ইরান যুদ্ধের খরচ মেটাতে ‘হিমশিম’ খাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, ট্রিলিয়ন ডলার বাজেটের প্রস্তাব

ইরানের সঙ্গে দীর্ঘায়িত সামরিক সংঘাতের জেরে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ ব্যয় দ্রুত বাড়ছে। এ পর্যন্ত মোট ব্যয় ৩ হাজার ৭৫০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। একই সঙ্গে অতিরিক্ত সামরিক বাজেট অনুমোদনের জন্য কংগ্রেসের কাছে জরুরি আবেদনও জানিয়েছেন তিনি। অবশ্য এ নিয়ে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট উভয় দলের আইনপ্রণেতাদের কঠিন প্রশ্নের মুখেও পড়তে হয়েছে তাকে।
ইরানে নতুন করে ভারী বোমাবর্ষণ শুরুর পর প্রথমবারের মতো মঙ্গলবার (২১ জুলাই) হেগসেথ কংগ্রেসের আইনপ্রণেতাদের মুখোমুখি হন। মূলত অজনপ্রিয় এ যুদ্ধ চালিয়ে নিতে জরুরি তহবিল চাইতে সেখানে গিয়েছিলেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনের বাকি আর মাত্র কয়েক মাস। আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টিকে কঠিন লড়াইয়ের মুখে পড়তে হতে পারে। অন্যদিকে জনমত জরিপগুলোয় এখন বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন ডেমোক্র্যাটরা। তারা অজনপ্রিয় এ যুদ্ধের খরচের সঙ্গে জনগণের জীবনযাপন ব্যয়ের সামর্থ্যের বিষয়টি যুক্ত করার চেষ্টা করছেন।
ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত ওই শুনানিতে আইনপ্রণেতাদের হেগসেথ জানান, ৩ হাজার ৭৫০ কোটি ডলারের এ হিসাবে যুদ্ধের নির্দিষ্ট কিছু খাতের খরচ ধরা হয়েছে। আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সম্ভাব্য খরচের হিসাবও এর মধ্যে রয়েছে।
তবে মাত্র চার মাসের ব্যবধানে এই বিপুল অঙ্কের হিসাব পেন্টাগন কীভাবে নির্ধারণ করেছে, তা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা। গত মার্চ মাসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, যুদ্ধের প্রথম ছয় দিনেই অন্তত ১ হাজার ১৩৩ কোটি ডলার ব্যয় করেছিল ট্রাম্প প্রশাসন।
গত মাসে কংগ্রেসের কাছে আরও প্রায় ৯ হাজার কোটি ডলার অতিরিক্ত তহবিল চেয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর বেশির ভাগই ইরান যুদ্ধকেন্দ্রিক। একদিনে মার্কিন আইনপ্রণেতারা এ যুদ্ধ নিয়ে যেমন হতাশ, তেমনি অন্যদিকে আগামী নভেম্বরেই মধ্যবর্তী নির্বাচন। এই পরিস্থিতিতে মোটা অঙ্কের তহবিলের ‘আবদার’ ঘিরে আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন করে লড়াইয়ের ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ওপর বোমা হামলা শুরু করার পর থেকে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট উভয় দলের আইনপ্রণেতারাই অভিযোগ করে আসছেন যে, ট্রাম্প ও তার দল এই সংঘাত বা তাদের পরিকল্পনা সম্পর্কে তাদের অবহিত রাখেনি।
সিনেট কমিটির শুনানিতে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির শীর্ষ প্রতিনিধি ও সিনেটর প্যাটি মারে অত্যন্ত কড়া ভাষায় বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দিন দিন এই সংঘাতকে আরও বাড়িয়ে তুলছেন। বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলার মতো যুদ্ধাপরাধের হুমকি দিচ্ছেন। তিনি ইঙ্গিত দিচ্ছেন যে, আরেকটি অন্তহীন যুদ্ধে পরিণত হতে যাচ্ছে।’
ট্রাম্প এর আগে বারবার ইরানের বেসামরিক অবকাঠামোসহ বিভিন্ন স্থানে হামলার কড়া হুমকি দিয়েছেন। সমালোচকদের মতে, এ ধরনের হামলা চালালে তা যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।
আরেক জ্যেষ্ঠ ডেমোক্র্যাটিক সিনেটর কার্স্টেন গিলিব্র্যান্ড সরাসরি প্রতিরক্ষামন্ত্রীকে তোপ দেগে বলেন, ‘আপনার ও এই প্রশাসনের ওপর মার্কিন জনগণের এত ক্ষুব্ধ হওয়ার প্রধান কারণ হলো আপনাদের কথার সঙ্গে কাজের কোনো মিল নেই। কখনো বলা হচ্ছে যুদ্ধ দুই সপ্তাহে শেষ হবে, কখনো বলা হচ্ছে শেষ হয়নি। কখনো বলছেন ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বন্ধ হবে, কখনো বলছেন হবে না।’
অপ্রীতিকর সংঘাত ও মুদ্রাস্ফীতির জেরে মার্কিন জনগণের ক্ষোভের সুযোগ নিয়ে ডেমোক্র্যাটরা যখন নির্বাচন কেন্দ্রিক প্রচারণায় সোচ্চার, ঠিক তখনই মার্কিন সেনা সদস্য হতাহতের ঘটনা রাজনৈতিক উত্তাপ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। সংঘাত শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ১৮ জন মার্কিন সেনা নিহত এবং প্রায় ৪৫০ জন আহত হয়েছেন।
পেন্টাগনের বাজেটে চরম ঘাটতির কথা তুলে ধরে হেগসেথ হুঁশিয়ারি দেন, জরুরি ভিত্তিতে অতিরিক্ত এই বরাদ্দ অনুমোদন না দেওয়া হলে সামরিক প্রশিক্ষণ ও নিয়মিত নিরাপত্তা কার্যক্রম সীমিত করতে বাধ্য হবে পেন্টাগন। পরিস্থিতি মোকাবিলায় কংগ্রেসের কাছে প্রায় ৯ হাজার কোটি ডলার অতিরিক্ত ফান্ডের আবেদন করেন। পাশাপাশি ২০২৭ অর্থবছরের জন্য রেকর্ড ১.৫ ট্রিলিয়ন (১.৫ লাখ কোটি) ডলারের বাজেট মঞ্জুরেরও আহ্বান জানান তিনি।
তবে গত জুনের মাঝামাঝিতে সাময়িক যুদ্ধবিরতি পুরোপুরি ভেঙে পড়ার পর থেকেই দুই দেশ একে অপরের ওপর প্রতিদিন বিধ্বংসী আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে। নাতানজ এলাকার দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক সেন্ট্রিফিউজ স্থাপনায় খুব শিগগিরই চূড়ান্ত আঘাত হানার হুমকি দিয়ে রেখেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।
.png)






