Advertisement

রংপুর চিড়িয়াখানার অব্যবস্থাপনায় দর্শনার্থীদের ক্ষোভ

খন্দকার রাকিবুল ইসলাম, রংপুর
রংপুর চিড়িয়াখানার অব্যবস্থাপনায় দর্শনার্থীদের ক্ষোভ
রংপুর চিড়িয়াখানার প্রধান ফটক। ছবি: এশিয়া পোস্ট

রংপুর চিড়িয়াখানার পুরোনো অবকাঠামো ও অব্যবস্থাপনা নিয়ে দর্শনার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। বিনোদন উদ্যানটির গ্যারেজে সরকার নির্ধারিত যানবাহনের ফির চেয়ে দুই-তিন গুণ বেশি ফি আদায় করার অভিযোগও রয়েছে। তা ছাড়া চিড়িয়াখানায় প্রাণীদের পর্যাপ্ত খাদ্য সরবরাহ না করা ও চিকিৎসা অনিয়মে প্রাণী মৃত্যুর অভিযোগ রয়েছে দীর্ঘদিন থেকে।

সরেজমিনে বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) দুপুরে রংপুর চিড়িয়াখানায় গিয়ে দেখা যায়, অজগর, বানরসহ অধিকাংশ প্রাণী রাখার খাঁচাগুলো জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। দর্শনার্থীদের বসার সিটগুলো অপরিষ্কার হওয়ায় দাঁড়িয়ে হাঁটাহাঁটি করে ফেরত যাচ্ছে অধিকাংশ দর্শনার্থীরা।

রংপুর চিড়িয়াখানার কিউরেটর কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে চিড়িয়াখানায় চারটি বাঘ, একটি সিংহ, ৫২টি চিত্রা হরিণ, গাধা ৮টি, জলহস্তী তিনটিসহ ৩০ প্রজাতির ২৪৮ টি প্রাণী ও পাখি রয়েছে।

চিড়িয়াখানায় ঘুরতে আসা রংপুর সরকারি বেগম রোকেয়া কলেজের শিক্ষার্থী সোমা দেব বলেন, বান্ধবীসহ এসেছি একটু ঘুরতে। এখানে বসার কোনো পরিবেশ নেই। মানুষ বিনোদন উদ্যানে আসে অবসর সময় কাটাতে। কিন্তু এখানে সে রকম কোনো পরিবেশ নেই।

গ্যারেজে মোটরসাইকেল রাখা দর্শনার্থী মুন্না বলেন, চিড়িয়াখানার ভেতরে সাইনবোর্ডে দেখলাম মোটরসাইকেলের গ্যারেজ ভাড়া দশ টাকা। এখানে গ্যারেজে নিল ২০ টাকা। জিজ্ঞেস করার পর বলল এটা ওদের বস ঠিক করে দিয়েছে।

এ বিষয়ে কথা বলতে গ্যারেজটির ঠিকাদার জাকারিয়া ইসলামের ফোনে একাধিকবার কল দিলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। কল রিসিভ না করায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

গ্যারেজে থাকা ঠিকাদারের নিযুক্ত একাধিক ব্যক্তি জানান, মোটরসাইকেল ২০ টাকা, সাইকেল ১০ টাকা, অটো/ভ্যান ৩০ টাকা নেওয়া নির্ধারিত। এ ছাড়া মাইক্রোবাস ৫০ টাকা ও প্রাইভেটকার ৩০ টাকা করে নেওয়া হয়।

সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি কেন নেওয়া হচ্ছে–এ বিষয়ে তারা জানান, ঠিকাদার ভাড়া ঠিক করে দিয়েছেন। সে অনুযায়ী টাকা নেওয়া হচ্ছে।

এ বিষয়ে রংপুর চিড়িয়াখানার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও রংপুর জেলা ভেটেরিনারি অফিসার ডা. মো. ওমর ফারুক এশিয়া পোস্টকে জানান, চার্টে নির্ধারিত ফি এর চেয়ে গ্যারেজে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার সুযোগ নেই। গ্যারেজে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার বিষয়টি জানা ছিল না। খোঁজ খবর নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

চিড়িয়াখানার ভেতরে থাকা একটি বাঘ। ছবি: এশিয়া পোস্ট
চিড়িয়াখানার ভেতরে থাকা একটি বাঘ। ছবি: এশিয়া পোস্ট

অনিয়মে পশু-পাখি মৃত্যুর অভিযোগ

রংপুর চিড়িয়াখানায় খাদ্য সরবরাহ ও চিকিৎসার অনিয়মের কারণে গত কয়েক বছরে বাঘসহ মূল্যবান পশুপাখির মৃত্যুর অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ উঠেছে–ঠিকাদার ও স্থানীয় প্রভাবশালী চক্রের দুর্নীতির কারণে প্রাণীদের জন্য বরাদ্দকৃত তাজা ও পর্যাপ্ত খাবার খাঁচায় পৌঁছায় না ও প্রাণীদের চিকিৎসাসেবা যথাযথভাবে না দেওয়ার কারণে পশু-পাখির মৃত্যু হয়েছে।

চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই মৃত্যুর প্রধান কারণ হিসেবে বার্ধক্যজনিত ও নানাবিধ রোগব্যাধিকে সামনে এনেছে। সর্বশেষ গত ২০২২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ১৮ বছর ৭ মাস বয়সে বার্ধক্যজনিত কারণে চিড়িয়াখানার রয়েল বেঙ্গল টাইগার মারা যায়, যার ফলে দীর্ঘদিন বাঘের খাঁচা শূন্য অবস্থায় ছিলে। সে সময় অভিযোগ উঠেছিলে পর্যাপ্ত খাদ্য সরবরাহ না করায় ও চিকিৎসা সেবার গাফিলতির কারণে মৃত্যু হয়েছিলে বাঘিনী শাওনের।

রংপুর চিড়িয়াখানার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও রংপুর জেলা ভেটেরিনারি অফিসার ডা. মো. ওমর ফারুক বলেন, তিনটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রাণীদের খাবার সরবরাহ করা হয়। এখানে খাবার সরবরাহের গাফিলতির সুযোগ নেই। বিগত সময়ে প্রাণীর মৃত্যু খাবার সংকট বা চিকিৎসা অবহেলায় নয় বার্ধক্যজনিত কারণে হয়েছিল।

চিড়িয়াখানা আধুনিকায়নের প্রস্তাব

দেশে দুটি সরকারি চিড়িয়াখানার মধ্যে রংপুরে একটি। প্রয়াত রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনামলে নগরীর হনুমানতলা এলাকায় ১৯৮৯ সালে রংপুর চিড়িয়াখানাটি গড়ে ওঠে। এটি দর্শনার্থীদের জন্য ১৯৯২ সালে খুলে দেওয়া হয়। প্রায় ২২ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত চিড়িয়াখানাটিতে ৩০ প্রজাতির ২৪৮টি প্রাণি রয়েছে। এর মধ্যে সিংহ, বাঘ, জলহস্তী, হরিণ, অজগর সাপ, ইমুপাখি, উটপাখি, ময়ূর, বানর, হনুমান, কেশওয়ারি, গাধা, ঘোড়া উল্লেখযোগ্য।

রংপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রুহুল আমিন বলেন, রংপুর চিড়িয়াখানা আধুনিকায়ন বিষয়ে একটা প্রস্তাব ছিল রংপুর জেলা থেকে, সেই প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে পরিকল্পনা কমিশনের অতিরিক্ত সচিব পরিদর্শনে এসেছিলেন। এখানে জিরাফের সেডে জিরাফ নেই, নীল গাই নেই এবং জেব্রা রয়েছে কিন্তু তার সঙ্গী নেই। যে সমস্ত সেডে প্রাণি নেই, তা আনা হবে। সাফারি পার্ক বা অন্যান্য চিড়িয়াখানায় যে প্রাণিগুলো অতিরিক্ত রয়েছে সেখান থেকে আমরা আনার ব্যবস্থা করতে পারি।

তিনি আরও বলেন, আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে কিছু রাস্তা তৈরি করা হবে। কোনো প্রাণি অসুস্থ হলে তার জন্য কোয়ারেন্টাইন সেন্টার থাকবে। রিক্রিয়েশনের আরও কিছু সেড তৈরি হবে। চিড়িয়াখানায় একটি দৃষ্টিনন্দন মসজিদসহ দর্শনার্থীবান্ধব আরও কিছু অবকাঠামো তৈরি করা হবে। সরকারের ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার সাথে সামঞ্জস্য রেখে প্রকল্প বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হবে।

রুহুল আমিন বলেন, এই চিড়িয়াখানা আধুনিকায়নে যে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, তা আগামী ৪ বছরের মধ্যে বাস্তবায়ন হবে বলে আশা করছি। এখানে আধুনিক সেড থাকবে এবং মানুষ খাঁচার ভেতরে থাকবে আর পশুপাখি বাহিরে থাকবে- এ ধরনের একটা পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে এ চিড়িয়াখানাটি বিনোদনের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে পরিণত হবে।

বিষয় :খুলনা