্বাস্থ্য বিজ্ঞান অনুষদ, গণ বিশ্ববিদ্যালয়।
.png)





