Advertisement

চাঁদা-ঝুট ব্যবসার দ্বন্দ্বে খুন/কিলারদের নেপথ্যের ‘গডফাদার’ খুঁজছে পুলিশ

এশিয়া পোস্ট প্রতিবেদক
কিলারদের নেপথ্যের ‘গডফাদার’ খুঁজছে পুলিশ
নিহত যুবদলকর্মী ইউসুফ আলী। ছবি: সংগৃহীত

রাজধানীর কাফরুলে প্রকাশ্যে গুলি করে যুবদলকর্মী ইউসুফ আলীকে (৪৫) হত্যার ঘটনায় তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই সামনে আসছে চাঁদাবাজি, ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ ও স্থানীয় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনের বিরোধের নানা তথ্য।

একাধিক সূত্র বলছে, এটি কোনো তাৎক্ষণিক সংঘর্ষের ফল নয়; বরং পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের জোরালো ইঙ্গিত মিলছে। তদন্তের কেন্দ্রে এখন শুধু ট্রিগার টানা অস্ত্রধারীরা নয়, বরং কারা তাদের মাঠে নামিয়েছে, কারা অর্থায়ন করেছে এবং কারা হত্যার নীলনকশা তৈরি করেছে— সেই প্রশ্ন।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া ও মিরপুর-১৩ এলাকায় গার্মেন্টসের ঝুট ব্যবসা, ফুটপাত নিয়ন্ত্রণ, নির্মাণাধীন ভবনে চাঁদাবাজি এবং এলাকাভিত্তিক আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে কয়েক মাস ধরে একাধিক পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা চলছিল। এ নিয়ে প্রকাশ্যে বিরোধ, শক্তি প্রদর্শন এবং পাল্টাপাল্টি হুমকির ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তদন্তকারীদের ধারণা, দীর্ঘদিনের সেই বিরোধই শেষ পর্যন্ত রক্তক্ষয়ী হামলার দিকে গড়িয়েছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, হত্যাকাণ্ড বাস্তবায়নে একাধিক অস্ত্রধারী অংশ নিয়েছিল বলে প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে। হামলাকারীরা পরিকল্পনা অনুযায়ী ঘটনাস্থলে কমপক্ষে পাঁচজন এসে ইউসুফ আলীকে লক্ষ্য করে গুলি চালায় এবং অল্প সময়ের মধ্যেই এলাকা ত্যাগ করে।

হামলার সময় উপস্থিত জনতার হাতে আটক চঞ্চলের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের তথ্য, তাদের চলাফেরা, হামলার ধরন এবং পালিয়ে যাওয়ার কৌশল বিশ্লেষণ করে তদন্তকারীরা ধারণা করছেন, এ ঘটনায় পেশাদার ও ভাড়াটে অস্ত্রধারীরা জড়িত আছে।

ডিবির এক কর্মকর্তা এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘আমরা শুধু কারা গুলি করেছে তা নয়, কারা এই হত্যাকাণ্ডের নির্দেশ দিয়েছে এবং কারা হামলাকারীদের ব্যবহার করেছে, সেটিও খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি।’

তদন্তে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে বলে ওই কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন।

ডিএমপির মিরপুর বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. মোস্তাক সরকার এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘তদন্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখন একটাই— কার নির্দেশে সংঘটিত হলো কাফরুলের এই রক্তাক্ত হত্যাকাণ্ড? কাফরুল থানা পুলিশ ও ডিবির সমন্বয়ে গঠিত তদন্ত দল ইতোমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করেছে। কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি নজরদারিতে রয়েছেন।’

তিনি বলেন, ‘মামলার এক আসামি চঞ্চলকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করলে আদালত তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ থেকে হামলার নেপথ্যের পরিকল্পনাকারী ও অর্থদাতাদের সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাবে। এছাড়াও কে কিলারদের ভাড়া করছে তাকেও খুঁজে পাওয়া যাবে।’

ডিবি সূত্র জানায়, ঘটনার পর থেকেই সন্দেহভাজনদের মোবাইল ফোনের কল রেকর্ড, আর্থিক লেনদেন, অবস্থানগত তথ্য এবং আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। বিশেষ করে হত্যাকাণ্ডের আগে ও পরে কারা হামলাকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে, কারা তাদের আশ্রয় বা সহায়তা দিয়েছে এবং কোথা থেকে নির্দেশনা এসেছে— সেসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

তদন্তকারীদের ভাষ্য, কাফরুলের মতো এলাকায় স্থানীয় বিরোধে জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় সাধারণত সবার জানা থাকে। ফলে সরাসরি হামলায় অংশ নেওয়ার পরিবর্তে বাইরের অস্ত্রধারীদের ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে—এমন সম্ভাবনাও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে চান না কর্মকর্তারা।

কাফরুল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাইফুল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে জানান, ‘নিহতের বড় ভাই মাসুদ রানা বাদী হয়ে হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, অস্ত্রধারীরা এসে ইউসুফকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি চালায়।’

তিনি বলেন, ‘কারা হামলায় অংশ নিয়েছে, কারা পরিকল্পনা করেছে এবং কারা হামলাকারীদের সহায়তা করেছে—সব বিষয়ই তদন্তের আওতায় রয়েছে।’

প্রসঙ্গত, শুক্রবার (২৪ জুলাই) রাত সাড়ে ১১টার দিকে মিরপুর-১৩ এলাকার ওপেক্স গার্মেন্টসের সামনে দুর্বৃত্তদের এলোপাতাড়ি গুলিতে ইউসুফ আলী নিহত হন। এ ঘটনায় আরও দুইজন গুলিবিদ্ধ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। ঘটনার পর পালিয়ে যাওয়ার সময় অস্ত্রসহ এক সন্দেহভাজনকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেন স্থানীয়রা।