মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা সবচেয়ে বেশি কোন টুথপেস্টে, ক্ষতি কতটুকু

দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া ৩৪টি টুথপেস্টের নমুনা পরীক্ষা করে ২৬টিতেই ক্ষতিকর মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত পরিচালিত এ গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। এর মধ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক থাকা কোন টুথপেস্টের ক্ষতি কেমন, তা জানানো হয়েছে।
গবেষণায় প্রতি ১০০ গ্রাম টুথপেস্টে ২০ থেকে ৩২০টি পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি কোম্পানির টুথপেস্টে ক্ষতিকারক কণা বেশি পাওয়া গেছে, সেগুলো হলো—
সবচেয়ে বেশি ৩২০টি কণা পাওয়া গেছে মেডিপ্লাস ফ্লুরাইড জেলে।
মেডিপ্লাসের পর ক্লোজআপ রেড হটে ১৬০টি কণা পাওয়া যায়।
গবেষণায় ক্লোজআপ মেন্থল ফ্রেশ ১৬০টি কণার অস্তিত্ব পাওয়া গেছে।
কোডোমো আল্ট্রা শিল্ড ফর্মুলা-স্ট্রবেরিতে পাওয়া গেছে ১৪০টি কণা।
সিগন্যাল গ্রিন টিতে ১২০টি কণা।
পেপসোডেন্ট অ্যাডভান্স সল্টে ১০০টি কণা।
হিমালয়া কমপ্লিট কেয়ারে ১০০টি কণা পাওয়া গেছে।
জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মতামত
দেশব্যাপী ২ হাজার ৭৬০ জনের ওপর পরিচালিত ভোক্তা জরিপে দেখা গেছে, টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক সম্পর্কে সচেতনতা এখনও সীমিত। অংশগ্রহণকারীদের ৪১ দশমিক ৯ শতাংশ জানিয়েছেন, তারা আগে কখনও এ বিষয়ে শোনেননি। ৩১ দশমিক ৩ শতাংশ এ বিষয়ে শুনলেও বিস্তারিত জানেন না। মাত্র ২৬ দশমিক ৯ শতাংশ উত্তরদাতা এ বিষয়ে সচেতন বলে জানিয়েছেন।
মাইক্রোপ্লাস্টিকযুক্ত টুথপেস্ট ব্যবহারে মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকির কথা জানিয়েছেন চিকিৎসকেরাও। তারা বলছেন, মাইক্রোপ্লাস্টিক পেটে গেলে হজম হয় না। এগুলো পেটে জমা হয়ে ধীরে ধীরে অকার্যকর করে দিতে পারে কিডনি ও লিভার।
পরিবেশবিষয়ক গবেষণা সংস্থা ‘এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন’ (এসডো) দীর্ঘ এক বছরের গবেষণা ও সমীক্ষা শেষে রোববার (২৬ জুলাই) প্রতিবেদনটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করে।
গবেষণায় দেশের বিভিন্ন সুপারশপ, খুচরা দোকান ও পাইকারি বাজার থেকে স্থানীয় ও আমদানি করা ১৯টি ব্র্যান্ডের ৩৪টি টুথপেস্টের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। পরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের এনভায়রনমেন্টাল হেলথ অ্যান্ড ইকোটক্সিকোলজি ল্যাবরেটরিতে এসব নমুনার পরীক্ষাগার বিশ্লেষণ করা হয়।
যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা
রাজধানীর জাতীয় গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিটিউট ও হাসপাতালের সহকারী রেজিষ্ট্রার ডা. এম এম মোশফিকুর রশিদ এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘সাধারণত টুথপেস্ট আমরা গিলে খাই না। যদি ভুলক্রমে গিলে ফেলি, বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে প্লাস্টিকজাত উপাদান হওয়ায় মাইক্রোপ্লাস্টিক শরীরে ঢুকলে কোনোভাবেই হজম হয় না। ফলে এগুলো পাকস্থলি থেকে শুরু করে পুরো পরিপাকতন্ত্রে (জিআই সিস্টেম) জমা হয়ে স্বাভাবিক ক্রিয়াকলাপ ব্যাহত করে। এ ছাড়া পাকস্থলির এসিড ও এনজাইমের প্রভাবে কিছু মাইক্রোপ্লাস্টিক রক্তের সঙ্গে মিশে কিডনি, লিভার, ত্বক ও মস্তিষ্কের মতো সংবেদনশীল অঙ্গে জমা হতে পারে। ভারী ধাতুর মতো এসব উপাদানের উপস্থিতি অঙ্গগুলোর স্বাভাবিক কার্যকারিতা ধ্বংস করে দেয় বলে জানান এই চিকিৎসক।
বর্তমানে দেশে পাকস্থলি ও অন্ত্রের রোগ এবং ক্যানসারের প্রকোপ আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে উল্লেখ করে মোশফিকুর রশিদ বলেন, ‘খাদ্যাভ্যাসের পাশাপাশি এ ধরনের মাইক্রোপ্লাস্টিক মানবদেহে অতিরিক্ত স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে এবং অল্প বয়সেই ক্যানসারের মতো প্রাণঘাতী রোগের আশঙ্কা বাড়াচ্ছে।’
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) প্রন্থোডন্টিকস বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মো. আমজাদ হোসেন এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘মানুষের শরীরে প্রতিটি উপাদানের একটি নির্দিষ্ট সহনীয় মাত্রা বা ফিজিওলজিক লিমিট থাকে। যদি টুথপেস্টে থাকা এই প্লাস্টিক কণাগুলো টক্সিক লেভেল বা বিষক্রিয়ার মাত্রা অতিক্রম করে, তবে তা শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘টুথপেস্ট ব্যবহারের সময় অনিচ্ছাকৃতভাবে এই মাইক্রোপ্লাস্টিকগুলো পেটে চলে গেলে দীর্ঘমেয়াদে বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। এর ফলে কিডনিতে জটিলতা, রক্তের বিভিন্ন সমস্যা এবং হজম প্রক্রিয়ায় বিঘ্ন ঘটাসহ শরীরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের ক্ষতি হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।’
.png)





