স্পেনকে হারাতে স্কটল্যান্ডের কাছ থেকে যা শিখতে পারে আর্জেন্টিনা

সাত ম্যাচে একটি গোল হজম, টানা ৩৭ ম্যাচ অপরাজিত। বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার পথে ফ্রান্সের তারকাবহুল আক্রমণভাগকেও প্রায় নির্বিষ করে রেখেছে স্পেন। লুইস দে লা ফুয়েন্তের দলকে এখন হারাবে কে, প্রশ্নটির উত্তর খুঁজতে আর্জেন্টিনাকে ফিরে তাকাতে হতে পারে তিন বছর আগের এক রাতে।
স্পেনকে ৯০ মিনিটের খেলায় সর্বশেষ হারানো দলটির নাম স্কটল্যান্ড। ২০২৩ সালের মার্চে ইউরো বাছাইয়ের ম্যাচে হ্যাম্পডেন পার্কে স্পেনকে ২-০ গোলে হারিয়েছিল তারা। দুটি গোলই করেছিলেন স্কট ম্যাকটমিনে।
তিন বছরের ব্যবধানে স্পেনের দল অনেকটাই বদলে গেছে। তখনো আন্তর্জাতিক ফুটবলে অভিষেক হয়নি লামিন ইয়ামাল ও পাউ কুবারসির। বর্তমান দলের পেদ্রি, ফাবিয়ান রুইস ও উনাই সিমনের মতো গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়েরাও স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে একাদশে ছিলেন না। তাই সেই ম্যাচের পরিকল্পনা হুবহু অনুসরণ করে বিশ্বকাপ ফাইনাল জেতা যাবে, এমন ভাবার সুযোগ নেই।
তবে স্কটল্যান্ড যেভাবে স্পেনকে তাদের স্বাভাবিক খেলার বাইরে ঠেলে দিয়েছিল, সেখান থেকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নিতে পারেন মেসিরা।
উঁচুতে নয়, বেছে বেছে প্রেসিং
স্কটল্যান্ড সেদিন ৫-৪-১ ছকে খেলেছিল। দুই প্রান্তের মিডফিল্ডার রায়ান ক্রিস্টি ও জন ম্যাকগিন সব সময় স্পেনের ডিফেন্ডারদের তাড়া করেননি। বল নির্দিষ্ট জায়গায় যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করেছেন। এরপর সেন্টারব্যাক কিংবা ফুলব্যাককে চাপ দিয়ে স্পেনের পাসের পথ একদিকে আটকে দিয়েছেন।
ফ্রান্স সেমিফাইনালে উঁচুতে প্রেস করতে গিয়ে এই জায়গাতেই ভুল করেছিল। তাদের আক্রমণভাগের চাপ ছিল বিচ্ছিন্ন। একজন এগিয়ে গেলে বাকিরা যথেষ্ট দ্রুত জায়গা বন্ধ করতে পারেননি। স্পেন সহজেই প্রথম চাপ পেরিয়ে মাঝমাঠে সংখ্যার সুবিধা তৈরি করেছে।
আর্জেন্টিনার তাই সারাক্ষণ উঁচুতে প্রেস করার প্রয়োজন নেই। মেসিকে দিয়ে সেন্টারব্যাক তাড়া করানোর চেয়ে রদ্রির কাছে পাস যাওয়ার পথ বন্ধ রাখা বেশি কার্যকর হতে পারে। ব্যাকপাস, বাজে প্রথম স্পর্শ কিংবা বল সাইডলাইনের কাছে যাওয়াকে প্রেসিংয়ের সংকেত বানাতে পারেন স্কালোনি।
রদ্রিকে বল থেকে নয়, ছন্দ থেকে বিচ্ছিন্ন করা
স্পেনের খেলা পরিচালিত হয় রদ্রিকে কেন্দ্র করে। এবারের বিশ্বকাপে অন্য যেকোনো খেলোয়াড়ের তুলনায় তাঁর বলের স্পর্শ ও পাসের সংখ্যা অনেক বেশি। তাঁকে পুরোপুরি বল থেকে দূরে রাখা প্রায় অসম্ভব। কিন্তু স্বচ্ছন্দে ঘুরে দাঁড়ানো ও সামনের দিকে পাস দেওয়ার সময় না দিলেও স্পেনের গতি কমিয়ে দেওয়া যায়।
স্কটল্যান্ড রদ্রির সঙ্গে সরাসরি দ্বন্দ্বে গেছে। তাঁকে বারবার পেছনের দিকে খেলতে বাধ্য করেছে, শরীরী লড়াইয়ে অস্বস্তিতে রেখেছে। ম্যাচ যত এগিয়েছে, রদ্রি ও তাঁর সতীর্থদের হতাশাও তত বেড়েছে।
আর্জেন্টিনার এনজো ফার্নান্দেজ, রদ্রিগো দে পল ও অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের জন্য এটিই হতে পারে বড় দায়িত্ব। কাউকে সারাক্ষণ রদ্রির ছায়া হয়ে থাকতে হবে না। তবে বল পাওয়ার মুহূর্তে এক পাশ বন্ধ করে অন্য পাশ থেকে চাপ দিতে পারলে স্পেনের আক্রমণের ছন্দ নষ্ট হতে পারে।
মাঝখানের দরজা বন্ধ, ক্রস করতে দাও
এক গোলে এগিয়ে যাওয়ার পর স্কটল্যান্ড নিচে নেমে নিজেদের বক্সের মাঝখান সুরক্ষিত করেছিল। স্পেনকে তারা দূর থেকে ক্রস করতে দিয়েছে। কারণ মাঝখান দিয়ে ছোট পাস, কাটব্যাক ও হাফ স্পেসে বল পাওয়া স্পেনের জন্য অনেক বেশি বিপজ্জনক।
স্পেন সেদিন ৭৫ শতাংশ বলের দখল রেখেও আটটির বেশি শট নিতে পারেনি। স্কটল্যান্ড নিয়েছিল নয়টি। দুই দলেরই লক্ষ্যে শট ছিল তিনটি করে, কিন্তু ভালো সুযোগগুলো তৈরি করেছিল স্বাগতিকেরাই।
বর্তমান স্পেন অবশ্য আগের চেয়ে বেশি বৈচিত্র্যময়। মিকেল মেরিনোর উপস্থিতিতে বাতাসে তাদের শক্তিও বেড়েছে। তারপরও পেদ্রি, ইয়ামাল ও ফাবিয়ানকে বক্সের চারপাশে ছোট পাস খেলতে দেওয়ার চেয়ে দূর থেকে ক্রস করতে বাধ্য করাই তুলনামূলক নিরাপদ পথ।
স্পেনের ফুলব্যাকের পেছনে আঘাত
স্কটল্যান্ডের দুটি গোলই এসেছিল তাদের বাঁ প্রান্ত দিয়ে। প্রথম গোলে পেদ্রো পোরোর ভুলের পর অ্যান্ডি রবার্টসনের কাটব্যাক থেকে গোল করেন ম্যাকটমিনে। দ্বিতীয় গোলেও কিয়েরান টিয়ের্নির দৌড়ের সামনে টিকতে পারেননি দানি কারভাহাল। আবারও বক্সে দেরিতে ঢুকে গোল করেন ম্যাকটমিনে।
স্পেন আক্রমণে উঠলে তাদের ফুলব্যাকরা অনেক ওপরে চলে যান। ফলে বল হারানোর পর দুই প্রান্তে জায়গা তৈরি হয়। আর্জেন্টিনার দ্রুত পাল্টা আক্রমণের প্রধান লক্ষ্য হতে পারে সেই জায়গা।
এখানে ম্যাকটমিনের ভূমিকা পালন করতে পারেন এনজো কিংবা ম্যাক অ্যালিস্টার। মেসি নিচে নেমে বল নিলে স্পেনের ডিফেন্ডারদের নজর তাঁর দিকেই থাকবে। সেই সময়ে দ্বিতীয় সারি থেকে বক্সে ঢোকা মিডফিল্ডারকে অনুসরণ করা কঠিন হয়ে যেতে পারে।
ম্যাচকে শুধু ফুটবলের লড়াই থাকতে না দেওয়া
স্কটল্যান্ড সেদিন স্পেনকে শারীরিক ও মানসিক দুই ধরনের লড়াইয়েই টেনেছিল। প্রতিটি দ্বন্দ্বে শরীর লাগিয়েছে, খেলার গতি ভেঙেছে এবং প্রতিপক্ষের প্রতিক্রিয়াকে নিজেদের পক্ষে ব্যবহার করেছে। স্পেন যত বিরক্ত হয়েছে, তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ তত খারাপ হয়েছে।
এই ধরনের ম্যাচে আর্জেন্টিনা স্বচ্ছন্দ। তারা সুন্দর ফুটবল খেলতে পারে, আবার প্রয়োজন হলে ম্যাচকে কঠিন ও আবেগের লড়াইয়েও পরিণত করতে জানে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালেও শুরু থেকে শারীরিক দ্বন্দ্বে পিছিয়ে যায়নি স্কালোনির দল।
তবে আগ্রাসন নিয়ন্ত্রিত হতে হবে। অপ্রয়োজনীয় ফাউল কিংবা কার্ড স্পেনের পরিবর্তে আর্জেন্টিনাকেই বিপদে ফেলতে পারে। লক্ষ্য হবে রদ্রিদের হতাশ করা, নিজেরা মেজাজ হারানো নয়।
স্কটল্যান্ডের নকশা, আর্জেন্টিনার অস্ত্র
২০২৩ সালের স্কটল্যান্ড আর ২০২৬ সালের আর্জেন্টিনার সামর্থ্য এক নয়। স্কালোনির হাতে আছে আরও বেশি গতি, বলের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং সুযোগ কাজে লাগানোর দক্ষতা। সবচেয়ে বড় পার্থক্য মেসি, যিনি একটি পাসেই স্পেনের সাজানো রক্ষণ ভেঙে দিতে পারেন।
স্কটল্যান্ডের কাছ থেকে তাই আর্জেন্টিনার পুরো কৌশল ধার করার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন মূলনীতিগুলো নেওয়া। অকারণে উঁচুতে প্রেস না করা, মাঝখান বন্ধ রাখা, রদ্রিকে বিরক্ত করা, ফুলব্যাকের পেছনে দ্রুত আঘাত এবং দ্বিতীয় সারি থেকে বক্সে ঢোকা।
স্পেনকে হারাতে হলে প্রথমে তাদের স্বাভাবিক ছন্দ থেকে বের করতে হবে। তিন বছর আগে স্কটল্যান্ড সেটিই করেছিল। এবার সেই নকশা আরও উন্নত অস্ত্র নিয়ে প্রয়োগ করার সুযোগ আর্জেন্টিনার।
.png)






