বন্যায় স্থবির চট্টগ্রাম বন্দর, সহায়তার দাবিতে নৌপরিবহন মন্ত্রীকে চিঠি

এশিয়া পোস্ট নিউজ, চট্টগ্রাম
বন্যায় স্থবির চট্টগ্রাম বন্দর, সহায়তার দাবিতে নৌপরিবহন মন্ত্রীকে চিঠি
ছবি : সংগৃহীত

চার দশকের রেকর্ড বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও জোয়ারে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যায় স্থবির হয়ে পড়েছে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রামের কার্যক্রম। ব্যাহত হচ্ছে বন্দর-সংযুক্ত সড়ক ও রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা। এই সংকটময় পরিস্থিতিতে দেশের শিল্প ও রপ্তানি খাতকে রক্ষা করতে এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের জরুরি নীতিগত সহায়তা প্রদানের দাবি জানিয়ে নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলমকে যৌথ চিঠি দিয়েছেন দেশের শীর্ষ চার ব্যবসায়ী সংগঠন।

যৌথ এই চিঠিতে সই করেছেন বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মাহমুদ হাসান খান, বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম, বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল এবং দি চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক।

চিঠিতে ব্যবসায়ী নেতারা উল্লেখ করেন, সরকারের ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব নীতির কারণে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা গতিশীল হলেও চলমান বন্যা ও অতিবৃষ্টির কারণে চট্টগ্রাম বন্দর এবং এর সংলগ্ন যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্দরে পণ্য খালাস ও পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় আমদানিকৃত তুলা, সুতা, কাপড়, রাসায়নিক ও খাদ্যপণ্যের গুণগত মান নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। অন্যদিকে, তৈরি পোশাক, চামড়াজাত পণ্য ও ওষুধসহ বিভিন্ন রপ্তানি পণ্যের জাহাজীকরণ বিলম্বিত হওয়ায় রপ্তানি আদেশ বাতিল, জরিমানা এবং ব্যয়বহুল আকাশপথের জাহাজীকরণের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

গত ৫ জুলাই থেকে টানা ভারী বর্ষণে চট্টগ্রাম বন্দরের বিভিন্ন ইয়ার্ড ও বেসরকারি বেসরকারি কনটেইনার ডিপোতে পানি ঢুকে আমদানিকৃত কাঁচামাল ও রপ্তানি পণ্যের ব্যাপক ক্ষতি হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১০ জুলাই চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতির দায় ও জবাবদিহি সম্পূর্ণ অস্বীকার করে। ব্যবসায়ী নেতারা চিঠিতে অভিযোগ করেন, বন্দর কর্তৃপক্ষের এই একতরফা সিদ্ধান্ত ও বিজ্ঞপ্তির ভাষা আমদানিকারক-রপ্তানিকারকদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে। তারা অবকাঠামোগত দুর্বলতা বা অব্যবস্থাপনার দায় নির্ধারণে একটি নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

দীর্ঘদিন কনটেইনার আটকে থাকায় ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত বিলম্ব মাশুল, বন্দর ভাড়া, আটকে রাখার মাশুল ও জাহাজীকরণ চার্জ বহন করতে হচ্ছে। ফলে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, দেখা দিয়েছে নগদ অর্থের তীব্র সংকট। এর ফলে শ্রমিকদের মজুরি প্রদান, ব্যাংক ঋণের কিস্তি পরিশোধ এবং অন্যান্য ব্যবসায়িক দায়বদ্ধতা মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।

অতীতে দেশের দুর্যোগকালীন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক ও বন্দর কর্তৃপক্ষের দেওয়া নীতিগত সুবিধার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে চিঠিতে জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে। সেগুলো হলো—চট্টগ্রাম বন্দরসহ সড়ক ও রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা দ্রুত সচল করে পণ্য পরিবহন সচল করা; শুল্ক বিভাগ, বন্দর ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ নিরূপণে কমিটি গঠন; আটকে থাকা কনটেইনারের বিলম্ব মাশুল, বন্দর ভাড়া ও গুদামজাতকরণ মাশুল সম্পূর্ণ বা আংশিক মওকুফ করা এবং নতুন মাশুল স্থগিত রাখা; জরুরি কাঁচামাল, খাদ্য ও ওষুধ দ্রুত খালাসের জন্য শুল্ক ছাড়করণে বিশেষ সুবিধা দেওয়া; ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তাদের জন্য স্বল্প সুদে বিশেষ পুনঃঅর্থায়ন ঋণ সুবিধা, ঋণের কিস্তি পরিশোধে সময় বৃদ্ধি এবং ঋণ শ্রেণিকরণে বিশেষ সুবিধা প্রদান; দুর্যোগের কারণে ঋণপত্র, ব্যাক-টু-ব্যাক ঋণপত্র ও জাহাজীকরণের সময়সীমা যৌক্তিকভাবে বাড়ানো; বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির বিল এবং মূল্য সংযোজন কর ও কর জরিমানা ছাড়া পরিশোধের জন্য বাড়তি সময় দেওয়া; ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য বিশেষ প্রণোদনা তহবিল গঠন এবং ক্ষতিগ্রস্ত পণ্য ধ্বংস বা পুনঃআমদানির প্রক্রিয়া সহজ করা।

এছাড়া পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে বাণিজ্য, অর্থ ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বাংলাদেশ ব্যাংক, বন্দর কর্তৃপক্ষ, শুল্ক বিভাগ ও রেলওয়েসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সমন্বয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের ‘আন্তঃমন্ত্রণালয় টাস্কফোর্স’ গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে চিঠিতে।

ভবিষ্যতে এ ধরনের জাতীয় সংকট এড়াতে চট্টগ্রাম বন্দর ও সংলগ্ন শিল্প এলাকায় টেকসই পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা নির্মাণ, কনটেইনার ইয়ার্ডের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং দুর্যোগ-সহনশীল অবকাঠামো উন্নয়নের আহ্বান জানান ব্যবসায়ী নেতারা। একই সাথে দেশের আমদানি-রপ্তানি সচল রাখতে বিকল্প পথ ও ডিজিটাল নথিপত্র ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করে একটি সমন্বিত ‘জাতীয় বাণিজ্য ধারাবাহিকতা রূপরেখা’ প্রণয়নের জোর দাবিও জানানো হয়েছে ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে।