
রাজধানীর মোহাম্মদপুরে অবস্থিত আল হেরা কলেজের শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে চরম বিশৃঙ্খলা এবং ভয়াবহ আর্থিক অনিয়মের তথ্য বেরিয়ে এসেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) এক তদন্ত প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটিতে পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী না থাকা, বোর্ড পরীক্ষায় বিপর্যয়, সরকারি ভ্যাট ফাঁকি এবং অবকাঠামোগত চরম সংকটের নাজুক চিত্র ফুটে উঠেছে। এ কারণে কলেজটির এমপিও সুবিধা স্থগিত বা বাতিলের সুপারিশ করা হয়েছে।
শিক্ষার্থী-সংকটে অস্তিত্বহীন শিক্ষা কার্যক্রম
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিটি করপোরেশন এলাকায় অবস্থিত এই কলেজে শিক্ষার্থীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কম। নথিপত্র অনুযায়ী, মোট শিক্ষার্থী মাত্র ৯৫ জন হলেও পরিদর্শনকালে উপস্থিত পাওয়া গেছে মাত্র ২৭ জনকে।
বিস্তারিত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, একাদশ শ্রেণিতে মোট ৫১ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে অডিট চলাকালীন উপস্থিত ছিল মাত্র ১৩ জন। এর মধ্যে বিজ্ঞান বিভাগে মাত্র ৬ জন, মানবিকে ২৪ জন এবং ব্যবসায় শিক্ষায় ১৪ জন শিক্ষার্থী ভর্তি আছে। দ্বাদশ শ্রেণিতে ৪৪ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে উপস্থিত ছিল মাত্র ১৪ জন। এর মধ্যে বিজ্ঞান বিভাগে ৫, মানবিকে ৩৩ ও ব্যবসায় শিক্ষায় ১৩ জন।
সরকারি নীতিমালা-২০২১ (সংশোধিত ২০২৩) অনুযায়ী, সিটি করপোরেশন এলাকায় বিজ্ঞান বিভাগে ন্যূনতম ৩০ জন এবং অন্য বিভাগে ২০ জন করে শিক্ষার্থী থাকার বাধ্যবাধকতা আছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি তা পূরণে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।
পরীক্ষায় বিপর্যয়
বিগত তিন বছর (২০২২-২০২৪) ধরে এইচএসসি পরীক্ষায় কাম্য সংখ্যক পরীক্ষার্থী এই প্রতিষ্ঠান থেকে অংশগ্রহণ না করার তথ্য প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। পরীক্ষায় ফলাফলের চিত্র আরও ভয়াবহ। বিগত তিন বছরে বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ মিলিয়ে পুরো কলেজ থেকে মাত্র একজন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। অভ্যন্তরীণ পরীক্ষাগুলোর মান এবং ফলাফলও অত্যন্ত অসন্তোষজনক বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আর্থিক অনিয়ম ও ভ্যাট ফাঁকি
কলেজটির আর্থিক ব্যবস্থাপনায় নজিরবিহীন স্বেচ্ছাচারিতা পরিলক্ষিত হয়েছে। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের সব ধরনের ফি ব্যাংকের মাধ্যমে নেওয়ার কথা থাকলেও তা সরাসরি নগদে গ্রহণ করা হচ্ছে। এ ছাড়া ২০২২ থেকে ২০২৫ অর্থবছর পর্যন্ত বিভিন্ন খাতের ব্যয়ের বিপরীতে প্রযোজ্য ৩৮ হাজার ৭০৬ টাকা ভ্যাট সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে আত্মসাৎ করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১১ হাজার ৮৭ টাকা, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১৮ হাজার ২৬৩ টাকা এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৯ হাজার ৩৫৫ টাকা বকেয়া রয়েছে।
তদন্তে আরও দেখা গেছে, ক্যাশ বইতে কোনো প্রত্যয়ন নেই। ব্যয়ের ক্ষেত্রে ভাউচার নম্বর লেখা হয় না এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কোনো স্বাক্ষর ছাড়াই অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। এমনকি কোনো ক্রয় উপ-কমিটি ছাড়াই মালামাল কেনা এবং এক খাতের টাকা অন্য খাতে ব্যবহারের মতো গুরুতর আর্থিক অনিয়মও ধরা পড়েছে।
লাইব্রেরি ও ল্যাবের নাজুক অবস্থা
উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের একটি কলেজে অন্তত পাঁচ হাজার বই সমৃদ্ধ লাইব্রেরি থাকার কথা থাকলেও আল হেরা কলেজে আছে মাত্র ৫২০টি বই। এ ছাড়া বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য ল্যাবরেটরি থাকলেও সেখানে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও রাসায়নিক দ্রব্যের তীব্র সংকট রয়েছে, যা শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক শিক্ষার পথে বড় বাধা।
অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও নিরাপত্তাঝুঁকি
নিরীক্ষকদের মতে, কলেজটির অবকাঠামো শিক্ষার অনুকূল নয়। মাত্র ১৫টি কক্ষ বিশিষ্ট ২ টি টিনের ঘরে কলেজটির কার্যক্রম চলছে, যা গ্রীষ্মকালে অসহনীয় গরমের সৃষ্টি করে। ৯৫ জন শিক্ষার্থী ও ২১ জন শিক্ষক-কর্মচারীর বিপরীতে শৌচাগার রয়েছে মাত্র ৩টি, যার পরিবেশ অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর। ছাত্রীদের জন্য আলাদা ওয়াশ ব্লক বা স্যানিটারি ন্যাপকিন ডিসপোজালের কোনো ব্যবস্থা নেই। এমনকি শিক্ষার্থীদের জন্য বিশুদ্ধ পানীয় জলের কোনো সংস্থানও সেখানে নেই। এ ছাড়া কলেজের কোনো সীমানাপ্রাচীর না থাকায় ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা চরম ঝুঁকির মুখে রয়েছে।
প্রশাসনিক অদক্ষতা
প্রতিষ্ঠানটিতে শিক্ষক-কর্মচারীদের আর্থিক নিরাপত্তার জন্য কোনো ভবিষ্যৎ তহবিল (Provident Fund) নেই। দাপ্তরিক গুরুত্বপূর্ণ খাতা যেমন স্টক রেজিস্টার, ডিমান্ড রেজিস্টার এবং চেক রেজিস্টার যথাযথভাবে রাখা হয় না। এমনকি কলেজের সম্পদের হিসাব রাখার জন্য কোনো 'স্টক টেকিং' কমিটিও গঠন করা হয়নি।
সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় তদন্তকারী দল মন্তব্য করেছে যে প্রতিষ্ঠানটি জনবল কাঠামোর আবশ্যকীয় শর্ত পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে এর এমপিও সুবিধা স্থগিত বা বাতিল করা একান্ত প্রয়োজন। একই সঙ্গে দ্রুত অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য ১০ দফা সুপারিশও প্রদান করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তারা জানান, মোহাম্মদপুরের আল হেরা কলেজের ওপর পরিচালিত পরিদর্শন ও নিরীক্ষা প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটির চরম একাডেমিক ও আর্থিক অব্যবস্থাপনার চিত্র ফুটে উঠেছে। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানের সরকারি ভ্যাট বকেয়া রাখা, বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মসহ সার্বিক অব্যবস্থাপনা, দাপ্তরিক গাফিলতি এবং অবকাঠামোগত সংকটের কারণে জনবলকাঠামোর শর্ত অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটির এমপিও সুবিধা স্থগিত বা বাতিল করার সুপারিশ করা হয়েছে।
যা বলছে কর্তৃপক্ষ
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে আল হেরা কলেজের অধ্যক্ষ আবু সালেহ এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘আমরা এখনো এ ব্যাপারে সরকারি কোনো চিঠি পাইনি। এর আগে আমাদের এখানে তদন্ত করার জন্য মন্ত্রণালয় থেকে লোকজন এসেছিল। আমরা আমাদের সবকিছু ভালোভাবে বুঝিয়ে দিয়েছি। আমাদের নিজস্ব জমিতে প্রতিষ্ঠান। অন্য সবকিছুও ঠিকঠাক আছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘মন্ত্রণালয় থেকে যেহেতু এখনো চিঠি পাইনি, তাই এখনই কিছু বলা যাচ্ছে না। যখন পাব, তার প্রেক্ষিতে পরবর্তী যা করার আমরা সেটা করব।’




