টানা বৃষ্টিতে দিঘলিয়ায় মৎস্য খাতে দুই কোটি টাকার ক্ষতি

টানা অতিবৃষ্টি ও বন্যার পানিতে খুলনা জেলার মৎস্য খাত বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। প্লাবিত হয়েছে ১৫২টি পুকুর-দিঘি ও ৬৫০টি মৎস্যঘের। পানির স্রোতে ভেসে গেছে প্রায় ৭০২ দশমিক ৭৮ টন মাছ, ২৭৯ লাখ পোনা এবং বিপুল পরিমাণ পোস্ট লার্ভা (পিএল)। সরকারি হিসাবে এ দুর্যোগে দিঘলিয়া ও রূপসা উপজেলায় আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১৭ লাখ ২৭ হাজার টাকা। এর মধ্যে শুধু দিঘলিয়া উপজেলায়ই ক্ষতির পরিমাণ ২ কোটি ১৬ লাখ ১০ হাজার টাকার।
ক্ষতিগ্রস্ত চাষিরা জানিয়েছেন, ঘেরের বাঁধ ভেঙে ও পানির মান নষ্ট হওয়ায় তাদের কয়েক লাখ টাকার লোকসান হয়েছে। অন্যদিকে মৎস্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগাম প্রস্তুতি ও বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা ছাড়া বর্ষা মৌসুমে এমন ক্ষতি এড়ানো কঠিন। জেলা মৎস্য অফিসের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
খুলনা জেলা মৎস্য অফিসের তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় জেলার মোট পাঁচটি ইউনিয়ন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে দিঘলিয়া উপজেলার চারটি এবং রূপসা উপজেলার একটি ইউনিয়ন রয়েছে। অন্যদিকে পাইকগাছা, কয়রা, দাকোপ, বটিয়াঘাটা, ডুমুরিয়া, ফুলতলা ও তেরখাদা উপজেলায় মৎস্য খাতে কোনো ক্ষয়ক্ষতির তথ্য পাওয়া যায়নি।
সরকারি হিসাবে দেখা যায়, জেলার মোট ১৫২টি পুকুর ও দিঘি এবং ৬৫০টি ঘের বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে। প্লাবিত পুকুর ও দিঘির মোট আয়তন ৩ দশমিক ৩১ হেক্টর এবং ঘেরের আয়তন ২৮২ হেক্টর।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হওয়া দিঘলিয়া উপজেলায় ১৪০টি পুকুর-দিঘি এবং ৬৫০টি ঘের পানিতে তলিয়ে গেছে। সেখানে প্লাবিত পুকুর-দিঘির আয়তন ২ দশমিক ২৫ হেক্টর এবং ঘেরের আয়তন ২৮২ হেক্টর।
জেলা মৎস্য অফিসের তথ্য অনুযায়ী, দিঘলিয়ায় বন্যার পানিতে ৭০২ মেট্রিক টন ফিনফিশ, ২৭৯ লাখ পোনা এবং বিপুল পরিমাণ পোস্ট লার্ভা (পিএল) ভেসে গেছে। এতে ফিনফিশ, পোনা ও পিএল মিলিয়ে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১৩ লাখ ২৩ হাজার টাকা। এ ছাড়া পুকুর, ঘের ও স্লুইস গেটের অবকাঠামোগত ক্ষতি হয়েছে আরও ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকার। সব মিলিয়ে শুধু দিঘলিয়া উপজেলাতেই ক্ষতির পরিমাণ ২ কোটি ১৬ লাখ ১০ হাজার টাকা।
অন্যদিকে রূপসা উপজেলায় ক্ষতির পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম। উপজেলার একটি ইউনিয়নের ১২টি পুকুর ও দিঘি প্লাবিত হয়েছে, যার মোট আয়তন ১ দশমিক ০৬ হেক্টর। বন্যার পানিতে শূন্য দশমিক ৭৮ মেট্রিক টন ফিনফিশ ভেসে যাওয়ায় প্রায় ১ লাখ ১৭ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে। তবে সেখানে কোনো চিংড়ির ঘের, পোনা কিংবা মৎস্য অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।
জেলাভিত্তিক হিসাবে বলা হয়েছে, বন্যায় মোট ৭০২ দশমিক ৭৮ টন ফিনফিশ, ২৭৯ লাখ পোনা এবং প্রায় ৮ লাখ ৪ হাজার টাকার পোস্ট লার্ভা (পিএল) ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে এ দুর্যোগে চিংড়ি উৎপাদনে কোনো ক্ষতির তথ্য পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া কোনো মৎস্যজীবী বা জেলের প্রাণহানি কিংবা আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেনি। একই সঙ্গে কোনো মাছ ধরার ট্রলার, জলযান বা জালের ক্ষয়ক্ষতির ঘটনাও রেকর্ড হয়নি।
রূপসা উপজেলার সামন্ত সেনা গ্রামের ঘের ব্যবসায়ী আলাউদ্দিন পাইক বলেন, এই টানা বৃষ্টিতে ঘেরের বাঁধ কয়েক জায়গায় ভেঙে গেছে। পানির স্রোতে অনেক মাছ বের হয়ে গেছে। এখন ঘেরে যে মাছ আছে, সেগুলোও ঠিকমতো থাকবে কি না বুঝতে পারছি না। আমার প্রায় পাঁচ লাখ টাকা বিনিয়োগ করা আছে। আনুমানিক তিন থেকে চার লাখ টাকার ক্ষতি হবে। খুব লোকসানের মধ্যে পড়ে গেছি। সরকার যদি কিছু আর্থিক সহায়তা দেয় এবং বাঁধ মেরামতের ব্যবস্থা করে, তাহলে আমাদের অনেক উপকার হবে।
দিঘলিয়া উপজেলার সেনহাটি গ্রামের ঘের ব্যবসায়ী হাসিবুর রহমান শেখ বলেন, অতিবৃষ্টির কারণে ঘেরে বাইরের পানি ঢুকে পানির মান নষ্ট হয়ে গেছে। মাছ ঠিকমতো খাবার খাচ্ছে না, অনেক মাছ মরে গেছে। দুই থেকে আড়াই লাখ টাকার মতো ক্ষতির আশঙ্কা করছি।
নৈহাটি গ্রামের ঘের ব্যবসায়ী হামিদ ভাসানী বলেন, টানা বৃষ্টিতে ঘেরের চারপাশের বাঁধ দুর্বল হয়ে গেছে। একপাশ দিয়ে মাছ বের হয়ে গেছে, আবার পানি ঘোলা হয়ে যাওয়ায় মাছেরও সমস্যা হচ্ছে। প্রায় পাঁচ লাখ টাকার মতো ক্ষতি হয়েছে। সরকারের কাছে দাবি, ক্ষতিগ্রস্ত ঘের মালিকদের তালিকা করে দ্রুত কম সুদে ঋণ ও আর্থিক সহায়তা দেওয়া হোক।
খুলনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. বদরুজ্জামান বলেন, টানা অতিবৃষ্টি ও বন্যার প্রভাবে জেলার বিভিন্ন এলাকায় মাছের ঘের ও পুকুরের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। প্রাথমিক সমন্বিত প্রতিবেদনে দিঘলিয়া ও রূপসা উপজেলায় উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতির তথ্য পাওয়া গেছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের তালিকা নিয়মিত হালনাগাদ করা হচ্ছে। ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংগ্রহের কাজ চলমান রয়েছে।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) খুলনা কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আজহার আলী বলেন, টানা অতিবৃষ্টিতে ঘের ও পুকুরের পানির লবণাক্ততা কমে যায়, পিএইচের ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা হ্রাস পায়। ফলে চিংড়িসহ বিভিন্ন মাছ রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। এ পরিস্থিতিতে চাষিদের নিয়মিত পানির গুণগত মান পর্যবেক্ষণ করতে হবে এবং প্রয়োজন হলে চিংড়িঘেরে পাথরের চুন ব্যবহার করতে হবে।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন রিসোর্স টেকনোলজি (এফএমআরটি) ডিসিপ্লিনের শিক্ষক ড. শেখ মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, টানা ভারী বৃষ্টিপাত ও বন্যার সময় সামান্য অবহেলাতেও মাছের খামারে বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে। তাই আগাম প্রস্তুতি এবং সঠিক ব্যবস্থাপনা গ্রহণই ক্ষতি কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়। সবার আগে পুকুরের পাড় উঁচু ও মজবুত করতে হবে, যাতে বন্যার পানি প্রবেশ করতে না পারে। পাশাপাশি, মাছ ভেসে যাওয়া রোধে পুকুরের চারপাশে অন্তত দুই থেকে তিন ফুট উঁচু ঘন ফাঁসের নাইলনের জাল বা বাঁশের বানা দিয়ে ঘিরে রাখা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, ভারী বৃষ্টির সময় মাছের খাদ্য গ্রহণ কমে যায়। তাই এ সময়ে খাবার ৫০ শতাংশের বেশি কমিয়ে দেওয়া বা প্রয়োজন হলে সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা উচিত, যাতে অতিরিক্ত খাবার পচে পানির গুণগত মান নষ্ট না হয়। এ ছাড়া অতিবৃষ্টির সময় নতুন পোনা অবমুক্ত করা কিংবা মাছ আহরণ থেকেও বিরত থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।






