রাবিতে তাজুল ইসলাম/‘রাত নামলেই শুরু হতো নির্যাতন, দিনের পর দিন চলত টর্চার’

এশিয়া পোস্ট নিউজ, রাবি
‘রাত নামলেই শুরু হতো নির্যাতন, দিনের পর দিন চলত টর্চার’
তাজুল ইসলাম। ছবি: এশিয়া পোস্ট

‘প্রথমে বৈদ্যুতিক মেশিন দিয়ে ইলেকট্রিক শক দেওয়া, অথবা ১০ কেজি ওজনের হাতুড়ি দিয়ে মাথায় আঘাত করে অজ্ঞান করে ফেলা হতো। এতে অনেকের মাথার খুলি ফেটে তারা মারাও যেত। এ ছাড়া অ্যানেস্থেসিয়া দিয়ে অজ্ঞান করে কিংবা সরাসরি মেরে ফেলা হতো। আর যারা মারা যেত, তাদের লাশ নদী-খাল-বিলে ফেলে দেওয়া হতো।’

মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) বিকেল ৪টায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান: সাম্প্রতিক ভাবনা’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম।

গুম ও নির্যাতনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, আমরা যখন গুম-খুন নিয়ে তদন্ত করতে গিয়েছি, সাক্ষী ও আসামিদের সঙ্গে কথা বলেছি এর বিভৎসতা যে নিজে সহ্য করেনি, সে কখনো বুঝতে পারবে না। হঠাৎ করে বাসা, অফিস কিংবা রাজপথ থেকে মানুষ গায়েব হয়ে যেত। কালো বা সাদা পোশাকধারীরা কিংবা যে কেউ কথা বলার মাঝেই হঠাৎ মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যেত। কিছু বুঝে ওঠার আগেই মানুষটি নাই হয়ে যেত।

তাজুল ইসলাম আরও বলেন, যাদের গুম করা হতো, তাদের ঢাকা শহরের নানা জায়গায় ঘুরিয়ে গোপন বন্দিশালায় নিয়ে যাওয়া হতো। সেখানকার যে বিবরণ আমরা দেখেছি বা শুনেছি, তা দিয়ে রোমাঞ্চকর হরর মুভি বানানো সম্ভব। রাত নামলেই সেখানে শুরু হতো নির্যাতন। আঙুলে সুচ ফোটানো, যৌনাঙ্গে বৈদ্যুতিক শক দেওয়া, হাত-পায়ের আঙুল বা কব্জি কাটা, চোখ উপড়ে নেওয়া কিংবা জীবিত মানুষের মুখের মাংস তুলে নেওয়ার মতো পৈশাচিক ঘটনা ঘটানো হতো। এসবের ছবি তুলে দেয়ালে টাঙিয়ে রাখা হতো এবং অন্যদের দেখিয়ে হুমকি দিয়ে বলা হতো ‘তুই স্বীকার কর যে তুই জঙ্গি, না হলে তোরও এই অবস্থা করা হবে।’ এ ছাড়া সেখানে লোহার মই থাকত, যেখানে মানুষের হাত-পা বেঁধে যন্ত্রের সাহায্যে ঘোরানো হতো।

ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার বন্দিদের পরিণতি সম্পর্কে তিনি বলেন, নির্যাতনের পর যারা দোষ স্বীকার করত, তাদের বিভিন্ন মিথ্যা মামলা দিয়ে জেলে পাঠানো হতো। আর যাদের ভুলক্রমে তুলে আনা হতো কিংবা যারা স্বীকার করত না, তাদের চোখ-মুখ বেঁধে মাঠে ফেলে রেখে যাওয়া হতো এটা হলো তুলনামূলক ভাগ্য ভালো থাকাদের গল্প। তবে যাদের ভাগ্য ততটা ভালো ছিল না, তাদের চোখ-মুখ বেঁধে নৌকায় করে নদীর মাঝখানে নিয়ে যাওয়া হতো। এরপর মাথায় গুলি করে, পেট কেটে ও ভারী সিমেন্টের বস্তা বেঁধে নদীতে ডুবিয়ে দেওয়া হতো।

বিশ্ববিদ্যালয় লেখক ফোরামের উদ্যোগে সেমিনারটি অনুষ্ঠিত হয়। সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন রাজশাহী আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট মো. আবুল কাসেম, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. শাহ হোসাইন আহমদ মেহেদী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় লেখক ফোরামের সভাপতি অধ্যাপক মুহাম্মাদ শরীফুল ইসলামসহ বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক ও লেখক।