ময়মনসিংহে হরিদাসের শাস্তির দাবিতে ফুঁসে উঠেছে শতাধিক পরিবার

নিজেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ‘প্রটোকল অফিসার’ পরিচয় দিয়ে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ, ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে জালিয়াতি ও প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগে হরিদাস চন্দ্র তরনী দাস ওরফে তৌহিদ ইসলামের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, আত্মসাৎকৃত অর্থ ফেরত এবং ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তার দাবিতে ময়মনসিংহে বিক্ষোভ, মানববন্ধন ও স্মারকলিপি প্রদান করা হয়েছে।
বুধবার (২২ জুলাই) দুপুরে নগরীর সি কে ঘোষ রোডে ময়মনসিংহ প্রেস ক্লাবের সামনে ফুলবাড়িয়া উপজেলার প্রতারণার শিকার শতাধিক পরিবারের সদস্য, স্থানীয় বাসিন্দা এবং ছাত্রজনতা একত্রিত হয়ে এ কর্মসূচি পালন করেন। পরে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে সরকারের কাছে একটি পাঁচ দফা স্মারকলিপি প্রদান করা হয়।
মানববন্ধনে উত্থাপিত প্রধান দাবিগুলো হলো—প্রতারক হরিদাসের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা, ভুক্তভোগীদের আত্মসাৎকৃত অর্থ ও ক্ষতিপূরণ দ্রুত ফেরত দেওয়া, প্রতারণা, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত ও দেশবিরোধী চক্রান্তে জড়িত সহযোগীদের আইনের আওতায় আনা, ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা জোরদার করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর বিষয়ে সরকারিভাবে তদন্ত করা।
স্মারকলিপিতে ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেন, হরিদাস ভুয়া পরিচয় ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে নিজের সম্পাদিত (এডিট করা) ছবি দেখিয়ে সরকারি চাকরি, স্বাস্থ্য দপ্তরে বদলি ও বড় বড় টেন্ডার পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে ফুলবাড়িয়ার শতাধিক পরিবারের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেন। জমি বিক্রি কিংবা চড়া সুদে ঋণ নিয়ে টাকা দিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন বহু মানুষ।
মানববন্ধনে ভুক্তভোগী আবুল কালাম বলেন, ছেলেকে চাকরি দেওয়ার কথা বলে প্রথমে ১৩ লাখ টাকা নেন হরিদাস। পরে আরও প্রতিশ্রুতি দিয়ে আমার মাধ্যমে বিভিন্ন জনের কাছ থেকে ২২ লাখ টাকা সংগ্রহ করেন। সব মিলিয়ে ৩৫ লাখ টাকা হারিয়ে পাওনাদারদের চাপে নিজের জমিও বিক্রি করতে হয়েছে।
অপর ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী মো. সফিকুল ইসলাম জানান, তার স্যানিটারি দোকান থেকে ১৪ লাখ ৫২ হাজার টাকার রড, সিমেন্ট ও মোটর পাম্প নিয়ে আর টাকা পরিশোধ করেননি হরিদাস।
স্মারকলিপিতে মানবাধিকার কর্মী ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সহ-সম্পাদক গোলাম মোরশেদ খান উল্লেখ করেন, প্রতারণার বিষয়ে তথ্য জানার পর তাকে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে বিষয়টি মীমাংসার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তিনি এতে রাজি না হওয়ায় চলতি বছরের ১৩ এপ্রিল হোয়াটসঅ্যাপে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। পরে ৭ জুন হামলার শিকার হন এবং ১৫ জুন পুনরায় হত্যার পরিকল্পনার তথ্য জানতে পেরে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। নিরাপত্তার কারণে ১৭-২৩ জুন পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনকোর্স পরীক্ষাতেও অংশ নিতে পারেননি বলে দাবি করেন তিনি।

জানা গেছে, হরিদাস ফুলবাড়িয়ার বালিয়ানে সরকারি খাস জমি ও খাল দখল করে প্রায় চার কোটি টাকা ব্যয়ে ‘প্যারিস সুইমিংপুল এন্টারটেইনমেন্ট পার্ক’ নামের একটি বিলাসবহুল রিসোর্ট গড়ে তোলেন, যেখানে দীর্ঘদিন নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ড চলেছে। পাওনাদারদের চাপে পরে রিসোর্টটি দেনার দায়ে বিক্রি করে পালিয়ে যান তিনি। পরে গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে ৮২ ফুট উঁচু রামমূর্তি নির্মাণকে কেন্দ্র করে বিতর্কিত আলোচনায় আসেন তিনি।
হরিদাস চন্দ্র গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার হোসেনপুর ইউনিয়নের কোমরপুরের মধ্যরামচন্দ্রপুর (নয়াপাড়া) গ্রামের মৃত গোপীনাথ চন্দ্র তরনী দাসের ছেলে। তার জন্ম ১৯৯১ সালে। তিন ভাই দীর্ঘদিন ধরে ভারতে বসবাস করেন। ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় তিনি ভারতে যান। সেখানে উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে ইলেকট্রনিক্স বিষয়ে প্রশিক্ষণ নেন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্র জানায়, এর আগে ২০১৮ ও ২০২২ সালে প্রতারণা ও ভুয়া পরিচয় দেওয়ার অভিযোগে র্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন হরিদাস। সম্প্রতি ঢাকার উত্তরার মানি লন্ডারিং মামলায় সিআইডি কর্তৃক গ্রেপ্তার হওয়ার পর বর্তমানে ময়মনসিংহের এনআই অ্যাক্টের এক বছরের দণ্ডপ্রাপ্ত মামলায় তাকে ‘শ্যোন অ্যারেস্ট’ দেখিয়ে আদালতে তোলা হলে বিচারক কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
ফুলবাড়িয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রাশেদুল হাসান জানান, ফুলবাড়িয়ায় প্রায় ২০ শতাংশ জমিতে হরিদাসের একটি রিসোর্ট রয়েছে। তবে জমিটি এখন তার নামে রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তার বিরুদ্ধে সম্প্রতি প্রতারণার একটি মামলা হয়েছে।
.png)






