দীর্ঘক্ষণ বসে কাজ করেন, মাত্র ৫ মিনিটের অভ্যাস বদলে দিতে পারে স্বাস্থ্য

অফিসে কাজ মানেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা কম্পিউটারের সামনে বসে থাকা। ইমেইলের জবাব দেওয়া, অনলাইন মিটিং করা কিংবা রিপোর্ট তৈরি, দিনের বেশির ভাগ সময়ই কেটে যায় একই চেয়ারে বসে।
কিন্তু এই দীর্ঘ সময় বসে থাকার অভ্যাস শরীরের জন্য মোটেও ভালো নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘক্ষণ একটানা বসে থাকলে অতিরিক্ত ওজন বাড়া, হৃদ্রোগ এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
আমরা অনেকেই জানি, মাঝে মাঝে স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে বিরতি নেওয়া প্রয়োজন। তবে প্রশ্ন হলো, কাজের ক্ষতি না করেই কতক্ষণ পরপর উঠে হাঁটা সবচেয়ে উপকারী?
সম্প্রতি British Journal of Sports Medicine-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রতি ঘণ্টায় মাত্র ৫ মিনিট হাঁটাহাঁটি করা কর্মক্ষেত্রে সুস্থতা, মনোযোগ এবং কাজের দক্ষতা বাড়ানোর সবচেয়ে কার্যকর ও বাস্তবসম্মত উপায় হতে পারে।
প্রতি ঘণ্টায় ৫ মিনিট হাঁটলে কী উপকার হয়?
গবেষণার প্রধান গবেষক, কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞ কিথ ডিয়াজ জানান, বর্তমানে বেশির ভাগ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ তাদের জেগে থাকা সময়ের প্রায় তিন-চতুর্থাংশই বসে কাটান।
তিনি বলেন, শুধু কম বসুন, বেশি নড়াচড়া করুন এই পরামর্শ যথেষ্ট নয়। মানুষকে জানতে হবে, ঠিক কতটা নড়াচড়া করলে সবচেয়ে ভালো ফল পাওয়া যায়।
গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি ঘণ্টায় ৫ মিনিট হাঁটলে মন ভালো থাকে, ক্লান্তি কমে, মনোযোগ বাড়ে, সতেজ অনুভূতি আসে, কাজের দক্ষতা বজায় থাকে, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে বাড়তেও পারে
এই গবেষণায় যুক্তরাষ্ট্রের ১১ হাজারেরও বেশি কর্মজীবী মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। তাদের বেশির ভাগই অফিসে ৮ থেকে ৯ ঘণ্টা কাজ করতেন। প্রথম সপ্তাহে অংশগ্রহণকারীরা স্বাভাবিক নিয়মে কাজ করেন। প্রতিদিন তারা নিজেদের ক্লান্তি, মানসিক অবস্থা এবং কাজের পারফরম্যান্স সম্পর্কে তথ্য দেন।
এরপরের দুই সপ্তাহে তাদের তিনটি ভিন্নভাবে হাঁটার বিরতি নিতে বলা হয়। যথাক্রমে, প্রতি ৩০ মিনিট পর ৫ মিনিট হাঁটা, প্রতি ১ ঘণ্টা পর ৫ মিনিট হাঁটা এবং প্রতি ২ ঘণ্টা পর ৫ মিনিট হাঁটা।
প্রতিদিনের মতো তারা আবারও নিজেদের অভিজ্ঞতা জানিয়ে প্রশ্নপত্র পূরণ করেন।
কোন পদ্ধতিতে সবচেয়ে ভালো ফল মিলেছে?
গবেষণায় দেখা যায়, প্রতি ৩০ মিনিট পর হাঁটলে ক্লান্তি আরও কমলেও অনেকের কাজের ধারাবাহিকতায় ব্যাঘাত ঘটে।
অন্যদিকে, প্রতি ২ ঘণ্টা পর হাঁটার তুলনায় প্রতি ঘণ্টায় ৫ মিনিট হাঁটা সবচেয়ে কার্যকর প্রমাণিত হয়। এতে কাজের গতি খুব একটা ব্যাহত হয়নি, আবার মনোযোগ, মানসিক অবস্থা এবং কর্মদক্ষতাও সবচেয়ে বেশি উন্নত হয়েছে।
হাঁটার বিরতি কেন কাজে সাহায্য করে?
অনেকের ধারণা, কাজের মাঝে বারবার উঠে হাঁটলে উৎপাদনশীলতা কমে যাবে। কিন্তু গবেষকদের মতে, বাস্তবে এর উল্টোটা হতে পারে।
অল্প সময়ের হাঁটা
- মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে
- মনোযোগ ধরে রাখতে সহায়ক
- স্মৃতিশক্তির কার্যকারিতা উন্নত করতে পারে
- মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে
- কর্মীদের আরও সতেজ অনুভব করায়
ফলে কাজে ফিরে আসার পর অনেকেই আগের চেয়ে বেশি মনোযোগ দিয়ে কাজ করতে পারেন।
অফিসেই সহজে নড়াচড়া বাড়ানোর কিছু উপায়
প্রতিবার বাইরে গিয়ে হাঁটা সম্ভব না হলেও ছোট ছোট কিছু অভ্যাস গড়ে তুলতে পারেন।
- প্রতি ঘণ্টায় ৫ মিনিট দাঁড়িয়ে হাঁটুন।
- ফোনে কথা বলার সময় বসে না থেকে হেঁটে কথা বলুন।
- সম্ভব হলে হাঁটতে হাঁটতেই ছোট মিটিং করুন।
- পানি খাওয়ার জন্য নিজে উঠে যান।
- লিফটের বদলে সিঁড়ি ব্যবহার করুন, যদি সম্ভব হয়।
- কম্পিউটার বা মোবাইলে প্রতি ঘণ্টায় একটি রিমাইন্ডার সেট করুন।
ব্রিটিশ হার্ট ফাউন্ডেশনের সিনিয়র কার্ডিয়াক নার্স এমিলি ম্যাকগ্রাথ এই গবেষণাকে ইতিবাচক বলে মন্তব্য করেছেন। তার মতে, দৈনন্দিন জীবনে অল্প সময়ের নড়াচড়া যোগ করাও সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতে পারে।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, এই গবেষণার তথ্য মূলত অংশগ্রহণকারীদের নিজস্ব অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে সংগ্রহ করা হয়েছে এবং গবেষণার সময়কালও ছিল তুলনামূলকভাবে স্বল্প। তাই দীর্ঘমেয়াদে হৃদ্স্বাস্থ্যের ওপর এর প্রভাব নিশ্চিত করতে আরও বিস্তৃত গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
দিনভর একটানা বসে কাজ করা এখন অনেকেরই বাস্তবতা। তবে এর মাঝেও যদি প্রতি ঘণ্টায় মাত্র ৫ মিনিট উঠে হাঁটার অভ্যাস করা যায়, তাহলে তা শুধু শরীর নয়, মন এবং কাজের পারফরম্যান্সের ওপরও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ছোট একটি বিরতি হয়তো আপনার পুরো কর্মদিবসটাকেই আরও প্রাণবন্ত ও উৎপাদনশীল করে তুলতে পারে।
সূত্র: বিবিসি






