চামড়াজাত পণ্য/৪ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি বাজার নেমেছে ১ বিলিয়নের নিচে

৪ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি বাজার নেমেছে ১ বিলিয়নের নিচে
ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বব্যাপী চামড়াজাত পণ্যের বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হলেও বাংলাদেশের চামড়া শিল্প ক্রমেই প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা হারাচ্ছে। খাতসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের নীতিগত ব্যর্থতার কারণেই সম্ভাবনাময় এই শিল্প দীর্ঘমেয়াদি সংকটে পড়েছে।

একসময় প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি বাজার নিয়ে দেশের অন্যতম প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত ছিল চামড়া শিল্প। কিন্তু বর্তমানে সেই রপ্তানি আয় এক বিলিয়ন ডলারেরও নিচে নেমে এসেছে।

বিশাল সম্ভাবনা

ব্যবসায়ী নেতারা বলেন, বিশ্বজুড়ে পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সিনথেটিক ও কৃত্রিম চামড়াজাত পণ্যের তুলনায় প্রাকৃতিক চামড়াজাত পণ্যের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। ইউরোপ-আমেরিকা ছাড়াও জাপান, রাশিয়া, অস্ট্রেলিয়াসহ উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোতেও চামড়াজাত পণ্যের বাজার দ্রুত বাড়ছে। এ অবস্থায় দেশীয় কাঁচামাল হিসেবে চামড়ার বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশের চামড়াজাত পণ্য— বিশেষ করে জুতা, হ্যান্ডব্যাগ, বেল্ট, ওয়ালেটসহ বিভিন্ন ফিনিশড পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে ভালো সুনাম রয়েছে।

তাদের ভাষ্য, চামড়াজাত পণ্য দেশের সর্বোচ্চ মূল্য সংযোজনকারী রপ্তানি খাতগুলোর একটি। অথচ নানা সংকটে শিল্পটির ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধি এখন হুমকির মুখে।

পতনের নেপথ্যে

খাতসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার ভুল নীতির মাধ্যমে চামড়া শিল্পকে সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে।

তাদের মতে, ঢাকার হাজারীবাগ থেকে সাভারের হেমায়েতপুরে ট্যানারি শিল্প স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সময় প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, বিশেষ করে কার্যকর কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) সম্পূর্ণ না করেই স্থানান্তর সম্পন্ন করা হয়।

সিইটিপি স্থাপন করা হলেও এতে গুরুতর কারিগরি ও পরিচালনাগত ত্রুটি রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত বর্জ্যপানি ধলেশ্বরী নদীতে গিয়ে মিশছে এবং বিভিন্ন খালের মাধ্যমে তা বুড়িগঙ্গাতেও পৌঁছাচ্ছে। এ ছাড়া শিল্পনগরীতে কার্যকর কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না থাকায় পরিবেশ দূষণ আরও বেড়েছে।

ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা জানান, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ (এলডব্লিউজি) সনদ না পাওয়াও রপ্তানি বাজার সংকুচিত হওয়ার অন্যতম কারণ। আন্তর্জাতিক পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় অনেক কারখানা এই সনদ অর্জন করতে পারেনি।

তাদের মতে, পর্যাপ্ত পরিবেশগত সম্মতি, কার্যকর বর্জ্য শোধনাগার এবং পানি পুনর্ব্যবহার সুবিধার অভাবে ইউরোপ ও আমেরিকার অনেক ক্রেতা বাংলাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।

শিল্পসংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করেন, সিইটিপি উন্নয়ন ও পরিবেশগত ঘাটতি দূর করতে বারবার আবেদন জানানো হলেও পূর্ববর্তী সরকার তা আমলে নেয়নি।

একজন শিল্পনেতা বলেন, ইউরোপ ও আমেরিকার ক্রেতারা পরিবেশগত মানদণ্ডকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়। এলডব্লিউজি সনদ না থাকায় আমাদের রপ্তানি বাজার উল্লেখযোগ্যভাবে সংকুচিত হয়েছে।

দীর্ঘদিন লোকসানের কারণে অনেক কারখানা ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। ব্যাংকঋণ পাওয়ার সীমাবদ্ধতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।

কাঁচা চামড়ার সংকট

চামড়া শিল্পের সংকটের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে কাঁচা চামড়ার বাজারেও। সূত্র জানায়, লক্ষ্মীপুরের চন্দ্রগঞ্জে বিক্রি না হওয়ায় একটি মাদ্রাসায় ১৫০টিরও বেশি কোরবানির পশুর চামড়া মাটিচাপা দেওয়া হয়েছে।

মৌসুমি ব্যবসায়ীরা জানান, অনেক ক্ষেত্রে গরুর চামড়া মাত্র ৫০ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি করতে হয়েছে, যা ব্যবসায়ী ও এতিমখানা-মাদ্রাসা সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ব্যাপক হতাশা সৃষ্টি করেছে।

ফেনীর দাগনভূঞার কাটাখালী নদীতে গত ২৯ মে বিক্রি করতে না পেরে দুই মৌসুমি ব্যবসায়ী বিপুল পরিমাণ কাঁচা চামড়া ফেলে দেন।

ব্যবসায়ী খুরশিদ আলম ও দিদারুল আলম জানান, লাভের আশায় তারা শত শত চামড়া সংগ্রহ করেছিলেন। কিন্তু পাইকারি ক্রেতাদের জন্য অপেক্ষা করেও কোনো ক্রেতা পাননি।

একই ধরনের ঘটনা সাতক্ষীরার শ্যামনগরেও ঘটেছে, যেখানে বিক্রি না হওয়া চামড়া মাটিচাপা দিতে বাধ্য হয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

এ বছর সরকার ঢাকায় প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়ার দাম ৬২-৬৭ টাকা ও ঢাকার বাইরে ৫৭-৬২ টাকা নির্ধারণ করেছিল। সে হিসাবে ১৬ থেকে ২০ বর্গফুটের একটি মাঝারি আকারের চামড়ার মূল্য হওয়ার কথা ছিল ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৩৪০ টাকার মধ্যে। কিন্তু দুর্বল চাহিদার কারণে বাস্তবে অনেক কম দামে চামড়া বিক্রি হয়েছে।

ফলে কোরবানির সময় দানকৃত চামড়ার ওপর নির্ভরশীল মাদ্রাসা ও এতিমখানাগুলোও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সুযোগ এখনও রয়েছে

স্টেকহোল্ডারদের মতে, শিল্পটির বর্তমান দুরবস্থার জন্য বাজারের অভাব নয়, বরং নীতিগত ব্যর্থতাই বেশি দায়ী। উন্নত বিশ্বের ভোক্তারা পরিবেশবান্ধব প্রাকৃতিক চামড়াজাত পণ্যের প্রতি ক্রমবর্ধমান আগ্রহ দেখাচ্ছেন। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে মানসম্পন্ন চামড়াজাত পণ্যের চাহিদা বাড়ছে।

বাজার গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বৈশ্বিক চামড়াজাত পণ্যের বাজারের আকার প্রায় ৫৩১.০৭ বিলিয়ন ডলার। ২০২৬ সালে তা ৫৬৬.২৩ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এবং ২০৩৪ সালে বাজারের আকার প্রায় ৯৮২.৪২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যথাযথ নীতিগত সহায়তা ও দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত সমস্যার সমাধান করা গেলে বাংলাদেশ এখনও এই সম্প্রসারিত বাজারের বড় অংশ দখল করতে সক্ষম।

সংস্কারের দাবি শিল্পনেতাদের

বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, লেদার গুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএলএলএফইএ) চেয়ারম্যান মো. টিপু সুলতান বলেন, ২০১৭ সালে হাজারীবাগ থেকে সাভারে শিল্প স্থানান্তরের সময় আমাদের রপ্তানি বাজারের আকার ছিল প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার। বর্তমানে তা এক বিলিয়ন ডলারেরও নিচে নেমে এসেছে।

তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন সিইটিপি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা ছাড়া শিল্প স্থানান্তর করায় পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণ করা সম্ভব হয়নি এবং এতে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা সরে গেছেন।

সংগঠনটির সিনিয়র ভাইস-চেয়ারম্যান মাহবুবুর রহমান পান্না বলেন, অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। যেগুলো চালু রয়েছে, সেগুলোও তারল্য সংকটে ভুগছে। ব্যাংকঋণ পাওয়ার সীমাবদ্ধতা পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করেছে।

তার মতে, এমন পরিস্থিতিতে কাঁচা চামড়ার বাজারে ক্রেতা সংকট সৃষ্টি হওয়াই স্বাভাবিক।

চামড়া খাত পুনরুজ্জীবনে আগ্রহী বর্তমান সরকার

টিপু সুলতান ও মাহবুবুর রহমান পান্না জানান, বর্তমান সরকার চামড়া শিল্প পুনরুদ্ধারে আগ্রহ দেখিয়েছে।

সম্প্রতি শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির স্বীকার করেন যে, হাজারীবাগ থেকে সাভারে ট্যানারি শিল্প স্থানান্তর প্রক্রিয়ায় গুরুতর অব্যবস্থাপনা ছিল।

সাভারের হারিন্দ্রায় বিসিক চামড়া শিল্পনগরী পরিদর্শন শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, পরিকল্পিত সক্ষমতায় সিইটিপি পরিচালিত হয়নি এবং স্থানান্তরের পর অনেক ট্যানারি মালিক ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খেয়েছেন।

তিনি জানান, সরকার বর্তমানে প্রতিদিন ২৫ হাজার ঘনমিটার বর্জ্য শোধনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে সিইটিপিকে সক্ষম করার কাজ করছে। পাশাপাশি ক্রোমিয়াম পুনরুদ্ধার প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন আধুনিকায়ন উদ্যোগও বিবেচনাধীন রয়েছে।

ক্ষতিগ্রস্ত ট্যানারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণের পথও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির জন্য সুপারিশ

ক্রাফটসম্যান ফুটওয়্যার অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাদাত হোসাইন সেলিম এর আগে খাতের উন্নয়নে বেশ কয়েকটি সুপারিশ তুলে ধরেন।

তার প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে— স্বতন্ত্র জাতীয় চামড়া বোর্ড গঠন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নিশ্চিত করা, কার্যকর সিইটিপি প্রতিষ্ঠা, পুরো মূল্যশৃঙ্খলকে অন্তর্ভুক্ত করে আধুনিক ‘লেদার সিটি’ গড়ে তোলা এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বল্পসুদে অর্থায়নের ব্যবস্থা করা।

এ ছাড়া তিনি এক অঙ্কের সুদহার, চক্রবৃদ্ধি সুদ বাতিল, আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ দীর্ঘমেয়াদি ঋণ পরিশোধ সুবিধা এবং ৪০ শতাংশের বেশি দেশীয় কাঁচামাল ব্যবহারকারী মূল্য সংযোজনকারী পণ্যের জন্য বিশেষ প্রণোদনার আহ্বান জানান।

তার মতে, প্রতিযোগী চামড়া রপ্তানিকারক দেশগুলোর মতো ভর্তুকি ও প্রণোদনা নীতি প্রণয়ন করা গেলে বাংলাদেশের চামড়া শিল্প আবারও আন্তর্জাতিক বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে।