খামেনির জানাজায় বহু মৃত্যুর শঙ্কা, খোঁড়া হয়েছে হাজার হাজার কবর

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর সময় নিহত হওয়ার আগে ৩৭ বছর ধরে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি।
শনিবার (৪ জুলাই) তার কফিনবন্দি মরদেহে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে তেহরানের ইমাম খোমেনি গ্র্যান্ড মোসল্লায় রাখা হয়েছে। শিয়া মতাদর্শীদের সর্বোচ্চ নেতাকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে বিশাল খোলা ময়দানে জড়ো হয়েছেন হাজার হাজার ইরানি।
কালো পোশাক পরিহিত শোকাহতরা ইরানের লাল, সাদা ও সবুজ জাতীয় পতাকায় নিজেদের আচ্ছাদিত করেছেন। তাদের অনেকের হাতে ছিল প্রয়াত আলী খামেনি এবং তার পুত্র ও বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির ছবি সম্বলিত পোস্টার ও এ৪ আকারের মুদ্রিত প্রতিকৃতি। তবে সপ্তাহব্যাপী প্রয়াত নেতার এই শেষ বিদায়ের কর্মসূচিতে শত্রু ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে হামলার শঙ্কা করছেন কর্মকর্তারা।
জার্মান সম্প্রচারমাধ্যম ভেল্ট-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির জানাজা কেন্দ্র করে ইরানি কর্তৃপক্ষ প্রকাশ্যে শক্তি প্রদর্শনের চেষ্টা করলেও, পর্দার আড়ালে সম্ভাব্য বড় ধরনের প্রাণহানির আশঙ্কায় প্রস্তুতি নিচ্ছে। শত্রুপক্ষ থেকে হামলা কিংবা নাশকতা, পদদলিত ও গরমজনিত কারণে এই প্রাণহানির ঘটনা ঘটতে পারে। এ জন্য খোঁড়া হচ্ছে হাজার হাজার কবর।
প্রস্তুত হচ্ছে হাজার হাজার কবর
তেহরান থেকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সাংবাদিকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের রেড ক্রিসেন্ট ও জাতীয় সংকট ব্যবস্থাপনা সংস্থা প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ-রেজা আরেফকে পাঠানো একটি গোপন চিঠিতে ১ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার জনের মৃত্যুর আশঙ্কার কথা উল্লেখ করেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সম্ভাব্য মৃত ও নিখোঁজদের ব্যবস্থাপনার জন্য একটি বিশেষ ইউনিট গঠন করা হয়েছে। তেহরানের বেহেশত-ই জাহরা কবরস্থানে হাজার হাজার নতুন কবরও খোঁড়া হয়েছে। তেহরান পৌরসভার এক কর্মচারীর ভাষ্য, ‘প্রস্তুত কবরগুলো সত্যিই রয়েছে। দায়িত্বপ্রাপ্তদের বলা হয়েছে, প্রায় ৩ হাজার মরদেহ সামাল দেওয়ার মতো প্রস্তুতি রাখতে। এত বড় জনসমাগম ও প্রচণ্ড গরমে কী ঘটবে, তা কেউ জানে না।’
আজ শনিবার তেহরানে জানাজা শুরু হয়েছে। এরপর কর্মসূচি কোম, ইরাকের নাজাফ ও কারবালা হয়ে মাশহাদে গিয়ে শেষ হবে। সেখানে আলী খামেনিকে দাফন করা হবে। ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এতে প্রায় ২ কোটি মানুষ অংশ নিতে পারেন।
নিরাপত্তা ও রসদ সরবরাহের ব্যাপক কর্মযজ্ঞ
ইসলামি প্রজাতন্ত্রের কর্তৃপক্ষ জানাজাকে কেন্দ্র করে বিস্তৃত নিরাপত্তা ও লজিস্টিক পরিকল্পনা নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে চলাচলে বিধিনিষেধ, সম্ভাব্য বিমান চলাচলে বিঘ্ন, হাজার হাজার বাসের ব্যবস্থা, অস্থায়ী রান্নাঘর স্থাপন এবং অংশগ্রহণকারীদের আশ্রয়ের জন্য স্কুল ও মসজিদ ব্যবহার।
কট্টরপন্থি মেয়র আলিরেজা জাকানির নেতৃত্বাধীন তেহরান পৌরসভা ১১ হাজার বাস সড়কে নামিয়েছে। পাশাপাশি মেট্রো ও বিআরটি সেবা দিনরাত বিনামূল্যে চালু রাখা হয়েছে। তিন দিনব্যাপী এই কর্মসূচির জন্য তেহরানের প্রতিটি জেলায় প্রায় ৫ লাখ থেকে ৬ লাখ ৫০ হাজার ইউরোর সমপরিমাণ অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে।
সম্প্রচারমাধ্যম ভেল্ট-এর বরাত দিয়ে সরকার-ঘনিষ্ঠ সাংবাদিকরা জানিয়েছেন, শুধু তেহরানের জন্য মোট বাজেট প্রায় দেড় কোটি ইউরো (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২১৩ কোটি টাকা)। এ ছাড়া কোম ও মাশহাদের জন্য আরও ৫ কোটি ইউরো (প্রায় ৭০৬ কোটি টাকা) করে বরাদ্দ রাখা হয়েছে। নাজাফ ও কারবালায় অতিরিক্ত কর্মসূচি যুক্ত হওয়ায় এই দাফন কর্মসূচি আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম ব্যয়বহুল রাষ্ট্রীয় দাফন অনুষ্ঠানে পরিণত হতে পারে।
বিপর্যয়ের শঙ্কা ঘনীভূত
বড় আকারের জানাজা-দাফন আয়োজন নিয়ে ইরানের অতীত অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। ২০২০ সালে কেরমানে আইআরজিসি কমান্ডার কাসেম সোলেইমানির জানাজায় পদদলিত হয়ে অন্তত ৫৬ জন নিহত এবং ২০০ জনের বেশি আহত হন। এর আগে ১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির জানাজ ও দাফনেও বিশৃঙ্খল হয়ে পড়েছিল। সেবার অন্তত আটজন নিহত ও শতাধিক মানুষ আহত হন।
ভেল্ট-এর প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এই জানাজা-দাফন প্রক্রিয়া ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনাও তীব্র। কট্টরপন্থি সমর্থকেরা রাতের সমাবেশগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা স্মারকের বিরোধিতা করছেন। একই সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি ও সংসদ স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফসহ আলোচনায় যুক্ত শীর্ষ কর্মকর্তাদেরও হুমকি দিচ্ছেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, কিছু অংশগ্রহণকারী খামেনির হত্যার প্রতিশোধ নিতে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, কয়েকজন কট্টরপন্থি ধর্মীয় বক্তা হাতে রাইফেল নিয়ে ‘উগ্র’ বক্তব্য দিচ্ছেন। এদিকে জানাজা-দাফনের বিপুল ব্যয়, দেশের অর্থনৈতিক সংকট ও রাজনৈতিক প্রদর্শনের জন্য রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবহারের অভিযোগে জনমনে ক্ষোভও বাড়ছে।






