আড়িয়াল খাঁ নদে বসিরের জীবনসংগ্রাম

এশিয়া পোস্ট নিউজ, মাদারীপুর
আড়িয়াল খাঁ নদে বসিরের জীবনসংগ্রাম
বাসিরের নৌকার নদী পার হচ্ছেন শিশু শিক্ষার্থীরা। ছবি: এশিয়া পোস্ট

সাত বছর বয়সে বাবার হাত ধরে আড়িয়াল খাঁ নদে নৌকায় ওঠা, ২৪ বছর বয়সে এসে—সেই নদই তার একমাত্র ঠিকানা। বাবার চোখের জ্যোতি কমে যাওয়ার পর থেকে একাই টানছেন পাঁচ সদস্যের পরিবারের হাল। কিন্তু বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম থেকে শুরু করে নৌকার জ্বালানি ও যন্ত্রাংশের খরচ কয়েক গুণ বাড়লেও, এক যুগ ধরে ঘাটের খেয়া পারাপারের ভাড়া আটকে আছে মাত্র পাঁচ টাকায়। বলছি মাদারীপুর সদর উপজেলার ঝাউদি ইউনিয়নের হোগলপাতিয়া গ্রামের বাসিন্দা বসির হাওলাদারের কথা।

বর্তমানে হোগলপাতিয়া ও আলিনগর ইউনিয়নের মাঝখানে প্রবাহিত আড়িয়াল খাঁ নদ পারাপারের অন্যতম ভরসা বসিরের ইঞ্জিনচালিত নৌকা। দুই পাড়ের শত শত মানুষের দৈনন্দিন চলাচল-নির্ভর করে এই একটি নৌকার ওপর। শিক্ষার্থী, কৃষক, শ্রমিক কিংবা সাধারণ যাত্রী—সবাইকে গন্তব্যে পৌঁছে দেন তিনি।

কিন্তু মানুষের পথ সহজ করলেও নিজের পথ যেন দিনদিন কঠিন হয়ে উঠছে। বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় সবকিছুর দাম বেড়েছে কয়েক গুণ। বেড়েছে জ্বালানি, যন্ত্রাংশ ও নৌকা রক্ষণাবেক্ষণের খরচও। অথচ খেয়া পারাপারের ভাড়া প্রায় এক যুগ ধরে একই জায়গায় আটকে আছে।

বসির জানান, আগে এই ঘাটে পারাপারের ভাড়া ছিল দুই টাকা। পরে তা বাড়িয়ে পাঁচ টাকা করা হয়। এরপর প্রায় ১৩ বছর পেরিয়ে গেলেও ভাড়ার কোনো পরিবর্তন হয়নি। অথচ সংসারের ব্যয় কয়েক গুণ বেড়েছে। সারা দিন নৌকা চালিয়ে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা আয় হয়। এই টাকা দিয়ে পরিবার চালানো খুব কঠিন। তারপরও মানুষকে পারাপার করাই আমার পেশা, এটাই আমার জীবন।

২০১৮ সালে কিস্তিতে একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকা কিনেছিলেন তিনি। সেই নৌকাই এখন তার আয়ের একমাত্র অবলম্বন। তবে নদে ঢেউ উঠলে কিংবা বৈরী আবহাওয়ায় পারাপার করতে গিয়ে জীবনের ঝুঁকিও নিতে হয়।

স্থানীয়দের মতে, বসির শুধু একজন মাঝি নন, দুই পাড়ের মানুষের নির্ভরতার প্রতীক। কোনো ঝড়-বৃষ্টি কিংবা প্রতিকূল আবহাওয়া তাকে থামাতে পারে না।

হোগলপাতিয়া গ্রামের বাসিন্দা মনির হোসেন বলেন, দীর্ঘ ১২ বছর ধরে বসিরকে এই নদে মানুষ পারাপার করতে দেখছি। খুব কষ্ট করে সংসার চালায়। সবাই তার সেবা নেয়, কিন্তু তার কষ্টের কথা খুব কম মানুষই ভাবে।

স্থানীয় গ্রামবাসী শাহ আলমের ভাষ্য, বাবা অসুস্থ হওয়ার পর থেকেই বসির সংসারের দায়িত্ব নিয়েছে। ভালো ছেলে। কিন্তু দুই পাড়ে নৌকা ভেড়াতে খুব সমস্যা হয়। নদের ঘাটগুলো উন্নয়ন করা হলে তার কষ্ট অনেক কমে যেত।

অন্যদিকে যাত্রীদের অভিযোগ, নদের কোনো পাড়েই নেই যাত্রীদের জন্য ছাউনি। বৃষ্টি কিংবা রোদে নৌকার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয় খোলা আকাশের নিচে।

মাদারীপুর সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী ইমরান হোসেন বলেন, বসিরের জীবন সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি। মাঝে মাঝে আমরা তার নৌকায় ঘুরতে যাই। তার পরিশ্রম দেখলে মুগ্ধ হতে হয়।

নিজের সুবিধার চেয়ে যাত্রীদের কষ্ট নিয়েই বেশি ভাবেন বসির। তাই তার দাবি—নদের দুই পাড়ে যাত্রী ছাউনি নির্মাণ এবং নিরাপদভাবে নৌকা ভেড়ানোর জন্য স্থায়ী ঘাটের ব্যবস্থা করা হোক।

এ বিষয়ে ঝাউদি ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য লোকমান বেপারী বলেন, বসির দীর্ঘদিন ধরে মানুষের সেবা করে আসছে। তাকে সহযোগিতার বিষয়ে আমরা ইতিবাচক।

আলিনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাহিদ পারভেজ জানান, যাত্রী ছাউনির বিষয়টি আমাদের আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি। আবেদন পেলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করব।

এ বিষয়ে মাদারীপুর সদর উপজেলার ঝাউদি ইউনিয়নের ইউপি চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম আবুল হাওলাদার বলেন, বসিরের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলা হয়েছে।

মাদারীপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াদিয়া শাবাব জানান, এ বিষয়ে আমরা অবগত। বরাদ্দ পেলেই যাত্রী ছাউনি ও সোলার লাইটের ব্যবস্থা করে দেওয়া হবে।