বাঘ দিবসে বন বিভাগ কেন এত মরিয়া?

আজ ২৯ জুলাই, বাঘ দিবস। জাতীয় প্রাণীর এই দিবসকে ঘিরে সাধ্যমতো আয়োজন করে বন বিভাগ, যেন তারা সাধারণ মানুষ, সংরক্ষণে নিবেদিত প্রাণ ও অংশীজন এবং সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে; যাতে প্রাণীটিকে বাঁচাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়। তবে বন বিভাগের এবারের প্রচেষ্টা হয়তো কিছুটা ভিন্ন, যা অনেকেরই চোখ এড়াচ্ছে না।
বন বিভাগকে কেন এই দৃষ্টি আকর্ষণের অতিরিক্ত তৎপরতা দেখাতে হচ্ছে, প্রশ্ন এসেই যায়। তাহলে কি বাঘ সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেই? এক কথায় উত্তর হচ্ছে- না, যা আছে সেটি যথেষ্ঠ নয় বরং স্তিমিত। এ প্রসঙ্গে একটি অভিজ্ঞতার কথা মনে পড়ে।
ঘটনা ২০২১ সালের। বন দপ্তরে গিয়েছিলাম ‘খেজুরে আলাপের অজুহাতে’ কিছু তথ্য পাওয়ার আশায়। আমাকে ঘণ্টাব্যাপী অপেক্ষমাণ রাখা বন কর্মকর্তা কার্যালয়ে এলেন। চৈত্রের ভরদুপুরের গরমে আমি বিরক্ত হয়েছিলাম। কিন্তু তার চোখ-মুখ যেন তপ্ত রোদের চেয়েও উতপ্ত। ঘটনা জানতে চাইতেই তিনি ক্ষোভ উগরে দিলেন, অসহায়ত্ব প্রকাশ করলেন। যার সংক্ষেপ করলে এমনটা দাঁড়ায় যে, ২০১৫ সালে ইউএসএআইডি-এর অর্থায়নে সুন্দরবনের বাঘ সংরক্ষণে একটি প্রকল্প শুরু হয়, যা দুই ধাপে শেষ হয় ২০১৮ সালে। প্রকল্পটি এতটাই চমকপ্রদ ফল দিয়েছে যে, তারা ভাবতেই পারেননি দীর্ঘ মেয়াদে শুধু এই একটি প্রকল্প গোটা সুন্দরবনটাকেই বাঁচিতে দিতে পারে।
২০১৭ সালের দিকেই কয়েকজন নিবেদিতপ্রাণ (যারা শুধু চাকরি করেন না) বন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়, যেন প্রকল্পটি পরবর্তী ধাপে নিয়ে যেতে প্রয়োজনীয় অর্থসহায়তা দিতে ইউএসএআইডি-কে রাজি করানো যায়। তবে ইতিবাচক আভাস না মেলায় বন বিভাগ নিজেই প্রকল্পটিতে এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তৈরি হয় প্রকল্প প্রস্তাবনা। ২০১৮ সাল থেকে প্রকল্পের প্রস্তাব নিয়ে কয়েকজন পরিকল্পনা কমিশনে দৌড়াচ্ছেন সেটি একনেকে তুলতে।
ওই বনকর্তা অভিযোগ করেন, নানা অজুহাতে পরিকল্পনা কমিশন প্রকল্পে সায় দিচ্ছে না। তাকে নাকি খুব তাচ্ছিল্যের সঙ্গে এমন কথাও শুনতে হয়েছে যে, ‘মানুষ খাবার পায় না, আর আপনারা আছেন বাঘ-ভালুক নিয়ে।’ তিনি বলেন, ‘বন তো বাঁচানো যাচ্ছে না, কোনোমতে টিকে আছে এক সুন্দরবন। এটাও যদি বাঁচাতে না পারি তবে মানুষ আমাদের গায়ে থু থু ছিটাবে।’
আমি জানতে চেয়েছিলাম বন বিভাগের দেওয়া প্রস্তাবে কি আছে, কেন সেটিকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে তারা। তিনি খুব সংক্ষেপে আমাকে জানিয়েছিলেন, বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণার মাধ্যমে সুন্দরবনে বাঘ কমে যাওয়ার প্রধান পাঁচটি কারণ চিহ্নিত করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞরা। এর মধ্যে রয়েছে চোরা শিকার, খাদ্য সংকট, পিটিয়ে হত্যা, বার্ধক্য ও লবণাক্ত পানি পানে লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত হওয়া এবং ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে মৃত্যু। অতএব এগুলো ঠেকানো গেলে সুন্দরবনটিকেই রক্ষা করা সম্ভব হবে।
এবার প্রকল্পের বিস্তারিত জানতে চাইলে তিনি জানান, বনকর্মীদের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয়; বন্যা, জলোচ্ছ্বাস ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় যাতে বাঘগুলো আশ্রয় নিতে পারে এ জন্য বনের অভ্যন্তরে ১২টি উঁচু টিলা তৈরি; শুষ্ক মৌসুমে প্রাণীদের খাবার পানির জন্য জলাধার খনন; বনে দুর্বৃত্তদের আগুন ধরানো ঠেকানো ও সেটি নিয়ন্ত্রণে টাওয়ার নির্মাণ যাতে লাগা আগুন দেখে দ্রুত নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নেওয়া যায়; বাঘ-মানুষ দ্বন্দ্ব নিরসনে ৪৯টি ভিলেজ টাইগার রেসপন্স টিমের ৩৪০ জন সদস্য ও ৪টি রেঞ্জের কমিউনিটি পেট্রোল গ্রুপের ১৮৫ জন সদস্যকে প্রশিক্ষণ প্রদান, পোশাক সরবরাহ ও প্রতি মাসে বনকর্মীদের সঙ্গে মাসিক সভা; ড্রোন ক্যামেরা, স্যাটেলাইট ট্র্যাকার, জিপিএস, বাঘ অজ্ঞানের জন্য ট্রাংকুলাইজিং গান, ক্যামেরা কেনা; পিটিয়ে হত্যা বন্ধে বন থেকে লোকালয়ে যাতে বাঘ প্রবেশ না করতে পারে সেজন্য কয়েক ধাপে ৬০ কিলোমিটার নাইলনের বেড়া দেওয়া; বাঘের রোগ ও প্রতিকারে ব্যবস্থায় গবেষণা ও তার প্রয়োগ এবং পাশাপাশি পরিস্থিতি উন্নতি বুঝতে নিয়মিত বাঘ গণনা অব্যাহত রাখা ইত্যাদি।
তিনি আক্ষেপের সুরে বলেন, ‘অথচ পুরো প্রকল্পটির নাম হয়ে গেল বাঘ গণনা। ঘুরে ফিরে একটা প্রশ্নই সবাই করছেন, ‘বাঘ গুণে কি করবেন?’ অথচ কিছুতেই বোঝাতে পারছি না বাঘ হচ্ছে ‘আমব্রেলা স্পিসিজ’ বা ‘রক্ষক প্রজাতি’। বাঘ না থাকলে বনে হরিণ ও শূকর বাড়বে, তাতে দ্রুত বনের আয়তন কমবে। পাশাপাশি বনে মানুষের অবাধ প্রবেশ বাড়বে, যা দ্রুত বনকে ধ্বংস করে দেবে। অতএব, বাঘ বাঁচানোর অর্থ বন বাঁচানো। যে বন আমাদের খাদ্য, ওষুধ, ঘরবাড়ির উপকরণ ও জীবিকার উৎস, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষাকবচ।’
হতাশার মাধ্যমে সেদিন কথোপকথন শেষ হয়। এর প্রায় এক বছর পর ২০২২ সালের মার্চে ‘সুন্দরবন বাঘ সংরক্ষণ প্রকল্প’ নামে ৩৬ কোটি টাকার একটি প্রকল্পের অনুমোদন দেয় তৎকালীন সরকার। আমি ওই কর্মকর্তাকে ফোন করে অভিনন্দন জানাই। কিন্তু আরও হতাশা প্রকাশ করেন। তিনি জানান, প্রকল্পে তাদের প্রস্তাবের বড় অংশই বাদ দেওয়া হয়েছে। যা প্রকৃত উদ্দেশ্যকে ধীর গতির করে দেবে, প্রতিবন্ধকতা তৈরি করবে। তিনি বলেন, ‘এরচেয়ে অনুমোদন না দিলেও বলতে পারতাম, আমাদের কিছু করতে দেওয়া হয়নি। অথচ এই গাফিলতি ও ইচ্ছাকৃত ব্যর্থতার দায়টা শুধু বন বিভাগের ঘাড়ে আসবে।’
এরপর আরও সময় গেছে। অন্তবর্তীকালীন সরকারে সময় বন বিভাগের ধুঁকতে থাকা সংরক্ষণ প্রকল্পগুলো ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছিল। কিন্তু সরক্ষণ কাজগুলোই দীর্ঘমেয়াদী, স্বল্প মেয়াদে ফল আসে না। অতএব চোখে দেখার মতো কোনো সাফল্য নেই। সম্প্রতি আরেক আলোচনায় একজন নবীন বন কর্মকর্তা বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের অসহযোগিতা এবং নিজেদের কাজের সুযোগ নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেন।
তারমতে, প্রকৃতি বাঁচাতে কঠিন প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে রীতিমতো লড়ছে বন বিভাগ। চট্টগ্রামে সংরক্ষিত বন কেটে রাস্তা নির্মাণের চেষ্টা, কক্সবাজারে পাহাড় কেটে মাটির বিক্রির অপ্রতিরোধ্য সিন্ডিকেট, ভাওয়াল বনের অভ্যন্তরে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের ‘বেহায়াপনা’, সিলেটে সাবেক বনমন্ত্রীর লোকজনের দখল থেকে বন উদ্ধারের চেষ্টাকে কৌশলে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করা, বনকর্মীদের ওপর হুমকি-হামলা ইত্যাদি ‘জাতিগত আত্মঘাতী’ ঘটনা বন বিভাগকে ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত করছে।
যদিও নতুন সরকারের ২৫ কোটি গাছ লাগানো কার্যক্রম, মাতৃগাছ রক্ষার উদ্যোগ, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে কমিশন গঠন ইত্যাদি নানা উদ্যোগ তাদের কিছুটা আশান্বিত করেছে বলেও জানান তিনি। এতে অনেকেই বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন এবার হয়তো অচলাবস্থার পরিবর্তন হবে। তাই হয়তো শেষ চেষ্টা হিসেবে বাঘ-হাতি সংরক্ষণকে সামনে এনে প্রকৃত পরিস্থিতি সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণে ব্যাপক চেষ্টা করছে বন বিভাগ।
বন বিভাগের নবীন কর্মকর্তার মতো আমরা পরিবেশকর্মীরাও আশায় বুক বাঁধি। একটা ব্যাপার তো সত্যি, আমাদের দেশে শক্তিশালী রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও তার কঠোর প্রয়োগ ছাড়া সংরক্ষণ কার্যক্রম সাফল্যের সুযোগ নেই। এই সরকার ‘পরিবেশ সংরক্ষণ ও টেকসই উন্নয়ন’- এর লিখিত প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছে। বন বিভাগও চেয়ে আছে আমাদের বাঘ, হাতি, বন-পরিবেশ-জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে সরকারের শক্ত পদক্ষেপের দিকে। কিন্তু ক্ষমতা গ্রহণের পর এখনও কি সরকার সত্যিই আন্তরিক? সময়ই তা বলে দেবে।
লেখক পরিচিতি
ইনচার্জ, আরটিভি অনলাইন এবং পরিবেশ বিষয়ক সাংবাদিক
.png)







