Advertisement
শিশুর মুখে বেত ঢুকিয়ে টিকটক

‘পিচ্চি পোলাপানরে কান্না করাইতে ভালোই লাগে’

এশিয়া পোস্ট নিউজ, লক্ষ্মীপুর
‘পিচ্চি পোলাপানরে কান্না করাইতে ভালোই লাগে’
অভিযুক্ত ইমরান হোসেন। ছবি : সংগৃহীত

লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে এক শিশু শিক্ষার্থীর মুখে বেত ঢুকিয়ে শিক্ষকের টিকটক ভিডিও তৈরির ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। ভিডিওটি প্রকাশের সময় ওই শিক্ষক নিজের টিকটক আইডির ক্যাপশনে লিখেছিলেন, ‘পিচ্চি পোলাপানরে কান্না করাইতে ভালোই লাগে।’ তীব্র সমালোচনার মুখে পরে তিনি ভিডিওটি মুছে ফেসবুক লাইভে এসে দুঃখ প্রকাশ করে ক্ষমা চেয়েছেন।

শনিবার (১৮ জুলাই) রাতে অভিযুক্ত শিক্ষক ইমরান হোসেন ফেসবুক লাইভে এসে দুঃখ প্রকাশ করে ক্ষমা চাইলেও ক্ষোভ কমেনি স্থানীয়দের। সামাজিক সংগঠন ও মানবাধিকার কর্মীরা একে ‘ক্ষমা অযোগ্য অপরাধ’ আখ্যা দিয়ে তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

অভিযুক্ত ইমরান হোসেনের বাড়ি নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলায়। তিনি রায়পুরের উত্তর চর আবাবিল ইউনিয়নের দারুল উলুম কোরআন মাদ্রাসার সহকারী শিক্ষক ছিলেন।

মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অশোভন আচরণ, অকারণে শাস্তি দেওয়া, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং অভিভাবকদের অনুমতি ছাড়া শিশুদের ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশের অভিযোগে প্রায় আড়াই মাস আগেই তাকে প্রতিষ্ঠান থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে। বর্তমানে মাদ্রাসাটিও প্রায় এক মাস ধরে বন্ধ রয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ৩৪ সেকেন্ডের ওই ভিডিওতে দেখা যায়, শিশুটি হাত দিয়ে বেত সরানোর চেষ্টা করলেও ওই শিক্ষক হাসতে হাসতে জোরপূর্বক তা চালিয়ে যাচ্ছেন। ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর তিনি সেটি মুছে নিজের আইডি নিষ্ক্রিয় (ডিঅ্যাক্টিভেট) করে দেন।

পরে ফেসবুক লাইভে এসে ইমরান হোসেন বলেন, ‘ভিডিওটি আমি নিজেই পোস্ট করেছি। বাচ্চাটা কান্না করছিল, আমি তাকে শান্ত করার জন্য দুষ্টামির ছলে মুখে লাঠি ধরেছিলাম। বিষয়টি আমার ঠিক হয়নি। লাঠি ব্যবহার না করে চকলেট দিয়েও তাকে শান্ত করা যেত। ভবিষ্যতে এ ধরনের ভুল আর হবে না।’ তবে শিশু নির্যাতনকে ‘দুষ্টামি’ বলে চালানোয় নেটদুনিয়ায় নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।

এ বিষয়ে সামাজিক সংগঠন ‘আলফা স্টার’-এর চেয়ারম্যান কামরুল হাসান বলেন, ‘শিক্ষক যদি নিজেই শিশুকে ভয় দেখিয়ে ভিডিও ধারণ করে বিনোদন নেন, তাহলে তা শুধু অনৈতিক নয়, অপরাধও। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।’

মানবাধিকার কর্মী জাকির মাহমুদ জুয়েল বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন ভিডিও প্রকাশ করা শিশুর মর্যাদা ও অধিকার ক্ষুণ্ন করেছে। আমরা ভুক্তভোগী শিশুর পাশে আছি এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানাই।’

রায়পুর পৌরসভার বাসিন্দা মো. সাইফুল ইসলাম ও অভিভাবক শিউলি আক্তার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, একজন শিক্ষক যদি শিশুর কান্না নিয়ে আনন্দ পান, তবে তিনি শিক্ষক হওয়ার যোগ্য নন। ছোট ছোট শিশুরা কতটা অসহায়, তা এই ঘটনায় স্পষ্ট হয়েছে।

ব্যবসায়ী আবদুল কাদের ও কলেজ শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান বলেন, শুধু ক্ষমা চাইলেই দায় শেষ হয়ে যায় না। শিশুর কান্নাকে বিনোদন বানানো ভয়ংকর মানসিকতার পরিচয়। এর পেছনে কোনো মানসিক বিকৃতি আছে কি না, তা খতিয়ে দেখে তদন্ত করা প্রয়োজন।

মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মো. মঞ্জুর আহমেদ বলেন, ইমরান হোসেনের আচরণ নিয়ে আগে থেকেই অভিযোগ ছিল। শিশু শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অশোভন আচরণ এবং কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া তাদের ছবি-ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশের কারণে তাকে একাধিকবার সতর্ক করা হয়েছিল। কিন্তু তিনি সংশোধন না হওয়ায় তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়।

রায়পুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নিজাম উদ্দিন ভূঁইয়া জানান, ঘটনাটি পুলিশের নজরে আসার পর খোঁজখবর নেওয়া হয়েছে। অভিযুক্ত শিক্ষক বর্তমানে রায়পুরে নেই। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো লিখিত অভিযোগ থানায় করা হয়নি। অভিযোগ পেলে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শিশু নির্যাতনের মতো ঘটনায় কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না