নিখোঁজের ৭ দিন পর মিলল যুবকের বিচ্ছিন্ন মাথা

সাত দিন ধরে নিখোঁজ ছিলেন ২৬ বছর বয়সি গাছ কাটার শ্রমিক সোহেল মিয়া। পরিবার থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছে, আত্মীয়স্বজন সম্ভাব্য সব জায়গায় খোঁজ করেছেন। কিন্তু তার কোনো সন্ধান মেলেনি। শেষ পর্যন্ত একটি তীব্র দুর্গন্ধই উন্মোচন করল সেই নিখোঁজের নির্মম পরিণতি।
বুধবার (২২ জুলাই) বিকেলে ময়মনসিংহ সদর উপজেলার পরানগঞ্জ ইউনিয়নের অম্বিকাগঞ্জ কলেজসংলগ্ন এলাকায় দুর্গন্ধের উৎস খুঁজতে গিয়ে স্থানীয় লোকজন প্রথমে দেখতে পান মানুষের একটি বিচ্ছিন্ন মাথা।
পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পাশের নরম মাটি খুঁড়ে উদ্ধার করে মাথাবিহীন একটি মরদেহ। আঙুলের ছাপ ও পরনের কাপড় দেখে নিশ্চিত হওয়া গেছে, সেটি নিখোঁজ সোহেল মিয়ার মরদেহ। ঘটনাটি শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয়; এটি স্থানীয় মানুষের মনে আতঙ্ক, ক্ষোভ ও অসংখ্য প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
সোহেল মিয়া ময়মনসিংহ সদরের পরানগঞ্জ ইউনিয়নের মীরকান্দাপাড়া গ্রামের নূরুল ইসলাম ও জুলেখা বেগম দম্পতির ছেলে। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি তৃতীয়। জীবিকার তাগিদে তিনি গাছ কাটার শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন।
পুলিশ ও নিহতের পরিবার সূত্রে জানা যায়, গত ১৬ জুলাই রাত আটটার দিকে নিজ বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর সোহেল মিয়া নিখোঁজ হন। এর পর থেকে পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করলেও তার কোনো সন্ধান পাননি। এ ঘটনায় বুধবার সকালে নিহত যুবকের বাবা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেছিলেন। সোহেল মিয়ার বাড়ি থেকে আধা কিলোমিটার দূরের অম্বিকাগঞ্জ কলেজের একটি একাডেমিক ভবন নির্মাণের স্থান নির্বাচনের কাজ চলছিল। জায়গার মাপজোখ করছিলেন কলেজের কয়েকজন শিক্ষক ও কর্মচারী। এ সময় উৎকট দুর্গন্ধ ভেসে আসছিল। এর উৎস খুঁজতে গিয়ে পাওয়া যায় সোহেলের মাথা ও দেহের অবশিষ্ট অংশ।
অম্বিকাগঞ্জ কলেজের ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক মো. মাহবুবুল আলম বলেন, বিকেল পৌনে তিনটার দিকে সেখানে গিয়ে দেখি আমাদের সীমানাপ্রাচীর ভাঙা ও দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছিল। সেই দুর্গন্ধের কারণ খুঁজতে গিয়ে চারদিকে খোঁজ করতেই মানুষের মাথা দেখতে পাই। পরে তাৎক্ষণিক বিষয়টি থানা- পুলিশকে অবহিত করলে বিকেল সাড়ে চারটার দিকে পুলিশ আসে। এটি এলাকার নিখোঁজ যুবকের ছিল বলে পরিবার শনাক্ত করেছে। নিখোঁজের ঘটনায় থানায় জিডিও করা ছিল।
নিহত সোহেলের শ্বশুর আলাল উদ্দিনের ভাষ্য, ১৬ জুলাই রাত আটটার পর সোহেলের ভগ্নিপতি সেলিম মিয়া কাজের কথা বলে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যান। এর পর থেকেই তাকে পাওয়া যাচ্ছিল না। সোহেল ও সেলিম একসঙ্গে গাছ কাটার কাজ করলেও পারিশ্রমিক নিয়ে দুজনের মধ্যে বিরোধ ছিল। সোহেলকে ঠিকমতো টাকা না দিয়ে মারধরও করতেন সেলিম। এ জন্য ঢাকায় গিয়ে নির্মাণশ্রমিকের কাজ শুরু করেছিল সোহেল। বাড়িতে আসার খবর পেয়ে সোহেলকে কাজ দেওয়ার কথা বলে তাকে ডেকে নেন সেলিম। মঙ্গলবার এলাকা থেকে তিনি পালিয়ে যান।
আলাল উদ্দিন বলেন, এলাকায় দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় লোকজন খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। পরে একটি বিচ্ছিন্ন মাথা দেখতে পেয়ে তারা পরিবারের সদস্যদের খবর দেন। এরপর মরদেহের বাকি অংশও উদ্ধার হয়। শরীরে কাপড় দেখে নিশ্চিত হওয়া গেছে মরদেহটি সোহেলের।
ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম) আশরাফুল করিম বলেন, মাথাটি পাওয়া যায় ঘাসের ওপর। পাশেই নরম মাটিতে ছিল শিয়াল, কুকুর বা অন্য কোনো প্রাণীর আঁচড়ের দাগ। ধারণা করা হচ্ছে, গর্ত থেকে কোনো প্রাণী মাথাটি টেনে তুলে ফেলেছে। এর ফলে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছিল। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রথমে বিচ্ছিন্ন মাথাটি উদ্ধার করে। পরে মরদেহের বাকি অংশের সন্ধানে পাশেই মাটি খোঁড়াখুঁড়ি শুরু হয়। একপর্যায়ে মাটির ভেতর থেকে দুটি গ্লাভস পাওয়া যায়। বুধবার (২২ জুলাই) রাত পৌনে নয়টার দিকে কয়েক ফুট গভীরে পাওয়া যায় মাথাবিহীন দেহ।
তিনি বলেন, ওই মাথা ও দেহ নিখোঁজ যুবক সোহেলের। পিবিআইয়ের মাধ্যমে আঙুলের ছাপ মিলিয়ে এ পরিচয় নিশ্চিত করা হয়েছে। এ ছাড়া শরীরের কাপড় দেখে মরদেহটি সোহেলের বলে নিশ্চিত করেছেন তার পরিবারের সদস্যরা। বিচ্ছিন্ন মাথা ও অবশিষ্ট দেহ ময়নাতদন্তের জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের মর্গে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় আইনানুগ ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন।
.png)





