Advertisement

স্পেনের করদোভা মসজিদ, ইসলামি গৌরবের অমর স্মৃতিস্তম্ভ

আফছার হোসাইন
স্পেনের করদোভা মসজিদ, ইসলামি গৌরবের অমর স্মৃতিস্তম্ভ
স্পেনের করদোভা মসজিদ। ছবি: এশিয়া পোস্ট

স্পেনের আন্দালুসিয়ার ঐতিহাসিক নগরী করদোভায় প্রবেশ করতেই যেন সময়ের চাকা ঘুরে যায় এক হাজার বছরেরও বেশি পেছনে। পাথরের পথ, প্রাচীন স্থাপনা আর ইতিহাসের নিঃশব্দ আবহের মাঝখানে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে বিশ্বের অন্যতম বিস্ময়কর স্থাপত্য ‘করদোভা মসজিদ’। বর্তমানে মসজিদটি মেজকিতা-ক্যাথেড্রাল অব করদোভা নামে পরিচিত। এটি শুধু একটি ঐতিহাসিক ভবন নয়; বরং ইসলামি সভ্যতার গৌরব, জ্ঞানচর্চা, শিল্প-সংস্কৃতি এবং ইতিহাসের উত্থান-পতনের এক অনন্য প্রতীক।

৭৮৫ খ্রিস্টাব্দে উমাইয়া শাসক আমির আবদুর রহমান প্রথম এই মসজিদের নির্মাণকাজ শুরু করেন। পরবর্তী দুই শতাব্দীতে তার উত্তরসূরিরা ধাপে ধাপে এর সম্প্রসারণ ঘটান। অবশেষে এটি ইউরোপের বৃহত্তম ও সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন মসজিদ গুলোর একটিতে পরিণত হয়। সে সময় করদোভা ছিল মুসলিম বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ নগরী এবং ইউরোপের জ্ঞান-বিজ্ঞানের রাজধানী।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, একসময় করদোভার রাস্তাগুলো ছিল আলোকিত, যেখানে ইউরোপের বহু শহর তখনও অন্ধকারে নিমজ্জিত। এখানে ছিল শত শত গ্রন্থাগার, অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গবেষণাকেন্দ্র, হাসপাতাল এবং জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠান। চিকিৎসাবিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞান, গণিত, দর্শন, সাহিত্য ও ধর্মতত্ত্বে করদোভার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল পৃথিবীর নানা প্রান্তে। সেই জ্ঞানচর্চার প্রাণকেন্দ্রগুলোর অন্যতম ছিল এই করদোভা মসজিদ।

একসময় এই বিশাল মসজিদে একসঙ্গে প্রায় ৪০ হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতেন। পাঁচ ওয়াক্ত আজানের ধ্বনি, কোরআন তিলাওয়াত, আলেমদের জ্ঞানগর্ভ আলোচনা এবং শিক্ষার্থীদের পাঠচর্চায় মুখর থাকত পুরো প্রাঙ্গণ। এটি ছিল ইবাদতের পাশাপাশি শিক্ষা ও সভ্যতারও এক আলোকবর্তিকা।

ছবি: এশিয়া পোস্ট
ছবি: এশিয়া পোস্ট

মসজিদের ভেতরে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে লাল-সাদা রঙের অসংখ্য দ্বিস্তর খিলান, সারিবদ্ধ শত শত মার্বেল, গ্রানাইট ও জ্যাসপারের স্তম্ভ, যা দর্শনার্থীদের মুহূর্তেই মুগ্ধ করে। স্থাপত্যবিদদের মতে, এই খিলান নির্মাণশৈলী পৃথিবীর ইতিহাসে এক অনন্য উদ্ভাবন, যা পরবর্তীকালে ইউরোপীয় স্থাপত্যেও প্রভাব ফেলেছে।

মসজিদের অঙ্গনে অবস্থিত কমলা বাগান আজও অতীতের সৌন্দর্য বহন করে চলেছে। সারিবদ্ধ কমলা গাছ, প্রাচীন ফোয়ারা এবং প্রশান্ত পরিবেশ দর্শনার্থীদের অন্যরকম অনুভূতি দেয়। আর মসজিদের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ হলো এর অপূর্ব মিহরাব। বাইজেন্টাইন শিল্পীদের হাতে তৈরি সোনালি মোজাইক, সূক্ষ্ম কারুকাজ এবং কোরআনের আয়াতে অলংকৃত এই মিহরাব ইসলামি শিল্পকলার এক অনন্য শ্রেষ্ঠ নিদর্শন হিসেবে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত।

কিন্তু ইতিহাস সব সময় বিজয়ের গল্প বলে না; কখনও কখনও তা বেদনারও সাক্ষী হয়ে থাকে।

১২৩৬ সালে খ্রিস্টান রাজা ফের্দিনান্দ তৃতীয় করদোভা দখল করার পর মসজিদটিকে ক্যাথেড্রালে রূপান্তর করা হয়। পরে এর কেন্দ্রস্থলে নির্মিত হয় বিশাল এক গির্জা। ফলে একই ভবনের ভেতরে আজ পাশাপাশি অবস্থান করছে ইসলামি ও খ্রিস্টীয় স্থাপত্যের দুই ভিন্ন ঐতিহ্য—যা বিশ্বের ইতিহাসে অত্যন্ত বিরল একটি উদাহরণ।

আজ এই স্থাপনায় প্রতিদিন হাজারো পর্যটকের পদচারণা হলেও মুসলমানদের জন্য এখানে নামাজ আদায়ের অনুমতি নেই। অনেক দর্শনার্থী আবেগে দু’হাত তুলে দোয়া করতে বা সিজদায় ঝুঁকে পড়তে চাইলে নিরাপত্তাকর্মীরা বিনয়ের সঙ্গে তা বন্ধ করে দেন। যে স্থানে একসময় ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হতো, আজ সেখানে শোনা যায় পর্যটকদের বিস্ময়ের শব্দ এবং ইতিহাসের নীরবতা।

ছবি: এশিয়া পোস্ট
ছবি: এশিয়া পোস্ট

১৯৮৪ সালে ইউনেস্কো করদোভা মসজিদকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার স্বীকৃতি দেয়। বর্তমানে এটি স্পেনের অন্যতম দর্শনীয় স্থান এবং প্রতিবছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে লাখ লাখ মানুষ এই স্থাপত্য বিস্ময় দেখতে এখানে আসেন। ধর্ম, ইতিহাস কিংবা স্থাপত্য—যে দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখা হোক না কেন, করদোভা মসজিদ প্রতিটি দর্শনার্থীর হৃদয়ে গভীর ছাপ রেখে যায়।

করদোভা মসজিদের প্রতিটি স্তম্ভ, প্রতিটি খিলান, প্রতিটি মোজাইক যেন নীরবে বলে যায় ইসলামি আন্দালুসিয়ার সেই স্বর্ণযুগের গল্প—যখন জ্ঞান ছিল শক্তি, সহনশীলতা ছিল সংস্কৃতি, আর সভ্যতার আলো ছড়িয়ে পড়েছিল ইউরোপের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে।

আজও করদোভা মসজিদ ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এটি শুধু অতীতের গৌরবের স্মারক নয়; বরং মানবসভ্যতার জন্য এক অনন্ত শিক্ষা—ক্ষমতা পরিবর্তিত হয়, সাম্রাজ্য বিলীন হয়, কিন্তু ইতিহাস কখনও হারিয়ে যায় না। যুগের পর যুগ ধরে সে তার গল্প বলে যায়, যারা শুনতে জানে তাদের কাছে।