ব্রিটিশ জাদুঘরে আড়াই লাখ মানব দেহাবশেষ, ফাঁস হতেই সমালোচনার ঝড়

যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন জাদুঘরে বিদেশি মানুষের দেহাবশেষ সংরক্ষিত রয়েছে। এটা অনেক এমপি ও প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, ধর্ম অবমাননাকর এবং ঔপনিবেশিক যুগের লজ্জাজনক উত্তরাধিকার। দেশটির জাদুঘরগুলোতে বিশ্বের অন্তত ২ লাখ ৬৩ হাজারের বেশি মানব দেহাবশেষ রাখা আছে। এর মধ্যে রয়েছে সম্পূর্ণ কঙ্কাল, মিশরীয় মমি, খুলি, হাড়, ত্বক, দাঁত, নখ ও চুলের মতো বিভিন্ন অংশ। এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশ করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান।
তথ্য অধিকার আইনের অনুরোধের জবাবে জানা গেছে, অন্তত ৩৭ হাজার দেহাবশেষ বিদেশ থেকে আনা হয়েছে। এর মধ্যে অনেকগুলোই সাবেক ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে সংগ্রহ করা। আরও প্রায় ১৬ হাজার দেহাবশেষের উৎস সম্পর্কে কোনো তথ্য নেই।
ইউরোপের বাইরে থেকে আসা দেহাবশেষগুলোর মধ্যে আফ্রিকা থেকে ১১ হাজার ৮৫৬টি, এশিয়া থেকে ৯ হাজার ৫৫০টি, ওশেনিয়া থেকে ৩ হাজার ২৫২টি এবং আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ৪ হাজার ২৫৬টি সংগ্রহ করা নমুনাও রয়েছে। আর ইউরোপ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে ২৮ হাজার ৯১৪টি দেহাবশেষ।
লন্ডনের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামে অ-ইউরোপীয় মানব দেহাবশেষের সবচেয়ে বড় সংগ্রহ রয়েছে, যেখানে ১১ হাজারের বেশি নমুনা রাখা হয়েছে। দ্বিতীয় বৃহত্তম সংগ্রহ রয়েছে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকওয়ার্থ ল্যাবরেটরিতে। সেখানে প্রায় ৮ হাজার ৭৪০টি দেহাবশেষ সংরক্ষিত আছে। এর মধ্যে আফ্রিকা থেকে আনা নমুনার সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি।
মানব দেহাবশেষ সংরক্ষণ করা হয় এমন ২৪১টি জাদুঘর, বিশ্ববিদ্যালয় ও কাউন্সিলের মধ্যে মাত্র ১০০টি প্রতিষ্ঠান তাদরে সংগ্রহে থাকা ব্যক্তিদের সঠিক বা আনুমানিক সংখ্যা প্রকাশ করেছে। এসব প্রতিষ্ঠানে মোট ৭৯ হাজার ৩৩৪ জন মানুষের দেহাবশেষ রয়েছে বলে জানা গেছে।
কিছু প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, তাদের কাছে মানুষের দেহাবশেষ ভরা কয়েকটি কার্ডবোর্ডের বাক্স রয়েছে, কিন্তু সেগুলোর ভেতরে ঠিক কতগুলো দেহাবশেষ আছে বা সেগুলো কোথা থেকে এসেছে—সে সম্পর্কেও কোনো তথ্য নেই।
এই পরিস্থিতির সমালোচনা করে ব্রিটিশ রাজনীতিবিদ লর্ড পল বোয়াটেং বলেছেন, এতে যুক্তরাজ্যের অনেক জাদুঘর ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেন সাম্রাজ্যবাদী ইতিহাসের স্মৃতিচিহ্নে পরিণত হয়েছে।
একইভাবে সংসদ সদস্য বেল রিবেইরো-অ্যাডি বলেছেন, ‘অন্য দেশ থেকে আনা মানুষের দেহাবশেষ বাক্সে রেখে সংরক্ষণ করা অমানবিক এবং অনেক ক্ষেত্রেই এগুলোর পরিচয় পর্যন্ত জানা নেই। এটা অপরাধ। এই দেহাবশেষগুলো সংরক্ষণ ও প্রদর্শন করা সম্পূর্ণরূপে অসম্মান করা। মৃত্যুতেও তাদের ন্যায্য মর্যাদা থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। এই কার্যকলাপ আমাদের জাতির জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক।’
সাবেক লেবার ক্যাবিনেট মন্ত্রী বোয়াটেং বলেন, যুক্তরাজ্যে সংরক্ষিত বিপুল সংখ্যক মানব দেহাবশেষ রাখা ‘স্পষ্টতই ধর্মবিরুদ্ধ এবং গভীরভাবে আধ্যাত্মিক অনুভূতিতে আঘাত হানে’।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ববিদ অধ্যাপক ড্যান হিকস বলেন, এসব দেহাবশেষের অনেকগুলোই ঔপনিবেশিক যুগে কবরস্থান বা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল। পরে গবেষণা বা বর্ণবাদী ছদ্মবিজ্ঞানের কাজে ব্যবহার করা হয়েছে। তার মতে, অনেক জাদুঘর মানব দেহাবশেষ সম্মানের সঙ্গে সংরক্ষণ করার সরকারি নির্দেশনাও ঠিকভাবে মানছে না।
সমালোচকদের মতে, এসব দেহাবশেষের একটি জাতীয় তালিকা তৈরি করা এবং যেখান থেকে নেওয়া হয়েছে সেসব দেশ বা সম্প্রদায়ের কাছে ধীরে ধীরে ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা উচিত। যদিও কিছু জাদুঘর বলেছে, তারা দেহাবশেষ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে উচ্চ মান বজায় রাখে এবং যেসব সম্প্রদায় তাদের পূর্বপুরুষদের দেহাবশেষ ফেরত চাইবে, তাদের সঙ্গে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।
জাদুঘর অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, ঔপনিবেশিক আমলে যুক্তরাজ্যের সংগ্রহে থাকা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিদেশি মানব দেহাবশেষ সংগ্রহ করা হয়েছিল। সংস্থাটির পরিচালক শ্যারন হিল বলেছেন, মানব দেহাবশেষের নৈতিক ব্যবহার ও সংরক্ষণ নিয়ে হালনাগাদ নির্দেশিকা ও আইন প্রণয়ন করা হলে জাদুঘরগুলো তা স্বাগত জানাবে, যাতে উৎসভূমির সম্প্রদায়গুলোকে সহায়তা করা যায়।
ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, তাদের সংগ্রহে থাকা মানব দেহাবশেষের যত্ন ও তত্ত্বাবধানে উচ্চ মান বজায় রাখতে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। জাদুঘরের এক মুখপাত্র জানান, যেসব ক্ষেত্রে অনুরোধকারী সম্প্রদায় ও উৎসস্থলের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা গেছে, সেখানে দেহাবশেষ ফেরত দিতে জাদুঘর কখনও অস্বীকৃতি জানায়নি।
এ ছাড়া ডাকওয়ার্থ কালেকশনের ওয়েবপেজে বলা হয়েছে, মানব দেহাবশেষের যত্ন ও সংরক্ষণে তারা সরকারি নির্দেশিকা অনুসরণ করে।




