‘প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক’ যোগ্যতায় এমেরিটাস অধ্যাপক

এশিয়া পোস্ট প্রতিবেদক
‘প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক’ যোগ্যতায় এমেরিটাস অধ্যাপক
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহর ‘এমেরিটাস অধ্যাপক’ পদে নিয়োগ বাতিলের সিদ্ধান্ত যখন সামাজিকমাধ্যমে আলোচনার তুঙ্গে, তখন এ পদে বসা নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছে বিএমইউ কর্তৃপক্ষ।

Advertisement

শনিবার (২৭ জুন) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ২০২২ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জারিকৃত এক অফিস আদেশে ৬৬তম একাডেমিক কাউন্সিলের সুপারিশ এবং ৮৫তম সিন্ডিকেট সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহকে তিন বছরের জন্য ‘এমেরিটাস অধ্যাপক’ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। সে সময় অধ্যাপক হিসেবে নিয়ম অনুযায়ী, মাসিক ৩০ হাজার টাকা টাকা বেতন পেতেন। একই সঙ্গে চিকিৎসা সুবিধা এবং সীমিত প্রশাসনিক সুবিধাও পেতেন অধ্যাপক আব্দুল্লাহ।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, তবে নিয়োগের মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রায় ছয় মাস আগে ২০২৪ সালের ২০ জুন সিন্ডিকেটের ৯২তম সভায় ‘প্রফেসর এমেরিটাস’ অধ্যাদেশ সংশোধনের মাধ্যমে এ পদে আজীবন নিয়োগের বিধানসহ আর্থিক ও প্রশাসনিক কাঠামোতে মৌলিক পরিবর্তন আনা হয়, যা বেআইনি।

যদিও বিএমইউয়ের বক্তব্যকে উড়িয়ে দিচ্ছেন অধ্যাপক এ বি এম আব্দুল্লাহ। তিনি বলছেন, অনৈতিক কিছু হলে সেই দায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের, তার নয়। আর বেআইনি হয়ে থাকলে বের করতে এত দিন কেন লাগল?

বিএমইউ কর্তৃপক্ষ বলছে, সিন্ডিকেটের ওই সভা ছিল মূলত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটের বিষয়ে। প্রফেসর এমেরিটাস নিয়োগ বিধিতে পরিবর্তন আনা হবে সভার পূর্বে সদস্যদের এমন কোনো নোটিশ যেমন দেওয়া হয়নি, তেমনি সভায় সবার মতামত এমনকি সভার বিষয়বস্তুতেও ছিল না। ওই পরিবর্তনের মাধ্যমে অধ্যাপক আব্দুল্লাহর মাসিক সম্মানি নির্ধারণ করা যায়, যা তার অবসর ভাতার সমান। এ ছাড়াও আজীবন চিকিৎসা সুবিধা, স্টাফসহ অফিস ও অন্যান্য সুবিধা পাবেন বলেও নতুন বিধিতে বলা হয়। সিন্ডিকেটের বাজেট অধিবেশনে মূল এজেন্ডার বাইরে এ ধরনের প্রস্তাব উত্থাপন নজিরবিহীন ও বেআইনি বলে জানিয়েছে বিএমইউ কর্তৃপক্ষ।

প্রতিষ্ঠানটি বলছে, এই নিয়োগ তড়িঘড়ি বিবেচনার মাধ্যমে একজনকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল, যা প্রতীয়মান হয়েছে। এই পদে অধ্যাপক আব্দুল্লাহ এ পর্যন্ত সাড়ে ১৪ লাখ টাকার বেশি অর্থ গ্রহণ করেছেন।

বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বিএমইউয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. নাহরীন আখতার। জানতে চাইলে এশিয়া পোস্টকে তিনি বলেন, ‘শুরুতে ওনাকে (অধ্যাপক এ বি এম আব্দুল্লাহ) তিন বছরের জন্য এমেরিটস অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। মেয়াদ শেষ হওয়ার ছয় মাস আগে বাজেট সিন্ডিকেটে আলোচ্য বিষয় না থেকেও একটি অধ্যাদেশ পরিবর্তন করে আজীবন ‘প্রফেসর অব এমিরেটস’ করা হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংবিধানের নিয়ম অনুযায়ী এ পদ অনারারি ছিল। যেখানে কোনো সুবিধা গ্রহণ করা হতো না। কিন্তু সংবিধান পরিবর্তন করে আজীবন সুবিধা দেওয়া হয় এবং তখন থেকে গ্রেড-১ অধ্যাপকের বেতন পাবেন বলে বিধিতে উল্লেখ করা হয়।’

এশিয়া পোস্টের হাতে আসা অধ্যাপক এ বি আব্দুল্লাহ নিয়োগপত্র ও বেতন ভাতার কাগজপত্র খতিয়ে দেখা যায়, ২০২৪ সালের ২০ জুন জারি করা প্রজ্ঞানে বলা হয়, অবসর গ্রহণের আগে অধ্যাপক হিসেবে যেসব সুযোগ-সুবিধা পেতেন, ইমেরিটাসের বেলায়ও সেসব সুবিধা অব্যাহত থাকবে। পূর্ণকালীন অধ্যাপকের সর্বোচ্চ বেতনের সমান অর্থ পাবেন তিনি।

গত বছরের ১৫ জুন আরেক অফিস আদেশে বলা হয়েছে, একজন পূর্ণকালীন অধ্যাপকের সর্বোচ্চ বেতন ৭৮ হাজার টাকা। সংশ্লিষ্ট অধ্যাপকের পেনশন সুবিধা ৪৭ হাজার ২৯৭ টাকা এবং অধ্যাপক ইমেরিটার্স (আজীবন) হিসেবে সম্মানি ৩০ হাজার ৭০২ টাকা। সে অনুযায়ী আজীবন ইমেরিটাস অধ্যাপক হওয়ার আগে গত বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত প্রতিমাসে ৩০ হাজার টাকা বেতন পেলেও এরপর থেকে মূল বেতনের সঙ্গে সম্মানি হিসেবে আরও ২৩ থেকে সর্বোচ্চ ২৮ হাজার টাকা পেয়ে এসেছেন তিনি। ফলে চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত এ বি এম আব্দুল্লাহ নিয়োগের পর থেকে ১৪ লাখ ৬৩ হাজার ৮৫৫ টাকা বেতন তুলেছেন।

বিএমইউ কর্তৃপক্ষ বলছে, নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রফেসর এমেরিটাস অধ্যাদেশের ধারা ৫ অনুযায়ী বিভাগীয় চেয়ারম্যানের প্রস্তাব, ডিনের মাধ্যমে উপাচার্যের নিকট উপস্থাপন, উপাচার্য কর্তৃক মূল্যায়ন কমিটি গঠন এবং সেই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে নিয়োগ প্রদানের বিধান রয়েছে। কিন্তু অধ্যাপক ডা. এ. বি. এম. আব্দুল্লাহর ক্ষেত্রে এই নির্বাচন প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ না করে কেবলমাত্র একজন সদস্যের প্রস্তাব অনুযায়ী তাকে আজীবনের জন্য ‘প্রফেসর এমেরিটাস’ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। যেখানে কেবল যোগ্যতা হিসেবে ‘প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

সংশ্লিষ্টরা আরও বলছেন, এই নিয়োগের পর গত প্রায় দুই বছর তিনি নিয়মিত কর্মস্থলে আসেননি, শিক্ষাদান করেননি, কোনো গবেষণার সঙ্গে সম্পৃক্ত আছেন কিনা প্রশাসনকেও অবহিত করেননি; কিন্তু ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে নিয়মিত বেতন-ভাতা উত্তোলন করেছেন। অথচ দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রফেসর এমেরিটাস পদে নিয়োগের নজির রয়েছে।

তবে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, কোনো প্রফেসর এমেরিটাসকে আজীবনের জন্য পূর্ণকালীন অধ্যাপকের সর্বোচ্চ বেতনের সমপরিমাণ পারিশ্রমিক এবং এ ধরনের বিস্তৃত আর্থিক ও প্রশাসনিক সুবিধা প্রদানের নজির পাওয়া যায় না। বর্তমান প্রশাসন দায়িত্ব গ্রহণের পর বিষয়টি পর্যালোচনাকালে দেখতে পায় যে, এই ব্যবস্থার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ও পুনরাবৃত্ত আর্থিক দায় সৃষ্টি হয়েছে।

জানতে চাইলে উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, ‘এ বি এম আব্দুল্লাহ তিন বছরের জন্য নিয়োগ পেয়েছিলেন। ২০২৪ সালের শেষের দিকে নিয়োগের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু এর কিছুদিন আগে সিন্ডিকেটে বিধি পরিবর্তন করে ওই সিন্ডিকেটেই এটা ইমপ্লিমেন্ট (বাস্তবায়ন) করা হয়েছে, যেটা নিয়মবহির্ভূত। শুধু তাই নয়, আজীবনের জন্য নিয়োগ দিয়ে বিনা বেতনের সম্মানজনক পদবিকে পূর্ণকালীন বেতন দেওয়া হয়েছে। যা অন্যকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পাবেন না।’

তিনি বলেন, ‘অনারারি পোস্ট, কিন্তু সেখানে আপনি দেখবেন পরিষ্কার করে মেনশন করা আছে উনি অধ্যাপকের পূর্ণ বেতন পাবেন। গ্রেড-১ এর বেতনের সঙ্গে ওনার পেনশনটাকে সমন্বয় করে যেটা পেতেন, সেটা উনি নিয়ে আসছেন। কিন্তু উনি মিডিয়ায় যে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন ১০ হাজার টাকা পেতেন, এটি সত্য নয়।’

উপ-উপাচার্য আরও বলেন, ‘মনে করেন আমি একটা আইন পরিবর্তন করব, আইনটা যেই সিন্ডিকেটে চেঞ্জ (পরিবর্তন) করব, ওই সিন্ডিকেটেই ইমপ্লিমেন্ট করার কোনো সুযোগ নেই। যদি করতে হয় তাহলে পরবর্তী সিন্ডিকেটে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে হয়েছে সম্পূর্ণ উল্টো। এমনকি যে সভায় করা হয়েছে, সেই সভার বিষয়বস্তুতেও এটি ছিল না। তার মানে এটা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল। বিশেষ ব্যক্তিকে সুবিধা দেওয়ার জন্য এটা করা হয়েছে।’

তবে বিধির পরিবর্তনে বেআইনি কিছু হয়নি বলে মনে করেন বিএমইউয়ের সাবেক রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল হান্নান। এ বি এম আব্দুল্লাহ আজীবন এমেরিটাস হিসেবে নিয়োগের সময়ে বিএমইউয়ের রেজিস্ট্রারের দায়িত্বে ছিলেন তিনি।

অধ্যাপক আব্দুল হান্নান এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘বিধি পরিবর্তনের সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় বড় শিক্ষক ও কর্তারা সেই সিন্ডিকেট সভায় ছিলেন। কেউই তখন বাধা দেয়নি। ফলে পরিবর্তন করাটাকে বিধি বহির্ভূত বলার সুযোগ নেই।’

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যাপক এ বি এম আব্দুল্লাহর এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘নিয়োগ যদি বিধিবহির্ভূত কিংবা বেআইনি হয়ে থাকে, সেই দায় তো আমার নয়, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন করেছে। তাহলে তৎকালীন উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, সিন্ডিকেট সদস্য সবাইকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাক, তাদের ধরুক।’

বেতন-ভাতার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘প্রজ্ঞাপনে পূর্ণ বেতন দেওয়ার কথা বললেও তা বাস্তবায়ন করা হয়নি। পুরো টাকা আমাকে দেয়নি। চাকরি থেকে অবসরোত্তর যে পেনশন পেতাম, সেটার সঙ্গে অতিরিক্ত যুক্ত করে পূর্ণকালীন হিসেবে দিয়েছে। কিন্তু এককভাবে আমাকে পূর্ণকালীন অধ্যাপকের বেতন দেওয়া হয়নি।’

এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত না যাওয়ার তথ্যকে চরম মিথ্যা বলে দাবি করেন অধ্যাপক এ বি এম আব্দুল্লাহ। তিনি বলেন, ‘বর্তমান কর্তৃপক্ষ বলছে দুই বছরের মধ্যে নাকি বিশ্ববিদ্যালয়ে যাইনি, যা এক হাজার ভাগ মিথ্যা কথা। আমি নিয়মিত গিয়েছি, এমনকি শুক্রবারও গিয়েছিলাম, নিয়মিত বই লিখতাম। যদি না গিয়েই থাকি, তাহলে দু-বছরের মধ্যে আমাকে কেন কোনো ধরনের নোটিশ দেওয়া হলো না।’

এ বি এম আব্দুল্লাহ বলেন, ‘এমেরিটাসের নির্দিষ্ট কোনো দায়িত্ব নেই। কর্তৃপক্ষ ক্লাস, সভা নেওয়া কিংবা অন্য কোনা কাজ দিলে করা হয়। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাইনি, এটা কোনোভাবেই সত্য নয়। আর চব্বিশের পর এই দুই বছরে কেন বিষয়গুলো সামনে আনা হয়নি। এত দিন কেন লাগল? এখন যারা দায়িত্বে, তারাই তো এতদিন ছিলেন। কেন তাহলে কোনো ব্যবস্থা নিল না?