Advertisement

১৬ বছর ধরে ঝরা শিশুদের জ্ঞানের আলো ছড়ান কবীর আকন্দ

আবু সালেহ মো. রায়হান, পঞ্চগড়
১৬ বছর ধরে ঝরা শিশুদের জ্ঞানের আলো ছড়ান কবীর আকন্দ
শিশুস্বর্গ ফাউন্ডেশনের শিশুদের সঙ্গে কবীর আকন্দ। ছবি: এশিয়া পোস্ট

বাংলাদেশের মানচিত্রের একেবারে উত্তরের শেষবিন্দু তেঁতুলিয়া। যেখানে প্রতিদিনের সূর্যোদয় কেবল প্রকৃতির নিয়ম নয়, বরং এক নতুন আশার আলো নিয়ে আসে। সেই নব সূর্যের মতোই গত দেড় যুগ ধরে সীমান্তের অবহেলিত, দুস্থ ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জীবনে শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছেন এক সাদা মনের মানুষ— কবীর আকন্দ। শিশুদের কাছে তিনি পরম মমতায় ঘেরা ‘কবীর আঙ্কেল’, আর বড়োদের চোখে এক নিঃস্বার্থ সমাজসেবী।

নেত্রকোনা থেকে তেঁতুলিয়া, এক দীর্ঘ যাত্রা

কবীর আকন্দের জন্ম নেত্রকোনার বারহাট্টা উপজেলার এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে। স্কুলজীবনেই বাবাকে হারিয়ে জীবনযুদ্ধের কঠোর বাস্তবতার মুখোমুখি হন তিনি। তবে দমে যাননি। দেশের শীর্ষ বিদ্যাপীঠ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ২০০৮ সালে কর্মজীবনের তাগিদে পাড়ি জমান হিমালয়কন্যা তেঁতুলিয়ায়। যোগ দেন ‘কাজী অ্যান্ড কাজী টি এস্টেট’ -এর দর্জিপাড়া ডিভিশনের প্রধান হিসেবে। বর্তমানে তিনি কাজ করছেন ‘এভারেস্ট এগ্রি অ্যান্ড ফ্রুটিকালচার লিমিটেডে।

১০ শতাংশ বেতন ও একটি মহৎ স্বপ্ন

চাকরির শুরু থেকেই কবীর আকন্দের মন পড়ে থাকত সীমান্তের ওইসব শিশুদের কাছে, যারা অর্থাভাবে শৈশব হারাত চায়ের বাগানে বা পাথর ভাঙার শ্রমে। নিজের বেতনের ১০ শতাংশ টাকা দিয়ে তিনি শুরু করেছিলেন এক অসম লড়াই। লক্ষ্য ছিল— ঝরে পড়া শিশুদের আবার স্কুলমুখী করা। খাতা, কলম, বই আর ঈদের নতুন পোশাকের মধ্য দিয়ে তিনি শিশুদের হৃদয়ে জায়গা করে নেন। এই ব্যক্তিগত উদ্যোগই ২০১০ সালে রূপ নেয় ‘শিশুস্বর্গ’ নামে এক স্বপ্নময় প্রতিষ্ঠানে। এখন প্রতি বছর পঞ্চগড় জেলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দশ হাজার শিক্ষার্থী নিয়ে আয়োজন করা হয় শীত আনন্দ উৎসব। যেখানে বাচ্চারা উপহার পায় হুডি, স্কুল ব্যাগ, খাতা, কলম, দুপুরের খাবার এবং দিন শেষে সাংস্কৃতিক প্রোগ্রাম। ঈদের আনন্দে কিংবা পুজোর উৎসবে শত শত বাচ্চাদের দেওয়া হয় নতুন জামা এবং নতুন টাকার নোট।

জাহাঙ্গীরনগর থেকে তেঁতুলিয়া, সৌহার্দ্যের সেতুবন্ধন

কবীর আকন্দের এই মানবিক লড়াইয়ের খবর যখন তার বিদ্যাপীঠ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের কানে পৌঁছায়, তখন তারা আর বসে থাকতে পারেননি। একে একে হাত বাড়িয়ে দেন তার প্রাক্তন সহপাঠী ও বড়ো ভাইয়েরা। ব্যক্তি কবীর আকন্দের উদ্যোগ সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পরিণত হয় ‘শিশুস্বর্গ ফাউন্ডেশন’। আজ এই ফাউন্ডেশনের শিক্ষাবৃত্তিতে পড়াশোনা করছে শতাধিক মেধাবী শিক্ষার্থী, তাদের মধ্যে শুধু জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েই হতদরিদ্র পরিবারের দৃষ্টি প্রতিবন্ধী পঁচিশ জন অধ্যয়নরত।

ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন পড়াশোনা শেষ করে সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছে। তারা দারিদ্রতার শিকল ভেঙে আজ প্রতিষ্ঠিত হয়ে তাদের পরিবা কে আর্থিক সাপোর্ট দিতে পারছে। তাদের কেউ কেউ বিভিন্ন ব্যাংকে কেউ প্রাথমিক বিদ্যালয় কেউ বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে চাকরি করছে। কবীর আকন্দের সফলতা এখানেই।

অন্ধকারের যাত্রী যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায়

শিশুস্বর্গ ফাউন্ডেশনের সবচেয়ে বড়ো সাফল্য ফুটে ওঠে বুশরা, ইতি ও মারিয়ার হাত ধরে। এই তিন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী আজ সমাজের বোঝা নয়, বরং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। কবীর আকন্দের নিরলস সহযোগিতায় আজ তারা উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখছে। কবীর আকন্দ জানান, ‘আমরা চেয়েছিলাম সীমান্তের এই অবহেলিত শিশুদের জন্য এমন একটি মঞ্চ তৈরি করতে, যেখানে মেধা থাকলে দারিদ্র্য কোনো বাধা হবে না।’

শিক্ষা থেকে স্বনির্ভরতা, এক বহুমুখী মিশন

কবীর আকন্দের উদ্যোগ কেবল পাঠ্যবইয়ে সীমাবদ্ধ নেই। গড়ে তোলা হয়েছে ‘রওশন আরা মেমোরিয়াল শিশুস্বর্গ বিদ্যালয়’। এর পাশাপাশি চালু করা হয়েছে শিক্ষার্থীদের আইটি প্রশিক্ষণ, পাঠাগার এবং নারীদের স্বনির্ভর করে তুলতে নানা কারিগরি প্রশিক্ষণ। করোনা মহামারির দুঃসময়ে যখন পুরো দেশ থমকে ছিল, তখন এই শিশুস্বর্গ ফাউন্ডেশনই সীমান্তবাসীর ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছে খাবার ও অক্সিজেন।

শিশুদের প্রিয় আঙ্কেল

তেঁতুলিয়ার সীমান্তে গেলে এক অদ্ভুত দৃশ্য চোখে পড়ে। কোনো মেঠোপথ দিয়ে কবীর আকন্দ হেঁটে গেলে শিশুরা বাতাসের বেগে ছুটে আসে তার কাছে। ‘কবীর আঙ্কেল এসেছে, আমাদের কবীর আঙ্কেল!’ —এই চিৎকার যেন অথই সাগরের শুভ্র ফেনায় আঁকা এক পবিত্র ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। শিশুদের কাছে তিনি কেবল একজন অভিভাবক নন, তিনি একজন পথপ্রদর্শক, একজন বন্ধু এবং একজন স্বপ্নদ্রষ্টা পিতা।

কবীর আকন্দ প্রমাণ করেছেন, সমাজ বদলাতে বিশাল ক্ষমতার প্রয়োজন হয় না, একটি সুন্দর মন আর সদিচ্ছাই যথেষ্ট। গত ১৫ বছর ধরে তিনি যে প্রদীপ জ্বেলেছেন, তার আলো এখন তেঁতুলিয়া ছাড়িয়ে দেশের মানচিত্রে ছড়িয়ে পড়ছে। সীমান্তের এই ‘আলোর মানুষ’ বেঁচে থাকুক যুগ যুগ ধরে, তার হাত ধরে আরও হাজারো শিশু খুঁজে পাক তাদের স্বপ্নের স্বর্গ— এমনটাই প্রত্যাশা পঞ্চগড়বাসির। তিনি রাস্তা দিয়ে গেলে শিশুরা কবীর আঙ্কেল বলে চিৎকার শুরু করেন। বিদ্যালয়ে উপস্থিত হতেই শিশুরা তাকে ঘিরে ধরে। তিনিও বিস্কুট সহ তাদের খাবার বিতরণ করেন। এজন্য শিশুদের কাছে তিনি যেন হ্যামিলিয়নের বাঁশিওয়ালা।

ফুলতলা প্রি ক্যাডেট স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ ও প্রতিষ্ঠাতা তোজাম্মেল হক এশিয়া পোস্টকে বলেন, কবির আকন্দ যেন শিশুদের কাছে হ্যামিলনের এক বাঁশিওয়ালা। তিনি যেখানেই যান শিশুরা তাকে ঘিরে ধরে। কবির আংকেল বলে চিৎকার করতে শুরু করে। তিনিও শিশুদের খুব ভালোবাসেন। শিশুদের জন্য কাজ করেন। শুধু যে শিশুরাই তাকে ভালোবাসে তা নয়, বয়স্ক মুরুব্বি থেকে শুরু করে সব ধরনের মানুষের কাছেই তিনি প্রিয় পাত্র হয়ে উঠেছেন।

বোদা উপজেলার বেংহারি বনগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাহেব আলী এশিয়া পোস্টকে বলেন, কবির আকন্দ এমন একজন মানুষ যিনি শিশুদেরকে অসম্ভব ভালোবাসেন। তাদের পড়াশোনা তাদের শিক্ষা সামগ্রী দেওয়া, উপবৃত্তি দেওয়া সবকিছুই তিনি নিজ দায়িত্বে করেন। কোনো শিশুর জন্য সুবিধা বঞ্চিত না হয় বা পড়াশোনায় তার কোনো ব্যাঘাত না ঘটে সে বিষয়গুলো তিনি নিজ হাতেই দেখেন। আসলে সমাজে কবির সাহেবদের মতো মানুষ আছেন বলেই সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের মুখে শিশুদের মুখে হাসি ফুটছে। আমরা এই মানুষটির কল্যাণ কামনা করি। তিনি যেন শিশুদের জন্য আরো ভালো কিছু করতে পারেন। নিবেদিত প্রাণ হিসেবে কাজ করতে পারেন সে কামনা করি।

কবীর আকন্দ এশিয়া পোস্টকে বলেন, আমি যখন তেঁতুলিয়াতে কাজী গ্রুপের চা বাগানে ম্যানেজার হিসেবে আসি, তখন এখানকার চা শ্রমিকদের সন্তানদের অবহেলার বিষয়টি দেখতে পাই। পরে তাদের নিয়ে কিছু কাজ করার চিন্তা করি। একসময় তাদের জন্য শিশুস্বর্গ ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে সহায়তা শুরু করি। এর প্রতিষ্ঠাতা আমি। আমার জাবিয়ান অগ্রজ ও অনুজদের নিয়ে চলে আমাদের এই ফাউন্ডেশন। আমরা একটি স্কুল করেছি, যেখানে চা শ্রমিকের সন্তানসহ অনেকে পড়াশোনা করে। তাদের বই খাতা, শিক্ষাবৃত্তি, স্কুল ড্রেসের ব্যবস্থাও আমি করি। ঈদে পোশাক, নতুন টাকা দিই। শীতে শীতবস্ত্র বিতরণ ও শিক্ষা উপকরণ দিই।

তিনি আরো বলেন, শিশুদের নিয়ে আমি কাজ করতে ভালোবাসি। তারা আমাকে কবীর আঙ্কেল বলে ডাকে। আমি তাদের এলাকায় গেলেই তারা আমাকে ঘিরে ধরে। এজন্য আগে থেকে তাদের জন্য আমি বিস্কুটসহ খাবার নিয়ে যাই। বর্তমানে আমি বোদা উপজেলার তেপুকুরিয়া বারুনী এলাকায় এভারেস্ট ফার্মাসিউটিক্যালসের একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছি। আমি সব সময় শিশুদের নিয়ে কাজ করতে চাই।

বিষয় :পঞ্চগড়