Advertisement

বিতর নামাজ এক রাকাত পড়া যাবে?

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
বিতর নামাজ এক রাকাত পড়া যাবে?
নামাজ পড়ছেন মুসল্লি। ছবি: সংগৃহীত

বিতর নামাজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিতর অর্থ বিজোড়। বিতর নামাজ পড়া ওয়াজিব। এশার নামাজের পর থেকে সুবহে সাদিক (রাতের শেষ দিকে পূর্ব দিগন্তের উভয় দিকে ক্ষীণ প্রশস্ত আকারে আলোর প্রকাশ) পর্যন্ত আদায় করা যায়।‌ সামান্য কিছু ভিন্নতা ছাড়া অন্য নামাজের মতো আদায় করতে হয়।

বিতর নামাজ তিন রাকাত। হজরত মুহাম্মদ (সা.) বিতর তিন রাকাত পড়তেন। এটি বহু হাদিস ও আসার (সাহাবি বা তাবেয়িদের নিজস্ব বক্তব্য, কর্ম বা ইজতিহাদ) দ্বারা প্রমাণিত। শুধু এক রাকাত বিতর পড়া মহানবী (সা.) থেকে প্রমাণিত নয়।

রাসুলুল্লাহ (সা.) সাধারণত তাহাজ্জুদের পর বিতর পড়তেন। বয়স ও পারিপার্শ্বিক বিভিন্ন অবস্থার কারণে তাহাজ্জুদের রাকাত-সংখ্যা কমবেশি হলেও বিতর সবসময় তিন রাকাতই পড়তেন।

বিতর নামাজ তিন রাকাত হওয়ার বিষয়টি সুপ্রমাণিত। এ বিষয়ে বহু হাদিস ও আসার বর্ণিত হয়েছে। আবু সালামা ইবনে আবদুর রহমান থেকে বর্ণিত, তিনি আয়েশা (রা.)-কে জিজ্ঞাসা করেন, রমজানে মহানবীর নামাজ কেমন হতো? তিনি উত্তরে বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) রমজানে এবং রমযানের বাইরে এগারো রাকাতের বেশি পড়তেন না। প্রথমে চার রাকাত পড়তেন। এর দীর্ঘতা ও সৌন্দর্য সম্পর্কে তুমি জানতে চেয়ো না। এরপর চার রাকাত পড়তেন। এরও দীর্ঘতা ও সৌন্দর্য সম্পর্কে জানতে চেয়ো না। এরপর তিন রাকাত (বিতর) পড়তেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১১৪৭)

আবদুল্লাহ ইবনে আবি কায়েস (রহ.) বলেন, ‘আমি আয়েশা (রা.)-কে জিজ্ঞাসা করলাম, নবী বিতর কত রাকাত পড়তেন?

উত্তরে তিনি বলেন, চার এবং তিন, ছয় এবং তিন, আট এবং তিন, দশ এবং তিন। তিনি বিতরে সাত রাকাতের কম এবং তেরো রাকাতের বেশি পড়তেন না। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১৩৫৭)

সাদ ইবনে হিশাম বলেন, আয়েশা (রা.) তাকে বলেছেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বিতরের (শেষ) দুই রাকাতে মাঝে সালাম ফেরাতেন না। (সুনানে নাসায়ি, হাদিস: ১৬৯৭)

এই হাদিসগুলো থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়, রাসুলুল্লাহ (সা.) এক সালামে তিন রাকাত বিতর পড়তেন। বিতরের দ্বিতীয় রাকাতে তাশাহুদের জন্য বসতেন; কিন্তু সালাম ফেরাতেন না। সালাম ফেরাতেন সবশেষে তৃতীয় রাকাতের পর।

বিতরের তিন রাকাতে তিনি কোন কোন সুরা পড়তেন, তাও বহু হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। যেমন, বিশিষ্ট তাবেয়ি সাইদ ইবনে জুবায়ের (রহ.) আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) তিন রাকাত বিতর পড়তেন। প্রথম রাকাতে সুরা আলা, দ্বিতীয় রাকাতে সুরা কাফিরুন এবং তৃতীয় রাকাতে সুরা ইখলাস পড়তেন। (সুনানে নাসায়ি, হাদিস: ১৭০২)

এছাড়াও আয়েশা (রা.), উবাই ইবনে কাব (রা.), আবদুর রহমার ইবনে আবজা (রা.)-সহ আরও অনেক সাহাবি থেকে বিতরের তিন রাকাতে উপরিউক্ত তিন সুরা পড়া সম্পর্কে হাদিস বর্ণিত হয়েছে। এর প্রত্যেকটি হাদিস এ কথা প্রমাণ করে যে, বিতর নামাজ তিন রাকাত।

সাহাবিরাও তিন রাকাত বিতর পড়তেন, শুধু এক রাকাত বিতর পড়তেন না। বিশিষ্ট তাবেয়ি আবুল আলিয়া (রহ.) যিনি খুলাফায়ে রাশেদীনসহ অনেক মুহাজির ও আনসার সাহাবির সান্নিধ্য পেয়েছেন, তাকে বিতর নামাজের পদ্ধতি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, সাহাবিরা আমাদের শিখিয়েছেন, বিতর নামায মাগরিবের নামাজের মতো। পার্থক্য শুধু এতটুকু যে, (মাগরিবের তৃতীয় রাকাতে কেরাত পড়তে হয় না; কিন্তু) বিতরের তৃতীয় রাকাতে আমরা কেরাত পড়ি। এটা হলো রাতের বিতর। আর ওটা হলো দিনের বিতর। (শরহু মাআনিল আসার, বর্ণনা: ১৭০১)

বিতর নামাজ তিন রাকাত পড়াই সুন্নাহসম্মত। রাসুলুল্লাহ (সা.) ও সাহাবিরা তিন রাকাত বিতর পড়তেন। পক্ষান্তরে শুধু এক রাকাত বিতর পড়া মহানবী (সা.) থেকে প্রমাণিত নয়।

বিখ্যাত ফকিহ ও মুহাদ্দিস ইমাম ইবনুস সালাহ (রহ.) বলেন–বিতর সম্পর্কে অনেক হাদিস থাকা সত্ত্বেও আমরা এটা পাইনি যে, মহানবী (সা.) শুধু এক রাকাত বিতর পড়েছেন। (আলবাদরুল মুনির, খণ্ড: ৪, পৃষ্ঠা: ৩০৩)

কোনো কোনো বর্ণনায় أوتر بركعة-এর কথা পাওয়া যায়। কিন্তু জেনে রাখা দরকার যে, এর অর্থ বিতর নামাজ শুধু এক রাকাত পড়া নয়; বরং ওই বর্ণনাটি এ সম্পর্কিত অন্য বিশদ বর্ণনার সংক্ষিপ্ত রূপ। যার কয়েকটি এখানেও উল্লেখ করা হয়েছে। ওই সব হাদিসের পূর্ণাঙ্গ বর্ণনা দেখা হলে বিষয়টি একদমই স্পষ্ট যে, ওই এক রাকাতের সঙ্গে এর পূর্বে তিনি আরও অনেক রাকাত নামাজ পড়েছেন। এর মধ্যে শেষের তিন রাকাত বিতর আর বাকিগুলো তাহাজ্জুদ। এ কথাটি দ্বারা বর্ণনাকারীর মূলত উদ্দেশ্য হলো, দুই দুই রাকাত করে নামাজ পড়ে শেষ দুই রাকাতের সঙ্গে এক রাকাত যোগ করে তিনি আগের রাকাতগুলোকে বেজোড় করেছেন।

কিন্তু এর সঙ্গে আগে দুই বা চার রাকাত নামাজ না পড়ে কখনও তিনি শুধু এক রাকাত বিতর পড়েছেন, এটি প্রমাণিত নয়।

ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.) বলেন, যেসব হাদিসে এসেছে, মহানবী (সা.) এক রাকাত বিতর পড়েছেন, সেখানে এক রাকাতের আগে আরও নামাজের কথা আছে। (মাসায়িলুল ইমাম আহমদ, আবু দাউদ, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৬৫)

সুতরাং বিতর নামাজ তিন রাকাতই পড়তে হবে; শুধু এক রাকাত পড়া যাবে না। (কিতাবুল হুজ্জাহ, ইমাম মুহাম্মাদ খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ১৩১-১৩৯; শরহু মাআনিল আসার, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ১৬৯-২০৭; নুখাবুল আফকার, খণ্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ১৯৮-২৯২)

সূত্র: আলকাউসার