টেংরাটিলা গ্যাসফিল্ড বিস্ফোরণ/২০ বছরেও ক্ষতিপূরণ পাননি এলাকাবাসী

সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার টেংরাটিলা গ্যাসফিল্ড বিস্ফোরণের ২০ বছর পূর্ণ হয়েছে আজ ২৪ জুন। কানাডীয় কোম্পানি নাইকো কর্তৃক কূপ খননের সময় ২০০৫ সালের আজকের এই দিনে গভীর রাতে দ্বিতীয় দফায় টেংরাটিলা গ্যাসফিল্ডে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটেছিল।
আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ে নাইকোকে ক্ষতিপূরণের নির্দেশ দেওয়া হলেও ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাবাসী আজও কোনো ক্ষতিপূরণ পাননি। এমনকি এখনও স্বাভাবিক হয়নি এলাকার পরিবেশ।
জানা গেছে, টেংরাটিলা গ্যাসফিল্ডে প্রথম দুর্ঘটনাটি ঘটেছিল ২০০৫ সালের ৭ জানুয়ারি রাতে। আগুনের উত্তাপে ওই রাতেই গ্যাসফিল্ডের প্রডাকশন কূপের রিগ ভেঙে আগুন ২০০ থেকে ৩০০ ফুট উঁচুতে ওঠানামা করছিল। এক মাসেরও বেশি সময় জ্বলার পর সেই আগুন আপনাআপনি নিভে যায়। এরপর দ্বিতীয় দফায় বিস্ফোরণ ঘটে একই বছরের ২৪ জুন রাত আনুমানিক ২টায়। বিস্ফোরণের পর ওই দিন মধ্যরাতে নাইকোর পক্ষ থেকে প্রথমে বিপদসংকেত দেওয়া হয়। পরে রাত ৩টায় স্থানীয় লোকজনকে এলাকা ছেড়ে অন্তত তিন কিলোমিটার দূরে চলে যাওয়ার পরামর্শ দেয় নাইকো কর্তৃপক্ষ। রাত সাড়ে ৩টায় দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠা আগুন প্রায় ১০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে আতঙ্ক ছড়ায়। এমনকি সুনামগঞ্জ শহর থেকেও সেই আগুনের শিখা দেখা গিয়েছিল।
গ্যাসফিল্ড বিস্ফোরণের দুই দশক পার হলেও সেই ক্ষত আজও বয়ে বেড়াচ্ছেন দোয়ারাবাজার উপজেলার সুরমা ইউনিয়নের টেংরাটিলাসহ আশপাশের চারটি গ্রামের মানুষ। তবে দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ে ক্ষতিপূরণ প্রাপ্তি এবং নতুন করে গ্যাস উত্তোলনের উদ্যোগের খবরে স্থানীয়দের মাঝে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে।
টেংরাটিলা গ্যাসফিল্ডে দ্বিতীয় দফা বিস্ফোরণের সময় কূপ এলাকার তিন কিলোমিটার দূর পর্যন্ত ভূকম্পন অনুভূত হয়েছিল। দুই দফার অগ্নিকাণ্ডে গ্যাসফিল্ডের ৩ বিসিএফ (বিলিয়ন ঘনফুট) গ্যাস পুড়ে যায় এবং ৫ দশমিক ৮৯ থেকে কমপক্ষে ৫২ বিসিএফ গ্যাসের রিজার্ভ ধ্বংস হয়। একই সঙ্গে আশপাশের টেংরাটিলা, আজবপুর, গিরিশনগর, কৈয়াজুরি, টেংরাবাজার এবং শান্তিপুর গ্রামের মানুষের ঘরবাড়ি, গাছপালা ও হাওরের ফসলি জমি ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
স্থানীয়রা জানান, টেংরাটিলা বিস্ফোরণের ২০ বছর পূর্ণ হলেও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি এলাকার পরিবেশ। এলাকার মাটি ও পানি আজও সেই ভয়াবহ বিস্ফোরণের চিহ্ন বহন করছে। আশপাশের কয়েকটি গ্রামে নানা রোগবালাই লেগেই আছে। মাটির গভীরে শেকড় যায়—এমন কোনো গাছ এখানে বাঁচে না। গ্রামবাসীকে পানীয় জল সংগ্রহ করতে হয় আধা কিলোমিটার দূর থেকে।
দুর্ঘটনার পর নাইকোর পক্ষ থেকে টেংরাটিলা, আজবপুর, গিরিশনগর, কৈয়াজুরি ও শান্তিপুর গ্রামের ৬১৬টি পরিবারকে কয়েক মাস ৬ হাজার টাকা করে 'হয়রানি ভাতা' দেওয়া হয়েছিল। এরপর থেকে তারা আর কোনো সহায়তা বা ক্ষতিপূরণ পায়নি। নানা দুর্ভোগ নিয়েই জীবন কাটছে স্থানীয়দের। কয়েক বছর আগেও স্থানীয় লোকজন নিজস্ব প্রযুক্তিতে ঝুঁকি নিয়ে ভূপৃষ্ঠে চুইয়ে পড়া গ্যাস দিয়ে রান্নার কাজ চালালেও এখন আর আগের মতো গ্যাস উঠছে না। বর্তমানে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে গ্যাসফিল্ডটি।
২০২০ সালের ৩ মে তৎকালীন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, কানাডার কোম্পানি নাইকোর অদক্ষতার কারণে ২০০৫ সালে দুবার টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রে বিস্ফোরণ ঘটে। এর দায়ে ক্ষতিপূরণ হিসেবে বাংলাদেশ প্রায় আট হাজার কোটি টাকা পেতে পারে। লন্ডনের বিনিয়োগ বিরোধ নিষ্পত্তিসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সালিসি আদালত (ইকসিড) এমন রায় দিয়েছেন বলে তিনি উল্লেখ করেছিলেন।
এরপর নাইকোর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা প্রক্রিয়া চলমান থাকে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারিতে টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্র বিস্ফোরণের দায়ে নাইকো রিসোর্সের বিরুদ্ধে ৪২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্থাৎ প্রায় ৫১৬ কোটি টাকা জরিমানার চূড়ান্ত রায় দিয়েছে ইকসিড ট্রাইব্যুনাল। এই অর্থ বাংলাদেশকে দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে খনিটির ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনও সুনির্দিষ্ট রূপরেখা জানা যায়নি।
এই গ্যাসক্ষেত্রটি ছাতক পূর্ব ও ছাতক পশ্চিম (টেংরাটিলা) নামে দুটি অংশে বিভক্ত। অগ্নিকাণ্ডে ছাতক পশ্চিম অংশের একটি স্তরের গ্যাস পুড়ে গেলেও অন্যান্য স্তর এবং ছাতক পূর্ব অংশের গ্যাস মজুত অক্ষত রয়েছে। এই গ্যাসক্ষেত্রে সম্ভাব্য মজুত ২ থেকে ৫ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ) বলে ধারণা করা হয়। এদিকে, পরিত্যক্ত এই গ্যাসফিল্ডের দুটি কূপ খননের পরিকল্পনাসহ বিপুল পরিমাণ গ্যাস আহরণের সম্ভাবনা নিয়ে সিলেট গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেড নতুন করে কাজ শুরু করেছে বলে জানা গেছে।
টেংরাটিলা গ্রামের বাসিন্দা বজলুল মামুন বলেন, দুই দফা অগ্নিকাণ্ডে টেংরাটিলা ও আশপাশের এলাকার পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। আগে এলাকায় কোনো গাছ হতো না, এখন কিছু গাছ হচ্ছে। তবে এখনও দুর্ঘটনাস্থলের পাশের লোকজন পানি ব্যবহার করতে পারেন না। চারটি গ্রামের ৬১৬টি পরিবারকে কয়েক মাস ৬ হাজার টাকা করে দেওয়া হলেও পরে আর কোনো ক্ষতিপূরণ মেলেনি।
তিনি আরও বলেন, দিন পনেরো আগে বাপেক্সের একটি টিম এলাকা পরিদর্শন করে গেছে। পরিত্যক্ত গ্যাসক্ষেত্রটি এখন ঝোপঝাড়ে পরিণত হওয়ায় নানা বন্যপ্রাণীর অভয়াশ্রমে পরিণত হয়েছে। আমরা আশা করি, সরকার দ্রুত খনিটি চালুর উদ্যোগ নেবে।
সুরমা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান হারুন অর রশীদ বলেন, বাপেক্সের এমডিসহ উচ্চপর্যায়ের একটি দল কিছুদিন আগে টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্র এলাকা পরিদর্শন করে গেছে। তবে এটি কবে নাগাদ চালু হবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কিছু জানায়নি। এলাকাবাসীর দাবি, পরিত্যক্ত গ্যাসক্ষেত্রটি দ্রুত সচল করে উৎপাদনে নেওয়া হোক।
সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. ফারুক হোসেন বলেন, সুনামগঞ্জের টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রে দুটি নতুন কূপ খননের প্রাথমিক কাজ শুরু হয়েছে। কূপ খনন সফল হলে পুরো এলাকায় থ্রিডি সিসমিক সার্ভে করা হবে। সার্ভের ফলাফল ইতিবাচক হলে পরবর্তীতে আরও কূপ খনন করা হবে।







